প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তী সময়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। তার সরাসরি নেতৃত্বে প্রণীত ও বাস্তবায়ন হয় যুগোপযোগী ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন’। এ আইনের মূল ভিত্তি ছিল দেশের প্রকৃত ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও শিল্পপতিদের সম্মান জানানো এবং তাদের মেধা ও মূলধনের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আর্থিক খাতকে মজবুত করা। দেশপ্রেমিক এ উদ্যোক্তাদের নেতৃত্বে সে সময় দেশে শিল্পের অভূতপূর্ব প্রসার ঘটে। ব্যাংকগুলো হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের আস্থার এক নির্ভরযোগ্য ঠিকানা। প্রকৃত ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা সহজ শর্তে এবং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে পর্যাপ্ত মূলধন বা অর্থের জোগান পেয়ে দেশের উৎপাদন খাতকে সচল রাখেন। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, রফতানি বাণিজ্যে গতি আসে এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধির বা জিডিপি গ্রোথ রেট দুই ডিজিটের ঘরে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
কিন্তু ২০০৯-২৪ তৎকালীন সরকার ক্ষমতায় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক হীনস্বার্থে এবং লুটপাটের সুযোগ তৈরির জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইনে লাগাতার সংশোধন আনে। এ ধারাবাহিক সংশোধনের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো থেকে দেশের সৎ, অভিজ্ঞ এবং দেশপ্রেমিক প্রতিষ্ঠাতা ও উদ্যোক্তা পরিচালকদের আইনি মারপ্যাঁচে এবং নানা কৌশলে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়। তাদের স্থলাভিষিক্ত করা হয় ব্যাংকিং পরিচালনায় সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ, লুটেরা ও পরিবারকেন্দ্রিক মাফিয়া চক্রকে। ফলে দেশের পুরো ব্যাংক খাত শিল্প, বাণিজ্য, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রফতানি খাতে তার কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালনে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পরিচালকরা ব্যাংকের বিনিয়োগযোগ্য আমানতের একটি বিশাল অংশ নামে-বেনামে ভুয়া ঋণ হিসেবে তুলে নেন এবং তা বিদেশে পাচার করতে শুরু করেন। পারিবারিক বা ব্যক্তিতন্ত্র কায়েমের অপপ্রয়াসে এ মাফিয়ারা নিজেদের নামে এবং বিভিন্ন অজ্ঞাত ও অখ্যাত কোম্পানির ভুয়া প্রতিনিধির মাধ্যমে নিজস্ব বলয়ের ডামি পরিচালক বসিয়ে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ দখল করতে থাকে।
অল্প সময়ের ব্যবধানে রাজনৈতিক বিবেচনায় একের পর এক ডজন ডজন নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হয়। এতে আওয়ামী লীগের পুরো শাসনামলে একদিকে যেমন ব্যাংক পাড়ায় যোগ্য ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবং উপব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (ডিএমডি) তীব্র সংকট দেখা দেয়, অন্যদিকে প্রকৃত ও উন্নয়নমুখী ব্যাংকার এবং পরিচালকদের জায়গা দখল করে নেয় বেপরোয়া লুটেরাচক্র। সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক কোম্পানি আইনে পরিবর্তন এনে এ অবাধ লুটপাটের পথ প্রশস্ত করা হয়। শুধু তাই নয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এমন সব অদক্ষ, তোষামোদকারী ও উন্নয়নবিমুখ গভর্নর এবং ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ দেয়া হয়, যারা ব্যাংক খাতকে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগ করে দেয়ার বদলে এ লুটপাটকারীদের সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদগুলোয় বসে এসব ব্যক্তি সাইবার লুটেরা ও অর্থ পাচারকারীদের জন্য এক নিরাপদ এবং অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেন।
