নেত্রকোনার সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ হত্যার কয়েক মাস আগেই নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা পুলিশকে জানিয়েছিলেন। জেলা পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেছিলেন, সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা তাকে হত্যার জন্য অপেক্ষা করছে। অপরাধ ও চোরাচালান নিয়ে সংবাদ প্রকাশের কারণে তিনি ঝুঁকিতে রয়েছেন বলেও জানিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কার মধ্যেই প্রাণ হারালেন এই সাংবাদিক।
গত বছরের নভেম্বর মাসে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলামের যোগদান উপলক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত পরিচিতি ও মতবিনিময় সভায় নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন আলিফ। সভায় তিনি জানান, বাইরে সশস্ত্র ব্যক্তিরা অবস্থান করছে এবং বাড়ি ফেরার পথে তাকে গুলি করার আশঙ্কা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সভার একটি ভিডিওতে আলিফকে বলতে শোনা যায়, তার কাছে বার্তা আসছে যে দুই ব্যক্তি অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় অপেক্ষা করছেন। তাদের একজনের কাছে পাঁচটি গুলিসহ একটি নাইন এমএম পিস্তল রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সভায় আলিফ আরও বলেন, তিনি সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে প্রতিবেদন করেন।
নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা এলাকায় চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত সশস্ত্র কয়েকটি চক্রের কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি সংবাদ প্রকাশ করেন। এসব চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি পুলিশ সুপারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পুলিশকে উদ্দেশ করে আলিফ বলেছিলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা না হলে তাকে হয় দেশ ছেড়ে যেতে হবে, নয়তো অপরাধীদের মোকাবিলায় অন্য পথ বেছে নিতে হবে। নিজের শ্বশুরবাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। তার আশঙ্কা ছিলো, এ ধরনের ঘটনা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা হিসেবেও ব্যবহার করা হতে পারে। বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উত্তরাইল এলাকার তেলনজিয়া গ্রামে একটি চায়ের দোকানের সামনে গুলিবিদ্ধ হন সাংবাদিক আলিফ। পরে তার মৃত্যু হয়।
নেত্রকোনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথ জানান, আলিফের শরীরে ছয়টি গুলির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পাঁচটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায়। একটি গুলি পিঠের ভেতরে আটকে ছিলো, যা ময়নাতদন্তের সময় বের করা হয়। চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, আলিফের বুকের অংশে তিনটি গুলির আঘাত ছিলো। এর মধ্যে দুটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায় এবং একটি পিঠের দিকে আটকে ছিল।
এ ছাড়া একটি গুলি কপালের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। অন্য দুটি গুলির আঘাত ছিল মাথার ওপরের অংশের চামড়া ও ডান কাঁধের পাশের চামড়ায়। ক্ষত পরীক্ষা করে চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে ধারণা করেন, আলিফকে সামনে থেকে গুলি করা হয়েছিল। আলিফ হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা অজ্ঞাতপরিচয় আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে। দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ জানান, ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, আলামত ও আলিফের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত পোস্টসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
নাইন এমএম পিস্তল দিয়ে তাকে গুলি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এদিকে, আলিফের মৃত্যুর পর ছড়িয়ে পড়া মতবিনিময় সভার ভিডিও সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলাম বলেন, তিনি যোগদানের দিনই আলিফ প্রাণনাশের আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। গত বছরের নভেম্বরে আলিফের ওপর হামলার ঘটনায় করা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। তবে বর্তমানে তারা জামিনে রয়েছেন।
আলিফ হত্যা মামলার তদন্তে আগের ওই ঘটনার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এদিকে স্বামীকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন আনন্দিতা সাংমা। তিনি জানান, ঘটনার সময় সন্তানদের খাওয়াচ্ছিলেন। প্রথমে গুলির শব্দ শুনে ভেবেছিলেন, কেউ হয়তো পটকা ফুটিয়েছে। কিছুক্ষণ পর লোকজনের কাছ থেকে স্বামীর ওপর হামলার খবর পান। আনন্দিতা বলেন, স্বামীকে আর ফিরে পাবেন না, তবে যারা তাকে হত্যা করেছে, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি। দুই অবুঝ সন্তানকে পিতৃহারা করার দায়ে অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও চান তিনি।
আলিফের দুই সন্তান রয়েছে, চার বছর বয়সী মেয়ে প্রান্তি ও দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ান। প্রায় ছয় বছর আগে নেত্রকোনার তেলনজিয়া গ্রামের আনন্দিতা সাংমাকে বিয়ে করেন তিনি। আলিফের বাড়ি কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে। তিনি তেলনজিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। আলিফ আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে নিয়মিত পোস্ট দিতেন তিনি। হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তদন্তের মাধ্যমে হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
বিআলো/অর্নব