সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনাকে ‘শিক্ষা’ হিসেবে দেখছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, প্রত্যেক প্রবাসীর উচিত যে দেশে কাজ করেন, সেই দেশের আইনকানুন মেনে চলা। তবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি আরব সরকারের কাছ থেকে এখনো বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক তথ্য পায়নি বাংলাদেশ।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘সৌদি আরবে দু’জন বাংলাদেশিকে দেশটির আইনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। আমরা ১৪ অক্টোবর বিষয়টি জানতে পেরেছি। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সৌদি আরবে আমাদের মিশন এ ব্যাপারে অবগত ছিল না। এ কারণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সৌদি আরব সরকারকে বিস্তারিত জানানোর জন্য একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
এ ঘটনা জানার পর বাংলাদেশ মিশন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কেও চিঠি দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সৌদি সরকার থেকে মিশন যতটুকু তথ্য জানতে পেরেছে, তা দিয়ে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কারণ, এ ঘটনায় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়েরও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। দুজন বাংলাদেশি কাজ করতে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এখনো সৌদি আরব সরকারের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানতে পারিনি। আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, সৌদি আরবের নিজস্ব আইনি কাঠামো রয়েছে। সেখানে কেউ অন্যায় বা গর্হিত কোনো কাজ করলে দেশটির আইন অনুযায়ী শাস্তি কার্যকর করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মিশনের শ্রমকল্যাণ উইং থেকে যে বার্তা এসেছে, সেখানে বলা হয়েছে—মক্কা নগরের একটি মসজিদের অভ্যন্তরে তারা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছিলেন। সৌদি আরবের আইনি কাঠামোয় এটিকে গর্হিত কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকতে পারে এবং দেশটির আইন অনুযায়ী আদালত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।’
শামা ওবায়েদ বলেন, ‘আমাদের মনে হচ্ছে, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো তথ্য পাইনি। ঘটনাটি আসলে কী, তারা কবে সেখানে কাজ করতে গিয়েছিলেন, বাংলাদেশে তাদের পরিচয় কী—এসব বিস্তারিত জানার জন্য আমরা চিঠি দিয়েছি।’
নিহতদের পরিচয় ও মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তাদের নাম জানি। তবে তারা কত দিন ধরে সেখানে কাজ করছেন, তাদের নিয়োগকর্তা কে ছিলেন এবং কী ঘটেছিল, সেসব বিস্তারিত জানার জন্যই চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠির জবাব পাওয়ার পর আমরা বলতে পারব, কবে এবং কীভাবে মরদেহ দেশে আনতে পারব।’
তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন, যুদ্ধের কারণে সৌদি আরবে সম্প্রতি আমাদের আরও দুজন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও চলছে। এ ক্ষেত্রে সৌদি আরব ও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কিছু সরকারি আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে, সেগুলোর কাজ চলছে।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সৌদি আরব সরকারের কাছ থেকে ঘটনাটি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়ার পর মরদেহ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে পারব।’
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস আগে থেকে অবগত ছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি কখন, কীভাবে ঘটেছে, সে বিষয়ে আমাদের মিশন অবগত ছিল না। কেন তারা আগে জানতে পারেনি, তা বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার আগে বলতে চাই না। সৌদি সরকার আমাদের বিস্তারিত জানালে বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে বলতে পারব। তবে আমরা আগে জানতে পারলে হয়তো সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে পারতাম।’
প্রবাসীদের আইন মেনে চলার গুরুত্ব তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘২০২৬ সাল হোক আর ২০৩৬ সাল হোক, সব দেশেরই একটি আইনি কাঠামো থাকে। সৌদি আরবের নিয়মকানুন ও বিচারব্যবস্থা বহু বছর ধরেই একইভাবে চলে আসছে। প্রবাসী ভাইবোনেরা কষ্ট করে নিজেদের অর্থ ব্যয় করে বিদেশে চাকরি করতে যান। তাদের সব সময় মনে রাখা উচিত, যে দেশে কাজ করবেন, সেই দেশের আইনকানুন মেনে চলতে হবে। যখন আইনের ব্যত্যয় ঘটে, তখন আমাদের নাগরিকদের জন্য অনেক কিছু করার সুযোগ থাকে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদেশিরাও বাংলাদেশে এসে অন্যায় করলে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী তাদের কারাদণ্ড হতে পারে। তারা জেলে যেতে পারেন। যে দেশে যারা থাকবেন, সেই দেশের আইনই প্রযোজ্য হবে। সুতরাং, এটিও আমাদের জন্য একটি লেসেন (শিক্ষা) হতে পারে। তবে ঘটনাটি অবশ্যই দুর্ভাগ্যজনক। এ ধরনের খবর আমরা পেতে চাই না।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সৌদি আরব সরকারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমরা একটু অপেক্ষা করি, তাদের জবাব পাই। এরপর বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বলতে পারব।’
উল্লেখ্য, সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) গত বুধবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য জানায়। তারা হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতার।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক ও অশালীন কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগে সৌদি নিরাপত্তাবাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে আদালতে পাঠানো হয়। শরিয়াহ আইনের অধীন ‘তাআজির’ বা বিচারকের স্বেচ্ছাধীন শাস্তির বিধানে আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন।
