টেট সমস্যার সমাধান চেয়ে ফের পথে নামতে চলেছেন শিক্ষকদের একাংশ। কী ভাবে পরীক্ষা হবে, কী ভবিষ্যৎ প্রাথমিক ও উচ্চপ্রাথমিক শিক্ষকদের— তা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই দোলাচল চলছে। পথে নেমে বিক্ষোভও দেখিয়েছেন শিক্ষকদের একাংশ। জানা গিয়েছে, ফের ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবর টেট বিরোধী আন্দোলনে নামতে চলেছেন তাঁরা।
নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির ডাকে আগামী ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত বিকাশ ভবনের সামনে অবস্থান বিক্ষোভ করবেন শিক্ষকেরা। দাবি, বিধাসভায় টেট সংক্রান্ত প্রস্তাবনা গ্রহণ করে দ্রুত টেট সমস্যা সমাধান করতে হবে রাজ্যকে।
গত বছর সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে বলা হয়েছিল, ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের সব প্রাথমিক ও উচ্চপ্রাথমিক শিক্ষককে টিচার্স এলিজিবিলিটি টেস্ট (টেট) উত্তীর্ণ হতে হবে। রেহাই পাবেন শুধু প্রবীণ শিক্ষকেরা, যাঁদের অবসরের আর মাত্র পাঁচ বছর বা তার কম সময় বাকি। পরে এই সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৮ করে শীর্ষ আদালত।
শিক্ষকদের একাংশের দাবি, শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯ কার্যকর হয় ২০১০-এ। সেই আইন অনুযায়ী বিধি তৈরি করে ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচার্স এডুকেশন বা এনসিটিই। পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালের জুলাইয়ে শিক্ষকদের যোগ্যতা সংক্রান্ত নিয়ম চালু হয়। সেখানে টেট বাধ্যতামূলক করা হয়। তার আগে যাঁরা শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন, তাঁদের এই টেট-এর আওতায় আসার কথা নয়। শিক্ষকদের একাংশ আবেদন করেছিলেন, এই আইন কার্যকর হওয়ার আগে থেকে যে সকল শিক্ষক কর্মরত, তাঁদের এই নির্দেশের বাইরে রাখা হোক।
হিসাব বলছে, এই মুহূর্তে সারা দেশে ২০ লক্ষ শিক্ষক কর্মরত, যাঁরা টেট উত্তীর্ণ নন। এ রাজ্যে সেই সংখ্যা ৯০ হাজারের বেশি। শিক্ষার অধিকার আইন, আরটিই ২০০৯ এবং এনসিটিই ২০১০-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষকতার জন্য টেট পাশ করা ন্যূনতম এবং বাধ্যতামূলক যোগ্যতা। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, টেট আবশ্যিক যোগ্যতা। কিন্তু সমস্যা হয়েছে ২০১১ পর্যন্ত শিক্ষকতায় নিযুক্তদের নিয়ে।
এর মধ্যেই গত সেপ্টেম্বর থেকেই কর্মরত প্রাথমিক ও উচ্চপ্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের জন্য টেট নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে রাজ্য। স্কুলশিক্ষা দফতরের তরফ থেকে, স্কুল সার্ভিস কমিশন ও প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের কাছে পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ জানতে চাওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে পর্ষদ থেকে তার উত্তরও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, টেট দিতে চাইলেও কি সব শিক্ষকেরা তা দিতে পারবেন? তা নিয়ে নতুন করে সঙ্কট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে দাবি তাঁদের।
শিক্ষকদের দাবি, আইন অনুযায়ী টেটে বসতে গেলে প্রাথমিকে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজন উচ্চমাধ্যমিকে নূন্যতম ৫০ শতাংশ এবং উচ্চপ্রাথমিকে শিক্ষকতা করতে হলে স্নাতকে ৫০ শতাংশ নম্বরের প্রয়োজন। কিন্তু ২০১১ সালের আগের নিয়ম অনুযায়ী সেই শতাংশ অনেক শিক্ষকেরই নেই। ২০০১ সালের আগে মাধ্যমিকের যোগ্যতাতেও অনেকে চাকরি পেয়েছেন। কিন্তু টেট দিতে হলে তাঁরা তো পরীক্ষায় বসতেই পারবেন না। সে ক্ষেত্রে কী হবে, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে।
এ ছাড়া, স্কুলের ‘নর্মাল সেকশন’ এবং ‘হায়ার সেকেন্ডারি সেকশন’-এ কর্মরত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে টেট প্রযোজ্য কি না তা-ও স্পষ্ট নয়। কারণ নর্মাল সেকশনের শিক্ষকেরাও উচ্চপ্রাথমিক স্তরে ক্লাস নেন। ইতিমধ্যে দফতরের কাছে এই বিষয়ে স্পষ্ট ভাবে জানতে চেয়ে চিঠিও দিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। এখনও উত্তর পাওয়া যায়নি।
নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ধ্রবশেখর মণ্ডল বলেন, ‘‘সমগ্র টেট প্রক্রিয়া নিয়েই আমাদের আপত্তি রয়েছে। বার বার আবেদন করা হয়েছে রাজ্যের তরফে কেন্দ্রকে এই বিষয়ে তাঁদের অবস্থান জানানো হোক। অন্য কয়েকটি রাজ্য বিধানসভায় বিষয়টি নিয়ে প্রস্তাবনা এনেছে। এই রাজ্য তা কেন করছে না? তাই এই অবস্থান। সব শিক্ষকদেরও এই কর্মসূচিতে আহ্বান জানিয়েছি।’’
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল জানান, সম্প্রতি কেন্দ্রের শিক্ষা দফতর একটি আরটিআই-এর উত্তরে জানিয়েছে, উচ্চমাধ্যমিকে ৫০ শতাংশ নম্বর থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ রাজ্যের বহু শিক্ষক, মূলত উচ্চপ্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের পঞ্চাশ শতাংশ নম্বর নেই। তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে চাকরি বাঁচানোর জন্য পরীক্ষায় টেট দিতে চাইলে ও টেট দিতে পারবেন না। অবধারিত ভাবে তাঁদের চাকরি যাবে। তিনি বলেন, ‘‘অধ্যাদেশ জারি করে এই নীতি বাতিল করা ছাড়া, কোনও উপায় নেই। অথচ, বিজেপি সেটাই করতে চাইছে না।”
