বিশেষ অনুসন্ধান-লটারিতে নাম না ওঠায় রুবেল রাসেল ২০০৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাজউক থেকে তাদের জামানতের টাকা ফেরত তুলে নেন। টাকা তুলে নেওয়ার সাথে সাথেই তাদের ওই আবেদন দুটি আইনগতভাবে পুরোপুরি বাতিল ও তামাদি হয়ে যায়।
লাবণ্য চৌধুরী : লটারিতে নাম ওঠেনি, জামানতের টাকাও তুলে নিয়েছিলেন পারটেক্স গ্রুপের তখনকার দুই পরিচালক শওকত আজিজ রাসেল ও আশফাক আজিজ রুবেল। ফলে নিয়মানুযায়ী তাদের করা প্লটের আবেদনটি সম্পূর্ণ বাতিল ও ক্লোজ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অদৃশ্য এক ক্ষমতার জাদুতে সেই বাতিল ফাইলই অলৌকিকভাবে জ্যান্ত হয়ে ওঠে রাজউকের বোর্ডে। কোনো যাচাই কমিটি বা লটারি ছাড়াই স্রেফ ক্ষমতার অপব্যবহার করে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে এই দুই ভাইকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ১০ কাঠা করে মোট ২০ কাঠার দুটি মহা-মূল্যবান প্লট।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ইতিহাসে অন্যতম এই চাঞ্চল্যকর প্লট জালিয়াতি ও দুর্নীতির মামলায় অবশেষে রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল উদ্দিন চৌধুরী, আম্বার গ্রুপের এমডি শওকত আজিজ রাসেল এবং সিটি ব্যাংকের তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান আশফাক আজিজ রুবেলসহ সিন্ডিকেটের ৮ আসামির প্রত্যেককে দুটি ভিন্ন ধারায় ৭ বছর করে মোট ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সাথে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৯-এর বিচারক মো. আব্দুস সালাম পূর্বাচলের সেক্টর-১-এর রোড-৪০৫-এর ০১১ ও ০১৩ নম্বর প্লট দুটির বরাদ্দ বাতিল করে রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার ঐতিহাসিক নির্দেশ দিয়েছেন।
রাজউকের সেই ৫ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও জালিয়াতি সিন্ডিকেট:
তৎকালীন প্রভাবশালী বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য এম এ হাসেমের দুই ছেলেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই অবৈধ প্লট পাইয়ে দিতে রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ইকবাল উদ্দিন চৌধুরীর সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন দণ্ডপ্রাপ্ত রাজউকের আরও ৫ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এই ৫ শীর্ষ কর্মকর্তা হলেন:
১. এস. ডি. ফয়েজ (রাজউকের সাবেক সদস্য-উন্নয়ন)
২. এ. কে. এম. ওয়াহেদুল ইসলাম (রাজউকের সাবেক সদস্য-পরিকল্পনা)
৩. এস. এম. জাফর উল্লাহ (রাজউকের সাবেক সদস্য-অর্থ)
৪. এইচ. এম. জহুরুল হক (রাজউকের সাবেক সদস্য-প্রশাসন ও ভূমি)
৫. মো. রেজাউল করিম তরফদার (রাজউকের সাবেক সদস্য-এস্টেট)
২. এ. কে. এম. ওয়াহেদুল ইসলাম (রাজউকের সাবেক সদস্য-পরিকল্পনা)
৩. এস. এম. জাফর উল্লাহ (রাজউকের সাবেক সদস্য-অর্থ)
৪. এইচ. এম. জহুরুল হক (রাজউকের সাবেক সদস্য-প্রশাসন ও ভূমি)
৫. মো. রেজাউল করিম তরফদার (রাজউকের সাবেক সদস্য-এস্টেট)
আদালত এই রাজউক কর্মকর্তা এবং প্লটগ্রহীতা দুই ভাইসহ ৮ আসামির প্রত্যেককে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় (অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ) দোষী সাব্যস্ত করে দুই ধারায় ১০ লাখ টাকা করে মোট ২০ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। তবে দুই ধারার সাজা একসঙ্গে চলায় আসামিদের মূলত ৭ বছর জেল খাটতে হবে।
