ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সাধারণত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র, নিয়মিত নির্বাচন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং বিপুলসংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণের কথা সামনে আসে। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কেবল কতজন মানুষ ভোট দেন, তার ওপর নির্ভর করে না।
ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সাধারণত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র, নিয়মিত নির্বাচন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং বিপুলসংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণের কথা সামনে আসে। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কেবল কতজন মানুষ ভোট দেন, তার ওপর নির্ভর করে না। একজন যোগ্য নাগরিক ভোটার তালিকায় নিজের নাম খুঁজে পাবেন কি না, নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করতে পারবেন কি না এবং সরকারকে চ্যালেঞ্জ করলে তাঁর অধিকার সুরক্ষিত থাকবে কি না- গণতন্ত্রের মানদণ্ড বিবেচনায় এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা সে মৌলিক প্রশ্নগুলোই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
সর্বশেষ শনিবার দিলীøতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) উদ্যোগে ঘোষিত ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি রাজনৈতিক বিক্ষোভের ঘটনা নয়। যন্তর মন্তরে সমাবেশের অনুমতি না পাওয়া, রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন, হাজার হাজার মানুষকে আটক, পরিবহন চলাচলে বিধিনিষেধ এবং মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখার মতো পদক্ষেপ একসঙ্গে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধ এখন প্রশাসন, রাজনৈতিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির বৃহত্তর বিতর্কে রূপ নিয়েছে। আরো সহজ করে বললে সরকারের একগুয়ে মনোভাবের কারণে রাষ্ট্র তার সর্বশক্তি নিয়ে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
এখানে দুটি প্রশ্ন আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, এসআইআরের মাধ্যমে ভোটার তালিকা সংশোধন কতটা নির্ভুল, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত হচ্ছে? দ্বিতীয়ত, এ প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানানো নাগরিক ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিবাদ মোকাবিলায় রাষ্ট্র কতটা সংযত ও দায়িত্বশীল আচরণ করছে? বলাই বাহুল্য যে, যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য নির্ভুল ভোটার তালিকা অপরিহার্য। ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা নির্বাচন পরিচালনার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ভারতের নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, এসআইআর প্রক্রিয়ায় ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। কমিশনের দাবি, এর মধ্যে মৃত ব্যক্তি, অন্যত্র চলে যাওয়া ভোটার, একাধিকবার থাকা নাম এবং যাচাইয়ের সময় যাঁদের খুঁজে পাওয়া যায় নি, তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কমিশন আরও বলেছে, যোগ্য কোনো ভোটারের নাম ভুল করে বাদ পড়লে তিনি পুনরায় আবেদন করতে পারবেন। নীতিগতভাবে এসব যুক্তি অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। ভোটার তালিকায় ভুল থাকলে তা সংশোধন করা দরকার। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে: সংশোধনের প্রক্রিয়ায় ভুলভাবে বাদ পড়া যোগ্য ভোটারের সংখ্যা কত? তাদের শনাক্ত করার নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা কী? যারা নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় নথি দিতে পারেন নি, যাদের ঠিকানা বদলেছে কিংবা যাঁরা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে যাচাইপ্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন নি, তাদের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হবে?
