এক মাঠে সারি সারি দুর্গাপ্রতিমা, চারপাশে মানুষের ঢল। কোথাও উলুধ্বনি আর বিদায়ের সুর, কোথাও নাগরদোলার ঘূর্ণি, শিশুদের উচ্ছ্বাস আর মিষ্টির দোকানে ক্রেতাদের ভিড়। ধর্মীয় আচার আর লোকজ উৎসবের এমন মেলবন্ধনই মানিকগঞ্জের ঘিওরের ২০২ বছরের ঐতিহ্যবাহী সম্প্রীতির মেলার পরিচয়। বিজয়া দশমীকে ঘিরে বসা এই মেলা এখন কেবল কেনাবেচার আয়োজন নয়, নানা ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষের এক বর্ণিল মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে ঘিওর দুর্গা নারায়ণ (ডি.এন.) পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে শুরু হওয়া এ মেলায় সর্বস্তরের মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের আয়োজনে তিন দিনব্যাপী এ মেলা চলবে আগামী শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেল পর্যন্ত। স্থানীয়দের কাছে এটি বিজয়া দশমীর মেলা হিসেবেও পরিচিত।
মেলার মাঠজুড়ে বসেছে মাটির খেলনা, কাঠের তৈজসপত্র, নাগরদোলা, হরেক রকম মিষ্টি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দোকান। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণ—সব বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মেলাটি দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীকে রূপ নিয়েছে।
এ মেলার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে দুর্গাপূজার প্রতিমা বিসর্জনের ঐতিহ্য। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলা সদরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জনের আগে বিদ্যালয় মাঠে জড়ো করা হয়। পুরোনো ধলেশ্বরী নদীর তীরবর্তী এই এলাকায় শেষবারের মতো প্রতিমা দর্শনে ভিড় করেন সনাতন ধর্মালম্বীরা। বিসর্জনের সময় নারীদের উলুধ্বনি ও আবেগঘন পরিবেশে বিদায়ের বেদনা ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। পরে প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে মেলা ও মানুষের মিলনমেলায় যোগ হয় অন্য মাত্রা।
মেলায় আসা দর্শনার্থী পূজা সাহা ও জয়া সাহা জানান, ছোটবেলা থেকেই বিজয়া দশমীর দিন তাঁরা এই মেলায় আসেন এবং বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে আনন্দ উপভোগ করেন। একসঙ্গে অনেক দুর্গাপ্রতিমা দেখার সুযোগ এবং মেলার সঙ্গে বহু স্মৃতি জড়িয়ে থাকায় দিনটি তাঁদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকান। রসগোল্লা, জিলাপি, অমৃতি, খাজা, গজা ও ক্ষীরের চপসহ নানা পদের সুস্বাদু মিষ্টি কিনতে ক্রেতারা ভিড় জমান। অনেক পরিবার আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে উপহার হিসেবেও মেলার মিষ্টি নিয়ে যান।
দীর্ঘদিন ধরে মিষ্টি ব্যবসা করে আসা অজিত কুমার ঘোষ বলেন, বাবার হাত ধরে এই মেলায় মিষ্টি বিক্রি শুরু করেছিলেন। বাবা মারা যাওয়ার পরও প্রায় ৩৫ বছর ধরে তিনি নিয়মিত এখানে আসছেন। এবারের মেলায় তাঁর প্রায় ৭০ হাজার টাকার রসগোল্লা ও জিলাপি বিক্রি হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী বিপ্লব কুমার সাহা উল্লেখ করেন, বিজয়া দশমীতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ এই মাঠে সমবেত হন। মেলা শেষে উপজেলা সদরের বিভিন্ন মণ্ডপের প্রতিমা ধলেশ্বরীর পানিতে বিসর্জন দেওয়া হয়, যা এক আবেগঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে।
ঘিওর উপজেলা পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি শচীন্দ্র নাথ মিত্র বলেন, “বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান কোনো বিশেষ ধর্মের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রায় ২০২ বছর ধরে বিজয়া দশমীতে এ মেলা বসছে। সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে মেলাটি আমাদের সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।”
ঘিওর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অহিদুল ইসলাম টুটুল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ মেলায় সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে আনন্দ করেন। এই সর্বজনীন আয়োজন স্থানীয় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে।
উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন ভুঁইয়া জানান, মেলাটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মিলনস্থল। এই আয়োজন শান্তিপূর্ণ ও নির্বिঘ্ন রাখতে উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা স্বেচ্ছাশ্রম ও সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে আসছেন।
মেলার সার্বিক নিরাপত্তা প্রসঙ্গে ঘিওর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ মুহাম্মদ কবীর বলেন, মেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ বাহিনী দায়িত্ব পালন করছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই আয়োজনের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে উজ্জ্বল করে তুলেছে।
এ সময় মেলায় উপস্থিত ছিলেন ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাশিতা-তুল ইসলাম, শিবালয় সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাদিয়া সাবরিনা, ঘিওর উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি আব্দুল আলীম খান মনোয়ার, সাধারণ সম্পাদক কাজী ওয়াজেদ আলী মিস্টার, সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন ভুঁইয়া, ঘিওর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মীর কায়ছার হামিদ এবং ঘিওর ডি.এন. পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান সিকদারসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা ঘিওরের এই সম্প্রীতির মেলা প্রমাণ করে, উৎসবের আনন্দ মানুষের মধ্যে কোনো বিভেদ তৈরি করে না, বরং তা গড়ে তোলে সৌহার্দ্য ও ঐক্যের এক অবিচ্ছেদ্য সেতুবন্ধ।
জেএইচআর