যেভাবে হয়েছিল এই জালিয়াতি অনুসন্ধানী বিবরণ:
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার নথিপত্র এবং আদালত সূত্রে এই জালিয়াতির আদ্যোপান্ত জানা যায়:
- ২০০১ সালের প্রথম আবেদন: ২০০১ সালের ২৩ আগস্ট শওকত আজিজ রাসেল ও আশফাক আজিজ রুবেল তৎকালীন শিল্পপতি কোটায় পূর্বাচল প্রকল্পে ১০ কাঠার দুটি প্লটের জন্য আবেদন করেন। নিয়ম অনুযায়ী জামানত হিসেবে দেড় লাখ করে মোট ৩ লাখ টাকা জমা দেন তারা।
- লটারিতে ব্যর্থতা ও ফাইল বাতিল: রাজউকের প্রথম পর্যায়ের সেই প্লট বরাদ্দের লটারিতে এই দুই ভাইয়ের ভাগ্য খোলেনি। লটারিতে নাম না ওঠায় তারা ২০০৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাজউক থেকে তাদের জামানতের টাকা ফেরত তুলে নেন। টাকা তুলে নেওয়ার সাথে সাথেই তাদের ওই আবেদন দুটি আইনগতভাবে পুরোপুরি বাতিল ও তামাদি হয়ে যায়।
- বাবার রাজনৈতিক প্রভাব: ২০০১ থেকে ২০০৪ সালের ওই সময়ে রাসেল ও রুবেলের বাবা এম এ হাসেম ছিলেন নোয়াখালী-২ আসনের তৎকালীন শাসক দল বিএনপির প্রভাবশালী সংসদ সদস্য (এমপি)। বাবার এই চরম রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে পর্দার আড়ালে শুরু হয় ভিন্ন খেলা।
- বোর্ড সভার অবৈধ ম্যাজিক: কোনো নতুন আবেদন বা সিলেকশন কমিটির সুপারিশ ছাড়াই ২০০৪ সালের ২ জুন রাজউকের ৮ম বিশেষ বোর্ড সভা ডাকা হয়। রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ইকবাল উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সেই বোর্ড সভায় উপরোক্ত ৫ সদস্যের সিন্ডিকেটের যোগসাজশে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, রাসেল ও রুবেল যদি তাদের তুলে নেওয়া জামানতের টাকা ১৭ শতাংশ সুদসহ ফেরত দেন, তবেই তাদের প্লট দেওয়া যাবে।
- বৈধ আবেদনকারীদের বঞ্চিত করা: এই অবৈধ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাজউকের কর্তারা ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করেন। হাজার হাজার বৈধ ও যোগ্য আবেদনকারী বছরের পর বছর লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও যেখানে প্লট পাননি, সেখানে লটারিতে হেরে টাকা তুলে নেওয়া দুই ভাইকে উপহার দেওয়া হয় রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা মূল্যের ২০ কাঠা জমি।
পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতের চাবুক:
এই জালিয়াতি ও অভিনব দুর্নীতির প্রমাণ পেয়ে ২০১৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুদকের তৎকালীন উপ-সহকারী পরিচালক সিলভিয়া ফেরদৌস মতিঝিল থানায় মামলা করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৮ সালে চার্জশিট দাখিল করা হয় এবং মোট ৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত এই রায় ঘোষণা করেন।
রায় ঘোষণার সময় আসামিরা চতুরতার সাথে আদালতে অনুপস্থিত থাকায় তাদের আগের জামিন বাতিল করে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আসামিরা গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণের দিন থেকে এই সাজা কার্যকর হবে।
The post বাতিল ফাইলে রাজউকের প্লট জালিয়াত রুবেল রাসেল ধরা appeared first on Daily Sotto Kotha Protidin.