অর্থাৎ, সরকার নিজে আইন সংশোধন করে মাফিয়া ও দুষ্টচক্রের জন্য ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পথ উন্মুক্ত করে দেয়। এ লুটেরা চক্র ব্যাংকের কমান্ডিং পর্ষদে এসেই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ স্পন্সর ডিরেক্টর বা উদ্যোক্তাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় এবং জনগণের কষ্টার্জিত আমানতের টাকা হরিলুট করে বিদেশে পাচার করতে থাকে। এর সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ইসলামী ব্যাংকসহ ছয়-সাতটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক, যেগুলোকে এস আলম গ্রুপ সম্পূর্ণ কবজা করে নেয়। এছাড়া এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, ইউসিবি ব্যাংকের সাইফুজ্জামান চৌধুরী এবং বেসিক ব্যাংকের আব্দুল হাইয়ের নানামুখী আর্থিক কেলেঙ্কারি ও লুটপাটের চিত্র আজও জাতির সামনে স্পষ্ট। এ লুটেরা গোষ্ঠী শুধু বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকেই বৈধ ও অবৈধ উপায়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার করেনি, বরং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকেও তাদের প্রধান টার্গেটে পরিণত করে এবং সফলভাবে সেগুলোকে শূন্য করে দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করলে এ ভয়াবহ চিত্র আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০০৬ সালে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বা এনপিএলের হার ছিল মোট বিতরণ করা ঋণের মাত্র ১৩ দশমিক ২ শতাংশ, যার আর্থিক পরিমাণ ছিল প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকার ব্যাংক খাতের আইনি কাঠামো ধ্বংস করে যখন লুটেরাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিল, তখন পুরো ব্যাংকিং সেক্টরে এক চরম বিপর্যয় নেমে এল। অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের হাতে গড়া সেই সুশৃঙ্খল আইন ক্ষতবিক্ষত হওয়ার পর ২০২৫ সালে এসে খেলাপি ঋণ (এনপিএল) হুহু করে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ শতাংশে, যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৬ দশমিক ৫ লাখ কোটি টাকা। বর্তমানে বিভিন্ন জালিয়াতি ও কারসাজির মাধ্যমে ঋণ রিশিডিউল বা পুনর্গঠন করে কাগজে-কলমে ৩৬ শতাংশ দেখানো হলেও প্রকৃত খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি—অর্থাৎ যার পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ কোটি টাকা! ২০০৬ সালে যা ছিল মাত্র ২২ হাজার কোটি টাকা, তা আজ এ মাফিয়াদের কারণে মহাবিপর্যয়ের রূপ নিয়েছে।
পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণের পরিমাণ আকাশচুম্বী হওয়ায় সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ নগদ আর্থিক সহায়তা বা লিকুইডিটি সাপোর্ট ছাড়া এগুলো একদিনও সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। শরিয়াহ খাতের ব্যাংকগুলোয় এনপিএলের হার দাঁড়িয়েছে মোট ঋণের প্রায় ৫৮ শতাংশে, আর কয়েকটি শরিয়াহ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। শরিয়াহ খাতের একসময়ের বৃহত্তম ও গৌরবোজ্জ্বল ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকেই এনপিএলের হার ৫৩ শতাংশেরও বেশি। এর অর্থ দাঁড়ায় এ দেশের সাধারণ মানুষের আমানতকৃত অর্থের অর্ধেকের বেশি অংশ একাই লুটে নিয়েছে এস আলম ও তার দোসররা।
অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয়ও খেলাপি ঋণের গড় হার প্রায় ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ বা তার বেশি। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ ৭৫ শতাংশের কোঠা ছাড়িয়ে গেছে এবং অগ্রণী ব্যাংকের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৪৪ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। কেবল এ সরকারি ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৫ লাখ কোটি টাকা। বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বেসরকারি খাতে নতুন কোনো প্রকল্প বা প্রজেক্ট লোন দেয়ার ন্যূনতম সক্ষমতাও নেই বললেই চলে। বিনিয়োগযোগ্য পর্যাপ্ত তহবিল বা লিকুইডিটি না থাকায় চলমান শিল্প-কারখানাগুলোকে অপারেশনাল ফান্ড ফ্লো বা চলতি মূলধনের সহায়তা দেয়ার অবস্থাও আজ আর ব্যাংক খাতে অবশিষ্ট নেই।
