প্রতীকী ছবি ছবি: Istock
Published on
:
3 min read
শতরূপা বসু
শরতের রঙে, শক্তির আরাধনায় আর উৎসবের আবেগে যখন কলকাতা মেতে উঠেছে, ঠিক তখনই শহরের এই সর্ববৃহৎ সাংস্কৃতিক উৎসবে এক নতুন মাত্রা যোগ করল অনন্য ডাচ শিল্প। নেদারল্যান্ডস এমব্যাসির 'রেমব্রান্ট রেসিডেন্সি' কর্মসূচির অংশ হিসেবে ভারত সফরে আসা ডাচ শিল্পী ফেমকা ভ্যান গেমার্টের তৈরি এক অসাধারণ শিল্পকর্মের (ইনস্টলেশন) উদ্বোধন করলেন রাষ্ট্রদূত মারিসা জেরার্ডস — বালিগঞ্জের একটি দুর্গাপুজোর মণ্ডপে।
'ফাইভ ওশেনস, ওয়ান ইটারনাল সোর্স অফ অল লাইফ' (পাঁচ মহাসাগর, জীবনের এক চিরন্তন উৎস) এই শিরোনামের শিল্পকর্মটিতে পরিত্যক্ত কাপড় ও মাছ ধরার জালের টুকরো ব্যবহার করে এক বিশাল, প্রবহমান ঢেউয়ের রূপ দিয়েছেন ফেমকা। সচরাচর উপেক্ষিত বা বর্জ্য হিসেবে গণ্য হওয়া উপকরণগুলো ব্যবহার করে ফেমকা এক দিকে যেমন মহাসাগরের গতিময়তা আর জীবনের পারস্পরিক সংযোগের কথা বলেছেন, তেমনই সমাজ কর্তৃক পরিত্যক্ত বস্তু থেকেও যে সৌন্দর্যের জন্ম হতে পারে, তারও এক অনন্য উদাহরণ তুলে ধরেছেন।
এই শিল্পকর্মটি কেবল একটি নান্দনিক আকর্ষণ নয়, এটি সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং সমসাময়িক ভাবনার যেন এক মিলন। ডাচ শিল্প-উদ্ভাবনের ঐতিহ্য এবং ভক্তি ও সৃজনশীলতার ভারতীয় উদযাপনের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন ফেমকা। দুর্গাপুজোর মণ্ডপে স্থাপিত হওয়ায় এই কাজের তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে উঠেছে — এখানে ঢেউগুলো যেন প্রকৃতি, সৃষ্টি এবং নবায়নের সেই সর্বজনীন শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে, যা জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হয়েছে।
রেমব্রান্টের ঐতিহ্য থেকে সমসাময়িক শিল্প-বিনিময়
সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এই আয়োজনের জন্য 'রেমব্রান্ট রেসিডেন্সি' কর্মসূচিটি এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। এই কর্মসূচির নামটি ডাচ স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী রেমব্রান্ট ভ্যান রাইনকে (১৬০৬–১৬৬৯) ঘিরে। আলো-ছায়া, মানুষের অভিব্যক্তি এবং আশেপাশের পরিবেশ, এই সব কিছু ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ইউরোপীয় শিল্পের ইতিহাস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
রেমব্রান্টের গুরুত্ব কেবল তাঁর কারিগরি দক্ষতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না অবশ্য। কী ভাবে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার আবেগঘন গভীরতাকে শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়, রেমব্রান্টের আর্ট সেই কথাই বলে। মানুষের মুখাবয়ব, অঙ্গভঙ্গি, প্রাত্যহিক জীবন এবং মানব-অস্তিত্বের জটিলতারও যে এক গভীর অর্থ আছে, রেমব্রান্টের প্রতিটি তুলির টান তার উদাহরণ।
ভ্যান গেমার্টের শিল্প-স্থাপনাটি (installation) সেই ভিন্ন শিল্প-যুগের প্রতিনিধিত্ব করেছে আর সেই সঙ্গে এর দৃশ্যভাষাটিও স্বতন্ত্র। তেলরং ও ক্যানভাসের পরিবর্তে তিনি পরিত্যক্ত বস্ত্র ও মাছ ধরার জাল নিয়ে কাজ করেন। কোনও আঁকা ছবির বদলে তিনি এমন এক ভাস্কর্যসুলভ ঢেউয়ের আকৃতি গড়ে তোলেন যা একটি উন্মুক্ত ও যৌথ জনপরিসরকে অধিকার করে থাকে। তবুও, এই ভিন্নধর্মী কাজের পদ্ধতির মধ্যে একটি অর্থবহ যোগসূত্র রয়েছে — দুটোই দর্শকদের নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
ভারত ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে শতাব্দীপ্রাচীন সংযোগ
বালিগঞ্জের এই শিল্প-সংযোগে ভারত ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে কয়েক শতাব্দী-প্রাচীন সম্পর্কেরও প্রতিফলন ঘটেছে। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ডাচ বণিকরা ভারতীয় উপমহাদেশে ল্যান্ড করেছিলেন এবং ১৬০২ সালে প্রতিষ্ঠিত 'ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি' এশিয়া জুড়ে সামুদ্রিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়।
বাংলায় ডাচদের উপস্থিতি গড়ে ওঠে হুগলি নদী তীরবর্তী বাণিজ্যিক বসতি ও নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। ঐতিহাসিক ভাবে ডাচ বসতি হিসেবে পরিচিত চুঁচুড়া এই অঞ্চলে ডাচ কার্যকলাপের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। বস্ত্র, মশলা ও অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্য ঘিরে গড়ে ওঠা এই সংযোগগুলো বাংলাকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।
তবে এই ইতিহাসকে তার সামগ্রিক ও জটিল প্রেক্ষাপটেই অনুধাবন করা প্রয়োজন। শুরুর দিকের বাণিজ্যিক যোগাযোগগুলো গড়ে উঠেছিল ইউরোপীয় বাণিজ্য কোম্পানিগুলোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ঔপনিবেশিক প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতার অসম সম্পর্কের ভিত্তিতে। তাদের উত্তরাধিকার কেবল সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির গল্প বলে না। তবুও, দীর্ঘদিনের এই যোগাযোগের ফলে মানুষ, শিল্প-ঐতিহ্য, ভাষা এবং জীবনযাত্রার মধ্যে আদান-প্রদানের নানা ক্ষেত্রও তৈরি হয়েছিল।
বর্তমানে ভারত ও নেদারল্যান্ডসের সম্পর্ক বাণিজ্য, শিক্ষা, বিজ্ঞান, জল-ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু-সংক্রান্ত পদক্ষেপ এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতার সমন্বয়ে এক আধুনিক অংশীদারিত্বে পরিণত হয়েছে।
'রেমব্রান্ট রেসিডেন্সি' এবং কলকাতার দুর্গাপুজোয় ভ্যান গেমার্টের অংশগ্রহণ — এই সমসাময়িক চেতনারই প্রতিফলন। ইতিহাসকে কেবল নথিপত্র ও স্মৃতিস্তম্ভের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে, এই আর্ট যেন শহরের দৈনন্দিন জীবনে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানকে উৎসবের আলোয় আরও উজ্জ্বল করেছে।