নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মিছিল, গোপন বৈঠক ও ঝটিকা কর্মসূচির খবর ঘিরে বরিশাল নগরীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কখনো মুখ ঢেকে মিছিল, কখনো ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ, আবার কখনো গোপন বৈঠকের ঘটনায় গ্রেপ্তার—একের পর এক ঘটনায় আলোচনায় নগরীর রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
সর্বশেষ শনিবার (১৭ অক্টোবর) শহরের বাংলাবাজার এলাকায় সশস্ত্র মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় ৬৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এতে নিষিদ্ধ সংগঠনের অতৎপরতা নিয়ন্ত্রণে মাঠপুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বরিশাল নগরীতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে ঝটিকা মিছিল, গোপন বৈঠক ও রাজনৈতিক কর্মসূচির খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনায় কখনো অভিযান চালিয়ে নেতাকর্মীদের আটক করেছে পুলিশ, আবার কোনো কোনো ঘটনায় কর্মসূচির সত্যতা যাচাই নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল নগরীতে মুখে মাস্ক পরে ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই মিছিল রাজা বাহাদুর সড়ক হয়ে জিলা স্কুল মোড়ে শেষ হয়েছিল বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সে সময় পুলিশ মিছিলটি সরাসরি দেখেনি বলে জানিয়েছিল।
এরপর ২০২৬ সালের ১৭ এপ্রিল নগরীর কাকলী হল মোড় থেকে জিলা স্কুলের সামনে পর্যন্ত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মিছিলের খবর প্রকাশিত হয়। একই বছরের ২২ মে নগরীর বিএম কলেজ রোডের একটি কার্যালয়ে গোপন বৈঠকের অভিযোগে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয় বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়।
পরে ১১ সেপ্টেম্বর কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়ামের সামনে ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় সাতজনকে আটক করার খবর প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে মশাল মিছিলের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে। তবে ওই কর্মসূচির বিষয়ে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি বলে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছিল।
এদিকে ২ জুলাই বরিশালে মিছিল, সড়ক অবরোধ ও বিস্ফোরণের অভিযোগে আওয়ামী লীগের ২৪৮ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আদালতে নালিশি মামলা করার খবর প্রকাশিত হয়। এসব ঘটনা ঘিরে নগরীর রাজনৈতিক তৎপরতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
সর্বশেষ শনিবার সকালে নগরীর বাংলাবাজার এলাকায় সশস্ত্র অবস্থায় মিছিল করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বলে পুলিশের সূত্রে জানা গেছে। এ সময় একাধিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে এবং এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনায় বরিশাল মেট্রোপলিটন কোতয়ালি মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফেরদৌস বাদী হয়ে মামলা করেন।
মামলাটিতে ৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়। তারা সবাই ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকর্মী বলে দাবি করেছে পুলিশ। তবে মামলার পরও সোমবার বিকেল পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। ফলে প্রকাশ্যে সশস্ত্র মিছিল ও বিস্ফোরণের অভিযোগের পর অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে বিলম্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নগরীতে একের পর এক মিছিল-সমাবেশের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, নিষিদ্ধ সংগঠনের নামে প্রকাশ্যে কর্মসূচি এবং বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ঘটলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
নগরীর সদর রোডের বাসিন্দা একাধিক বাসিন্দা বলেন, বরিশালে একের পর এক ছাত্রলীগের মিছিল-সমাবেশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার অন্যতম উদাহরণ। রাজধানী ঢাকার বাইরে বরিশাল নগরীতেই ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের সদস্যরা একাধিক মিছিল-সমাবেশ করছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তাদের অভিযোগ, পুলিশের দুর্বল ভূমিকার কারণেই আওয়ামী লীগের সাবেক নেতাকর্মীরা এ ধরনের সশস্ত্র মিছিল করার সাহস পাচ্ছেন। তবে নাগরিকদের এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে আগের ঘটনাগুলোর তদন্ত ও বর্তমান মামলার অগ্রগতি নিয়ে পুলিশের অবস্থান স্পষ্ট করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বরিশাল কোতয়ালি মডেল থানার ওসি মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ছাত্রলীগের মিছিলের ঘটনায় মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে।
তবে নগরীতে ধারাবাহিকভাবে মিছিলের খবর প্রকাশ, বিভিন্ন ঘটনায় মামলা এবং সর্বশেষ সশস্ত্র মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ—সব মিলিয়ে জনমনে উদ্বেগ কাটছে না। শুধু মামলা দায়ের ও অভিযান চলার ঘোষণা নয়, এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত, গ্রেপ্তার এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য চান নগরবাসী।
পর্যবেক্ষক মহল বলছে, বরিশালের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিষিদ্ধ সংগঠনের বেআইনি তৎপরতা প্রতিরোধ, বিস্ফোরণের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এখন পুলিশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
মাঠপর্যায়ের এই বিশৃঙ্খলা রুখতে অসংখ্য পুলিশ সদস্যসহ অপরাপর ইউনিটগুলো কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ্। এই পুলিশ কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলছেন, মাঠপুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে নির্দেশনা দেওয়া আছে। বিশেষ করে বরিশাল মেট্রোপলিটনের আওতাধীন চারটি কোতয়ালি, কাউনিয়া, বিমানবন্দর এবং বন্দর থানা পুলিশের সদস্যরা এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে তৎপর রয়েছেন।’
