২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর চালানো হত্যাকাণ্ডের খবর দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে আওয়ামী লীগ সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করেছিল বলে অভিযোগ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। তাঁর দাবি, আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো হত্যাকাণ্ডের তথ্য আড়াল করতেই ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
রোববার (১১ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার জবানবন্দির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি।
ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ নিয়ে সাক্ষীর জবানবন্দি
প্রসিকিউটর তামিম বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সজীব ওয়াজেদ জয় ও জুনাইদ আহমেদ পলক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ। এ মামলায় রোববার বিটিআরসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁর জবানবন্দিতে ইন্টারনেট বন্ধ ও পুনরায় চালুর বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত উঠে এসেছে।
তামিমের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই কয়েকটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে থ্রিজি ও ফোরজি ইন্টারনেট সেবা বন্ধ বা সীমিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী পলক। পরদিন ১৬ জুলাই আবু সাঈদসহ কয়েকজন নিহত হওয়ার পর বিটিআরসির একটি অনলাইন বৈঠকে পলক, জয় ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যুক্ত ছিলেন।
প্রসিকিউটর আরও দাবি করেন, জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (এনটিএমসি) তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানও ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। এ-সংক্রান্ত পাঁচটি নথি ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তামিমের অভিযোগ, আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের খবর যেন দেশের মানুষ ও আন্তর্জাতিক মহল জানতে না পারে, সে উদ্দেশ্যেই ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল।
মুগ্ধ হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়ানোর পর কারফিউ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কার ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরে প্রসিকিউটর তামিম বলেন, ১৮ ও ১৯ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় মুগ্ধ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এ সময় আশপাশের কয়েকটি থানা এলাকায় নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছিলেন বলে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ। এসব ঘটনায় ওই দুই দিনে বেশ কয়েকজন নিহত হন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতদের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আন্দোলন দমনে সরকারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। এরপর এসব ঘটনার তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছানো বন্ধ করতে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
প্রসিকিউটর বলেন, ১৯ জুলাইও একই ধরনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে বলে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ। বিভিন্ন মাধ্যমে এসব খবর ছড়িয়ে পড়তে থাকলে ওই রাতে সরকারি সিদ্ধান্তে কারফিউ জারি করা হয়। এরপর ২০ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের হত্যা ও আহত করার ঘটনা ঘটে বলে তিনি দাবি করেন।
২৬ আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ
এদিকে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মুগ্ধসহ ১১ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় ২৬ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বলে জানান প্রসিকিউটর তামিম।
তিনি বলেন, এ মামলায় প্রতিটি অভিযোগের পক্ষে তথ্য-প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শী এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সাক্ষ্য উপস্থাপন করা হবে। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগগুলো প্রমাণ করতে পারবে বলে রাষ্ট্রপক্ষ আশাবাদী।
তামিম আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত এবং হত্যাকাণ্ডের তথ্য প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ জয় ও পলকের বিরুদ্ধে করা মামলার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হবে ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
