গাছের বুকে পেরেকের ক্ষত, সেই ক্ষতের ওপর ঝুলছে বিজ্ঞাপন। কোথাও চিকিৎসাসেবার প্রচার, কোথাও কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থী ভর্তির বিজ্ঞপ্তি, আবার কোথাও সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধিদের শুভেচ্ছাবার্তা। মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের এই প্রতিযোগিতায় সড়কের পাশের গাছগুলো যেন পরিণত হয়েছে বিনা খরচের বিজ্ঞাপন বোর্ডে। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে গাছে গাছে পেরেক ঠুকে সাইনবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন লাগানোর এমন দৃশ্য এখন পরিচিত। এতে একদিকে গাছের বাকল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে মøান হচ্ছে এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। প্রচারণার সাময়িক সুবিধা নিতে গিয়ে প্রকৃতির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।
কমলগঞ্জ পৌর এলাকা, মুন্সিবাজার, শমশেরনগর ও আদমপুরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সড়কের পাশের গাছগুলোয় চোখে পড়ে নানা ধরনের বিজ্ঞাপন। লোহার পেরেক ঠুকে গাছের গায়ে লাগানো হয়েছে সাইনবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার। নববর্ষ, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে শুভেচ্ছাবার্তার পাশাপাশি বিভিন্ন চিকিৎসক, চিকিৎসাসেবাকেন্দ্র, কোচিং সেন্টার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রচারও স্থান পেয়েছে গাছের গায়ে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারণামূলক সাইনবোর্ডও বাড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর ধরে কমলগঞ্জে গাছে বিজ্ঞাপন লাগানোর প্রবণতা বাড়ছে। আগে এ ধরনের সাইনবোর্ড ছিল হাতেগোনা। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির প্রচারণার পরিধি বাড়ার পাশাপাশি গাছকে বিজ্ঞাপনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতাও বেড়েছে। বিভিন্ন দিবস, সামাজিক অনুষ্ঠান ও নির্বাচনী প্রচারকে কেন্দ্র করে গাছের গায়ে নতুন নতুন বিজ্ঞাপন যুক্ত হচ্ছে। একবার পেরেক ঠুকে বিজ্ঞাপন লাগানোর পর তা দীর্ঘদিন ঝুলে থাকায় গাছের ক্ষত যেমন দৃশ্যমান হচ্ছে, তেমনি সড়কের পাশের সবুজের স্বাভাবিক সৌন্দর্যও ব্যাহত হচ্ছে।
শুধু সড়কের
পাশেই নয়, স্কুল-কলেজের সামনের গাছেও চিকিৎসাসেবা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন টাঙানো হচ্ছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত কিছু বিজ্ঞাপন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে লাগানোয় শিক্ষার্থীদের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে স্থান ও পরিবেশের উপযোগিতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
পরিবেশকর্মীদের মতে, গাছের গায়ে পেরেক ঠুকলে বাকল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাকল গাছের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর ক্ষতস্থান দিয়ে রোগজীবাণু ও পচন সৃষ্টিকারী অণুজীব প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ক্ষতির মাত্রা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, গাছ দুর্বল হয়ে পড়া এবং দীর্ঘমেয়াদে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পেরেকের পাশাপাশি তারকাঁটা দিয়ে বিজ্ঞাপন আটকে রাখলেও গাছের ক্ষতি হতে পারে। তাই প্রচারণার জন্য গাছকে ব্যবহার না করে নির্ধারিত বিজ্ঞাপন বোর্ড কিংবা বিকল্প প্রচারমাধ্যম বেছে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
সেভ ওয়াইল্ড লাইফ অ্যান্ড ন্যাচার মৌলভীবাজার ইউনিটের সভাপতি মো. আহাদ মিয়া, পরিবেশকর্মী নুরুল মোহাইমিন মিল্টন এবং সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী নির্মল এস পলাশ ও সাইদুল ইসলাম বলেন, কমলগঞ্জের গাছগুলো এখন নানা ধরনের আঘাতের শিকার হচ্ছে। গাছেরও জীবন আছে। তাই গাছের ক্ষতি করে বিজ্ঞাপন প্রচার করা অনুচিত। গাছে পেরেক ঠুকলে ক্ষত সৃষ্টি হয়, যা একপর্যায়ে গাছের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। গাছ রক্ষায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
লেখক, গবেষক ও কবি আব্দুস সামাদ বলেন, গাছ মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন। গাছ অক্সিজেন সরবরাহ করে, পরিবেশ শীতল রাখে এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিজ্ঞাপন প্রচারের নামে এসব গাছের ক্ষতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রচারের বিকল্প পদ্ধতি বেছে নিয়ে গাছ রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, যেন আগামী প্রজন্মের জন্য সবুজ ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ তালুকদার বলেন, গাছে পেরেক ঠুকে সাইনবোর্ড লাগালে ক্ষতস্থান দিয়ে পচন ধরতে পারে এবং ধীরে ধীরে গাছ মারা যেতে পারে। এতে পরিবেশের ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গাছের ক্ষতি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এ বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো যেতে পারে।
পরিবেশকর্মীদের মতে, গাছে বিজ্ঞাপন লাগানোর প্রবণতা বন্ধে শুধু সচেতনতার আহ্বান যথেষ্ট নয়; বিকল্প প্রচারমাধ্যমের ব্যবহারও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট স্থানে বিজ্ঞাপন বোর্ড স্থাপন, অনুমোদিত স্থানে ব্যানার-ফেস্টুন লাগানো এবং ডিজিটাল প্রচারমাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে প্রচারণার সুযোগ রাখা যেতে পারে। একই সঙ্গে গাছের গায়ে পেরেক ঠুকে বিজ্ঞাপন লাগানোর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে ব্যবসায়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাসেবাকেন্দ্র ও সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধিদের সচেতন করা জরুরি। মানুষের প্রচারণার প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে গাছের ক্ষতি যেন স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