এরই মধ্যে ভোটার তালিকায় ত্রুটি, মোদি সরকারের সাথে হট কানেকশনসহ আরো বেশ কিছু অভিযোগে বিরোধী দলগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি তুলেছে। বিশেষ করে ভারতে এখন নির্বাচন কমিশন বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টি নামের যুব প্রজন্মের একটি প্লাটফম। তাদের সাথে যোগ দিয়েছে সিভিল সোসাইটির একাংশ। তবে ভারতের বলিউড সেলিব্রিটিরা এখনো পর্যন্ত নিরবতা পালন করছেন। ককরোচ জনতা পার্টি এরই মধ্যে একাধিক শহরে প্রোগ্রাম সম্পন্ন করে গত ১০ অক্টোবর তথা শনিবারে ভারতের রাজধানী যন্তরমন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল। কিন্তু সেখানে বড় সমাবেশের অনুমতি দেয় নি কর্তৃপক্ষ।
সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত দিলীøতে প্রায় ছয় হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। তাদের রাখার জন্য আগে থেকেই ১০টি স্টেডিয়াম ও জিমনেশিয়াম প্রস্তুত রাখা হয়েছিল বলে জানা গেছে। রাজধানীতে প্রায় ৩৫ হাজার পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। বিক্ষোভকারীরা যেন যন্তরমন্তরে না আসতে পারে তা নিশ্চিত করতে ৪৫টি মেট্রোস্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। বহু ট্রেনযাত্রা বাতিল করা হয় এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশনে চলাচল সীমিত করা হয়। জনপথ ও কর্তব্যপথের সংযোগস্থলের আশপাশের নির্দিষ্ট এলাকায় ২৪ ঘণ্টার জন্য মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়। এই পরিসংখ্যানগুলো শুধু নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যাপকতা বোঝায় না; নাগরিক জীবনের ওপর তার সম্ভাব্য প্রভাবও সামনে আনে।
শনিবারের অভিযানে কয়েকজন পরিচিত রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্বের আটকের খবর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে মুম্বাই থেকে দিল্লীতে পৌঁছানোর পর উড়োজাহাজের ভেতর থেকে আটক করা হয়। দলটির নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকেও আটক করা হয়। সিজেপির কর্মসূচিতে অংশ নিতে তিন দিন আগে জার্মানি থেকে ভারতে আসা জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে গুরুগ্রামের বাসা থেকে আটক করা হয়। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক নেহা বোরাকেও আটক করা হয়। পরে মুক্তি পেয়ে নেহা এক্সে জানান, পুলিশ তাঁর ফোন নিয়ে গিয়েছিল, পরে সেটি ফেরত দিয়েছে। ময়দান গড়ি থানা থেকে নারীদেরও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। দিলীøতে কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন ও ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকে আটক করার খবর আসে। দিলীøর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে তাঁর বাসার সামনে থেকে আটক করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও আটক হন বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। পরে মমতা ও কেজরিওয়ালকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সিপিআই(এম)-এর এম এ বেবি, রাজ্যসভার সদস্য জন ব্রিটাসসহ আরও কয়েকজন বামপন্থী নেতাকে আটক করা হয়। সাবেক দিলীø উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়াকে চণ্ডীগড়ে আটক করা হয়েছে বলে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে। এ ছাড়া রয়টার্সের একজন সাংবাদিককে সাময়িকভাবে আটক করা হয় এবং দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কয়েকজন সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী আটকের খবর জানিয়েছে।
মনে রাখা দরকার- ছাত্র আন্দোলন কেবল কোনো নির্দিষ্ট দাবি আদায়ের সংগ্রাম নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করার বিরুদ্ধে বৃহত্তর গণজাগরণের সূচনা করে। বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, ফ্রান্সে তরুণদের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে চলমান প্রতিবাদ এবং ভারতে শিক্ষার্থী ও তরুণদের রাজনৈতিক আন্দোলনকে একই ধরনের ঘটনা হিসেবে সরাসরি অভিহিত করা না গেলেও, এসব অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি সাধারণ শিক্ষা রয়েছে আর তাহলো কোনো সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলেই জনগণের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ চিরস্থায়ী হয়ে যায় না। বরং ক্ষমতা যত বেশি কেন্দ্রীভূত হয়, জবাবদিহিতা ততই দুর্বল হয়। আবার জনগণের ন্যায়সংগত দাবিকে যত বেশি উপেক্ষা করা হয়, শাসক ও শাসিতের মধ্যে দূরত্ব ততই বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে সেই দূরত্বই ব্যাপক জনঅসন্তোষের জন্ম দেয়, যা ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে বা অংশগ্রহণে বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন এ বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ছাত্রসমাজের প্রতিবাদ যখন বৈষম্য, অধিকার, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা শুধু শিক্ষার্থীদের নিজস্ব দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও নিজেদের বঞ্চনা, ক্ষোভ ও প্রত্যাশার প্রতিফলন সেই আন্দোলনের মধ্যে খুঁজে পেতে পারেন। ফলে একটি নির্দিষ্ট ইস্যুতে শুরু হওয়া প্রতিবাদ ক্রমে জাতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন যখন ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে মানুষের মধ্যে গভীর প্রশ্ন তৈরি হয়, তখন দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী বলে বিবেচিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাও গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। আর সরকারের প্রশাসনিক শক্তি, রাজনৈতিক সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ কিংবা দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকাঠামোই শেষ পর্যন্ত তার স্থায়িত্বের একমাত্র নিশ্চয়তা নয় এরও প্রমাণ মিলেছে বাংলাদেশে।কারণ জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেললে এসব শক্তির কার্যকারিতাও রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
