মেমোরি চিপের সংকট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহারে সেমিকন্ডাক্টরের বাড়তি চাহিদার মুখে ধস পড়েছে বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোনের বাজার।
আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি প্রতিবেদনে লিখেছে, গেল এক বছরে বৈশ্বিক স্মার্টফোন বিক্রি কমে গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে।
আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা কোম্পানি ‘কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ’ বলছে, ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোন সরবরাহ এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশ কমেছে।
এর মাধ্যমে স্মার্টফোনের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা মন্দা পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হল।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে স্মার্টফোন বিক্রির সূচক ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছানোর পর থেকেই এ খাতে ধারাবাহিক মন্দা দেখা যায়।
ফোল্ডএবল ডিসপ্লে ও দ্রুতগতির ফাইভজি সংযোগ আসার পরও এক দশকে শীর্ষস্থানীয় নির্মাতা কোম্পানিগুলোর উদ্ভাবন ছিল আগে থেকে থাকা সুবিধারই সামান্য কিছু সংস্করণ।
এতে করে প্রতি বছর পুরনো সেট বদলে নতুন ডিভাইস কেনার প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ অনেকটাই কমেছে।
সম্প্রতি বিক্রিতে এ ধসের পেছনে চিপ সংকট মূল ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছে কাউন্টারপয়েন্ট রিচার্স।
এআই প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের কারণে চিপের ঘাটতি দেখা দিয়েছে ও মেমোরি যন্ত্রাংশের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়েছে। উৎপাদন ও মেমোরি যন্ত্রাংশের বাড়তি খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত চাপানো হয়েছে ক্রেতাদের ওপরই।
কাউন্টারপয়েন্টের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে স্মার্টফোনের খুচরা মূল্য গড়ে ২০ শতাংশ বেড়েছে।
স্মার্টফোন বাজারের এ টালমাটাল পরিস্থিতি নিয়ে কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক শিল্পি জৈন বলেছেন, “মেমোরি যন্ত্রাংশের চরম সংকট স্মার্টফোনের বাজারকে তুলনামূলক বেশি সতর্ক ও বাছাইমুখী এক ধাপে ঠেলে দিচ্ছে।
“এ পরিস্থিতি স্মার্টফোন নির্মাতাদের কৌশল তো বটেই, ক্রেতাদের কেনার অভ্যাসকেও ব্যাপকভাবে বদলে দিচ্ছে।”
খুচরা বাজারে স্মার্টফোনের আকাশচুম্বী দাম ও মেমোরি যন্ত্রাংশের সংকটের কারণে ক্রেতারা আগের চেয়ে বেশি সময় ধরে পুরনো ফোন ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশ্বজুড়ে হাতবদল হওয়া ডিভাইসের জনপ্রিয়তা যেমন বাড়ছে তেমন নতুন ফোন কেনার ক্ষেত্রে কেবল দীর্ঘস্থায়ী ও উচ্চমানের প্রিমিয়াম হ্যান্ডসেটকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন গ্রাহকরা।
এ বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে সার্বিক বিক্রি কমলেও স্যামসাং তাদের শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের প্রতিবেদন বলছে, এ প্রান্তিকে ২৩ শতাংশ বাজার শেয়ার নিয়ে অ্যাপলকে পেছনে ফেলে বিশ্বে এক নম্বরে রয়েছে স্যামসাং।
স্যামসাং ও অ্যাপলের পাশাপাশি চীনের তিন জনপ্রিয় ব্র্যান্ড শাওমি, অপো ও ভিভো একত্র হয়ে বর্তমানে বৈশ্বিক স্মার্টফোন বাজারের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বা ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
তবে মেমোরি চিপের বৈশ্বিক সংকট ও কাঁচামালের দামবৃদ্ধির কারণে শীর্ষ এ ৫টি প্রধান ব্র্যান্ডের প্রতিটিই ডিভাইস সরবরাহে মন্দার মুখে পড়েছে।
কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ সতর্ক করে বলেছে, যন্ত্রাংশের উৎপাদন খরচ না কমা ও সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই খাত ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম।
তাদের পূর্বাভাস অনুসারে, ২০২৬ সালের পুরো বছরজুড়ে বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোন সরবরাহ সার্বিকভাবে ১৪ শতাংশ কমে ১০৮ কোটি ইউনিটে গিয়ে দাঁড়াতে পারে। সংখ্যাটি ২০১৬ সালের রেকর্ড বিক্রির পরিমাণের চেয়ে প্রায় ৫০ কোটি ইউনিট কম।
এ কারণে, সার্বিক ঘাটতি সামাল দিতে স্মার্টফোন নির্মাতারা কম দামি ফোনের উৎপাদন কমিয়ে বেশি দামের ও প্রিমিয়াম ক্যাটাগরির স্মার্টফোন তৈরিতেই বেশি নজর দিতে পারে।
