রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে প্রথমবারের মত ‘সফলভাবে’ নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়েছে।
রোববার বিকাল ৩টা ৩৪ মিনিটে এ প্রক্রিয়া শুরুর তথ্য এ দিয়েছেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান।
এ প্রক্রিয়া শুরুর পর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লির সব ‘পরিমাপ নির্ধারিত সীমার’ মধ্যে থাকার কথাও বলেছেন তিনি। এর মাধ্যমে এ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আরেক ধাপ অগ্রগতি হল। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের আগে আরও কয়েক ধাপে পরীক্ষা করার কথা বলেছেন তিনি।
এদিন এ বিক্রিয়া শুরুর সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন।
তিনি বলেন, চুল্লিতে বিক্রিয়া শুরুর সময় যেসব পরিমাপ পাওয়া গেছে, তার সবই আগের হিসাব অনুযায়ী নির্ধারিত সীমার মধ্যে ছিল। পুরো প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, পারমাণবিক চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খল বিক্রিয়ার এ পর্যায়কে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ পর্যায়ে চুল্লির ভেতরে পারমাণবিক জ্বালানি থেকে নিয়ন্ত্রিতভাবে তাপ উৎপন্ন হতে শুরু করে। তবে এই বিক্রিয়া শুরু হওয়ার অর্থ এখনই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়া নয়।
এনপিসিবিএল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদুল হাছান বলেন, “ক্রিটিক্যালিটি অর্জনের পর রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ সব প্যারামিটার নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে।”
তিনি বলেন, পরবর্তী ধাপে চুল্লির পারমাণবিক বিক্রিয়ার পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে চুল্লির শক্তি বাড়ানো হবে। জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযোগের আগে আরও পরীক্ষা ও প্রস্তুতি শেষ করতে হবে।
গ্রিড সিনক্রোনাইজেশন হল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করার প্রক্রিয়া।
এদিন এ বিক্রিয়া শুরুর সময় রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি বাংলাদেশি প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের বিশেষজ্ঞরাও উপস্থিত ছিলেন।
সচিব বলেন, বিক্রিয়া শুরুর পরও চুল্লি স্থিতিশীল রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবস্থার পরিমাপও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, চুল্লিতে পারমাণবিক বিক্রিয়া থেকে তাপ তৈরি হবে। সেই তাপে পানি থেকে বাষ্প উৎপন্ন হবে। বাষ্পের সাহায্যে টারবাইন ও জেনারেটর চালিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। তবে এই পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও কয়েক ধাপে পরীক্ষা করতে হবে।
সচিব বলেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নিরাপত্তা নির্দেশনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত মেনে এসব পরীক্ষা শেষ করতে হবে। প্রয়োজনীয় সনদ ও অনুমোদন পাওয়ার পরই বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গ্রিডে সংযোগের পরবর্তী ধাপে যাওয়া যাবে।
কবে নাগাদ জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাদের তো সর্বোচ্চ চেষ্টা আছে যত দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিয়ে আসা যায়।”
নিরাপত্তার সব শর্ত পূরণ করেই কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগে সেপ্টেম্বরের মধ্যে নির্ধারিত পর্যায়ে পৌঁছানোর আশা ছিল। কিন্তু একটি ভালভে কারিগরি সমস্যা দেখা দেওয়ায় সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোয়নি। এখন যত দ্রুত সম্ভব বাকি পরীক্ষা ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া শেষ করার চেষ্টা চলছে।
তবে চলতি বছরের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো দিনক্ষণ এখন ঠিক করা হয়নি বলে তুলে ধরেন তিনি।
এর আগে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা) প্রথম ইউনিটকে বি-১ থেকে বি-২ পর্যায়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়। এর মাধ্যমে কেন্দ্রটি নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর পরবর্তী ধাপে যাওয়ার ছাড়পত্র পায়।
তখন বায়রার চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বলেছিলেন, বি-২ পর্যায়েও পরীক্ষা চলবে। এরপর ‘সি’ ও ‘ডি’ পর্যায়ে যেতে আলাদা অনুমোদন নিতে হবে।
এর আগে গত ৯ অক্টোবর জাহেদুল হাছান জানিয়েছিলেন, প্রথম ইউনিটে তিন শতাধিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। পারমাণবিক জ্বালানি ভরার কাজও শেষ হয়েছে। পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর পর আরও কয়েকটি পরীক্ষা করতে হবে। এসব পরীক্ষা সফল হলে কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর পরবর্তী ধাপে যাবে।
ওই পর্যায়ে চুল্লির শক্তি ধাপে ধাপে ৩৭ শতাংশে নেওয়া হবে। তখন উৎপন্ন তাপ দিয়ে পর্যাপ্ত বাষ্প তৈরি করা যাবে। সেই বাষ্প দিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
তবে উৎপাদন শুরু হলেও সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে না। এজন্য আরও পরীক্ষা ও গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কাজ শেষ করতে হবে।
বায়রার অনুমোদনের পর প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছিলেন, আগামী ডিসেম্বরের শেষভাগে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হতে পারে।
তাদের হিসাবে, গ্রিডে সংযোগের পর বিভিন্ন উৎপাদনক্ষমতায় সাত থেকে আট মাস পর্যন্ত পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলতে পারে।
তবে প্রতিটি পরীক্ষার ফলের ওপর বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর সময় নির্ভর করবে বলে জানিয়েছেন এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
এর আগে প্রথম ইউনিটের একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রের সেফটি ভালভে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী কাজ এগোয়নি।
রাশিয়া থেকে আসা বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ওই ত্রুটি সারানো হয়। এরপর নিরাপত্তা পরীক্ষার ফল যাচাই করে বৃহস্পতিবার পরবর্তী ধাপে যাওয়ার অনুমতি দেয় বায়রা।
এদিকে শুক্রবার মস্কোয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের সঙ্গে বৈঠকে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভও দ্রুততম সময়ের মধ্যে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহের আশ্বাস দেন।
পাবনার ঈশ্বরদীতে রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় নির্মাণ করা হচ্ছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। কেন্দ্রটির দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুই ইউনিট মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
জাতীয় গ্রিডে এই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ যুক্ত হলে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় নাম লেখাবে।
রূপপুর প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে তা ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মেয়াদ বাড়ানোর কারণে প্রকল্প ব্যয় বাড়ার সুযোগ না থাকলেও ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।
বর্তমানে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
