গ্রামের মুদিদোকানি, দিনমজুর, রিকশাচালক কিংবা শহরের নিম্নআয়ের কোনো মানুষ-অনেকের কাছে বাটন ফোন মানে শুধু একটি যোগাযোগের যন্ত্র। ফোনটি দিয়ে তারা কথা বলেন, খোঁজখবর নেন, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। ইন্টারনেট বা স্মার্টফোনের বাড়তি সুবিধা তাদের কাছে জরুরি নয়; জরুরি হলো, কম খরচে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ। অথচ টুজি মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এই মানুষগুলোর পরিচিত ফোনই একসময় অচল হয়ে পড়তে পারে। তখন নতুন ফোন কেনার সামর্থ্য না থাকলে যোগাযোগের সহজ মাধ্যমটিও তাদের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ বৈঠকের কার্যাপত্রের তথ্যানুযায়ী, ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে টুজি সেবা বন্ধের লক্ষ্য রয়েছে। এর আগে বাটন ফোনের যন্ত্রাংশ আমদানি এবং এসব ফোনের বাজারজাতকরণ বন্ধের পরিকল্পনার কথাও জানা গেছে।
জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ছয় কোটির বেশি বাটন ফোন চালু রয়েছে। ফলে এটি শুধু প্রযুক্তি পরিবর্তনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপুলসংখ্যক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, যোগাযোগের অধিকার এবং দেশীয় মোবাইলফোন শিল্পের ভবিষ্যৎ। ফোন আছে, বদলানোর সামর্থ্য কতজনের: বাটন ফোনের ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ সীমিত আয়ের মানুষ। তাদের অনেকে ফোন ব্যবহার করেন শুধু কল করা ও খুদে বার্তা পাঠানোর জন্য। দামি স্মার্টফোন কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আবার স্মার্টফোনের পর্দা, অ্যাপ কিংবা ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়াও সবার জন্য সহজ নয়।
টুজি বন্ধ হলে বিকল্প ফোন কেনার প্রয়োজন তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই ফোনের দাম যদি তাদের সামর্থ্যরে বাইরে থাকে, তাহলে কেউ কেউ নতুন ফোন কেনা পিছিয়ে দিতে পারেন। কারও ক্ষেত্রে যোগাযোগের ব্যবহার কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই প্রযুক্তির উন্নয়নের পাশাপাশি স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
চাহিদা থাকলে অবৈধ বাজার বাড়ার শঙ্কা: হ্যান্ডসেট নির্মাতাদের সংগঠন এমআইওবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে বাটন ফোনের চাহিদা ১০ লাখের বেশি।
এ প্রসঙ্গে সংগঠনটির সভাপতি জাকারিয়া শহীদ আমাদের সময়কে বলেন, গ্রাহকের প্রয়োজন, সামর্থ্য ও নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বিবেচনায় না নিয়ে পুরনো প্রযুক্তি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিলে এসব ব্যবহারকারী বিড়ম্বনায় পড়বে।
তিনি বলেন, যারা ফোরজি সুবিধা ব্যবহার করেন না, তাদের জোর করে নতুন প্রযুক্তির ফোন ব্যবহারে বাধ্য করা কিংবা তা ব্যবহার করতে না পারলে নেটওয়ার্কের বাইরে ঠেলে দেওয়া ঠিক হবে না। পুরো ব্যবস্থাপনা পরিষ্কার না করে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
জাকারিয়া শহীদ আরও বলেন, চাহিদা থাকলে সরবরাহ আসবেই-তা বৈধ পথে হোক কিংবা অবৈধ পথে। বৈধভাবে বাটন ফোন উৎপাদন ও আমদানি বন্ধ করা হলেও বাজারে চাহিদা থাকলে অনানুষ্ঠানিক বাজার বাড়তে পারে। এতে দেশীয় কারখানার উৎপাদন কমে যাওয়া, ব্যবসা সংকুচিত হওয়া এবং কর্মী ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য, সবার হাতে আধুনিক সেবা: অন্যদিকে সরকারের লক্ষ্য শুধু ভয়েস কল নয়, দেশের আরও বেশি মানুষকে ডেটা ও আধুনিক মোবাইল সেবার আওতায় আনা।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, দেশের সাত কোটি মানুষ এখনও ডেটা ব্যবহারের আওতায় আসেননি। তাদের ডেটা ব্যবহারে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে শহর, বন্দর
ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ফাইভজি সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং সবার জন্য উপযোগী দামে ডিভাইস সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরনো প্রযুক্তির তরঙ্গ ফোরজি ও ফাইভজিতে কাজে লাগানো গেলে নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রযুক্তির এই পরিবর্তনে স্বল্প আয়ের মানুষ যেন পিছিয়ে না পড়েন, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সাশ্রয়ী বিকল্প ছাড়া রূপান্তর কঠিন: টুজি বন্ধের আগে কম দামের ফোরজিসমর্থিত বাটন ফোনের পর্যাপ্ত সরবরাহ, সাশ্রয়ী ডেটা প্যাকেজ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্ভরযোগ্য নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দেশীয় নির্মাতারা যেন বিকল্প প্রযুক্তির ফোন উৎপাদনে যেতে পারেন, সে সুযোগও বিবেচনায় রাখতে হবে।
প্রযুক্তির অগ্রগতি তখনই সবার জন্য সুফল বয়ে আনবে, যখন তার সুবিধা নিতে গিয়ে কাউকে নিজের সামর্থ্যরে বাইরে খরচ করতে হবে না। ছয় কোটির বেশি বাটন ফোন ব্যবহারকারীকে কীভাবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করা হবে, তার সুস্পষ্ট বাস্তব পরিকল্পনা প্রয়োজন।