একটি সুস্থ ও সচল অর্থনীতিতে ব্যাংক খাতের মূল দায়িত্ব হলো মানবদেহের রক্তসঞ্চালনের মতো পুরো অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত তহবিল বা ফান্ড ফ্লো নিশ্চিত করা। বিনিয়োগ বাড়িয়ে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রফতানি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোই ছিল ব্যাংকিংয়ের কাজ। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার সেই সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক স্বপ্নকে আজ সম্পূর্ণ ভুলুণ্ঠিত করে দেয়া হয়েছে। একটি সুগভীর ও ধ্বংসাত্মক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ব্যাংকগুলোকে আজ দেশের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি থেকে সরিয়ে নিয়ে রাষ্ট্রের গলার কাঁটা বা বোঝা হিসেবে পরিণত করা হয়েছে। তাদের এ অপকৌশলের মূল চাবিকাঠি ছিল বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রকৃত উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালকদের অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা এবং লুটেরা মাফিয়া চক্রকে ব্যাংক খাতের স্টিয়ারিংয়ে বসানোর জন্য স্থায়ী আইনি কাঠামো প্রণয়ন করা।
সফল ও দূরদর্শী অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের হাতে গড়া ১৯৯১ সালের চমৎকার ব্যাংক কোম্পানি আইনটিকে ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৩ সালে দফায় দফায় তিনটি কুখ্যাত সংশোধনী এনে ক্ষতবিক্ষত করা হয়। এর মাধ্যমে ব্যাংক খাতে মাফিয়াতন্ত্র, লুটপাট ও চরম অদক্ষতার এক কালো রাজত্ব কায়েম করা হয়। এমনকি ঋণ বা মূলধন ইস্যু-সংক্রান্ত আইনগুলোকেও এক্ষেত্রে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যাপকভাবে অপপ্রয়োগ করা হয়েছে।
এ চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আজ কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়া অত্যন্ত জরুরি। সবার আগে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর দেশমাতৃকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও অভিজ্ঞ পরিচালকদের আইনি কাঠামোর মাধ্যমে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। যাদের ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এ খাত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল, তাদের ফেরার পথ সুগম করতে হবে এবং সব আইনি অন্তরায় ও বাধাগুলো অবিলম্বে দূর করা আবশ্যক।
ব্যাংক খাত থেকে পরিবারতন্ত্র ও মাফিয়াতন্ত্রের মূলোৎপাটন করতে হবে। একই পরিবারের হাতে এক বা একাধিক ব্যাংক কুক্ষিগত করে রাখার যে লাইসেন্স বা আইনি সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়েছে, তা কঠোরহস্তে সংশোধন করতে হবে। অন্যথায় এ খাতে কখনোই করপোরেট সুশাসন ফিরে আসবে না। পাশাপাশি সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কার্যক্রমে জাতীয় উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট ভিশন ও মিশন বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অসৎ উদ্দেশ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যাংকের লাইসেন্স দিয়ে এ গতিশীল খাতকে কৃত্রিমভাবে দুর্বল করা হয়েছে, যার সুযোগ নিয়ে লুটেরা মাফিয়া গোষ্ঠী ব্যাংকগুলোয় তাদের অনুগত ও পকেটস্থ ম্যানেজমেন্ট কালচার চালু করেছিল।
ব্যাংক খাতের ওপর নজরদারি বা সুপারভিশনকে আরো অধিকতর কার্যকর এবং ফাংশনাল করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পুরোপুরি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা দরকার, যাতে তারা কোনো ধরনের লোভ বা দুর্নীতির শিকার না হন। ব্যাংক খাতের মতো একটি সংবেদনশীল জায়গায় দ্বৈত ব্যবস্থাপনা বা দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের চর্চা কখনো কোনো সুফল বয়ে আনে না। বর্তমান ধ্বংসস্তূপ থেকে এ খাতকে বাঁচাতে সামগ্রিক বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে অবিলম্বে আমূল সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
তোফাজ্জল হোসেন: চেয়ারম্যান ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি এবং সাবেক চেয়ারম্যান এনসিসিবিএল