ভারতের ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থী, তরুণ ও নাগরিকদের বিভিন্ন আন্দোলন রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। কোনো সরকার যদি বিরোধী মতকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে, সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র বলে প্রত্যাখ্যান করে এবং নাগরিকদের ন্যায়সংগত দাবির জবাব দেওয়ার পরিবর্তে কেবল ক্ষমতা প্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে রাজনৈতিক অসন্তোষ আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক নেতারা কখন নিজেদের জনগণের ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে করতে শুরু করেন? সাধারণত যখন কোনো দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের ওপর তার প্রভাব বেড়ে যায় এবং রাজনৈতিক বিরোধিতাকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করার পরিবর্তে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা তৈরি হয়, তখন ক্ষমতাসীনদের মধ্যে আত্মতুষ্টি জন্ম নিতে পারে। তারা মনে করতে পারে, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, দলীয় সংগঠন, অর্থনৈতিক প্রভাব কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ তাদের ক্ষমতাকে স্থায়ী করে দিয়েছে। জনগণের অসন্তোষকে তারা তখন সাময়িক বিরক্তি হিসেবে দেখতে পারে, সমালোচনাকে বিরোধীদের অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিতে পারে এবং প্রতিবাদকারীদের দাবি শোনার পরিবর্তে তাদের দমন করার পথ বেছে নিতে পারে। বাংলাদেশেও আওয়ামী শাসনের বিরুদ্ধে তাই ঘটেছিল আর ভারতেও এখন তাই হচ্ছে। রাজনীতির ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, রাষ্ট্রের বাহ্যিক শক্তি ও জনগণের প্রকৃত সমর্থন এক বিষয় নয়। একটি সরকার প্রশাসনিকভাবে শক্তিশালী হয়েও রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। আর সেই বিচ্ছিন্নতা দীর্ঘস্থায়ী হলে সামান্য কোনো ঘটনা বা নির্দিষ্ট দাবিকে কেন্দ্র করেই জমে থাকা অসন্তোষ বিস্ফোরিত হতে পারে।
স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, এটি ক্ষমতাকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে চায়। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সরকার ভুল করতে পারে, কিন্তু সেই ভুল সংশোধনের জন্য সংসদ, বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যম, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ এবং নির্বাচনের মতো প্রাতিষ্ঠানিক পথ থাকার কথা। এসব কাঠামোগুলো দুর্বল হয়ে পড়লে জনগণের অসন্তোষ প্রকাশের স্বাভাবিক সুযোগও সংকুচিত হয়। সরকার যদি সমালোচনা সহ্য করতে না পারে, বিরোধী দলকে যথাযথ রাজনৈতিক পরিসর না দেয়, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করে কিংবা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে অযৌক্তিকভাবে দমন করে, তাহলে মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের স্বাভাবিক পথগুলো বন্ধ হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে যে, ছাত্র আন্দোলন রাজনীতিবিদদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। রাজনৈতিক দল জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসে যদি সেই জনগণের কণ্ঠস্বরকেই উপেক্ষা করে, তাহলে ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। আর যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের অভিযোগ শোনার ও ভুল সংশোধনের কার্যকর পথ হিসেবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তখন রাজপথই অনেকের কাছে প্রতিবাদের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে শুরু হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছাত্র ও তরুণদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা তাই একটি বৃহত্তর সত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। রাজনৈতিক ক্ষমতা শক্তিশালী হতে পারে, কিন্তু তা সীমাহীন নয়; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রভাবশালী হতে পারে, কিন্তু জনগণের অধিকারকে চিরকাল উপেক্ষা করতে পারে না। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, যে শাসক জনগণের আস্থাকে নিজের ক্ষমতার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেন, তাঁর স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা বেশি। আর যিনি জনগণকে ভয় দেখিয়ে, সমালোচনাকে দমন করে এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রেখে শাসন করতে চান, তিনি নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকেই অনিশ্চিত করে তোলেন। নরেন্দ্র মোদি যেহেতু জনগণের ওপর দমনের পথকেই বেছে নিয়েছেন তাই স্বভাবতই বিজেপির টানা তিন মেয়াদের শাসনের চুড়ান্ত পরিণতি এখন অনেকটাই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে গিয়েছে। বাকিটা সময় গেলে আরো পরিস্কার হয়ে যাবে।
