দীন কায়েম করার আগে চলুন আল কুরআন থেকে জেনে নিই এই দুনিয়ায় রাসুল পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য কি? কি দায়িত্ব পালন করার জন্য রাসুলকে প্রেরণ করেছেন। আল কুরআনের তিনটি জায়গায় সামান্য পার্থক্য ছাড়া হুবহু একই কথা বলা হয়েছে যে, রাসুলকে এই এই দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে।
জাফর আহমাদ
দীন কায়েম করার আগে চলুন আল কুরআন থেকে জেনে নিই এই দুনিয়ায় রাসুল পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য কি? কি দায়িত্ব পালন করার জন্য রাসুলকে প্রেরণ করেছেন। আল কুরআনের তিনটি জায়গায় সামান্য পার্থক্য ছাড়া হুবহু একই কথা বলা হয়েছে যে, রাসুলকে এই এই দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। আয়াত তিনটি হলো, নিম্নরূপ: আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তিনি সেই মহান সত্তা যিনি তাঁর রাসুলকে হিদায়াত এবং দীনে হক দিয়ে পাঠিয়েছেন যাতে তিনি এ দীনকে অন্য সকল দীনের ওপর বিজয়ী করেন, তা মুশরিকদের কাছে যতই অসহনীয় হোক না কেন।” (সুরা সফ: ৯) আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আল্লাহই তাঁর রাসুলকে পথ নির্দেশ ও সত্য দীন সহকারে পাঠিয়েছেন যাতে তিনি একে সকল দীনের ওপর বিজয়ী করেন, মুশরিকরা একে যতই অপছন্দ করুক না কেন।” (সুরা তাওবা: ৩৩) “আল্লাহই তো সেই মহান সত্তা যিনি তাঁর রাসুলকে হিদায়াত ও সত্য দীন দিয়ে পাঠিয়েছেন যেন তাকে সমস্ত দীনের ওপর বিজয়ী করেন। আর এ বাস্তবতা সম্পর্কে আল্লাহর সাক্ষ্যই যথেষ্ট।” (সুরা ফাতহ: ২৮) সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরাম এই দায়িত্ব পালন করেছেন। শেষ নবী ও শেষ রাসুল সা: সকল মত ও পথ পরাজিত করে একমাত্র আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা করেছেন। মদীনা নামক ইসলামী রাষ্ট প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ববাসীকে তার নমুনা দেখিয়েছেন। খোলাফায়ে রাশেদার ত্রিশ বছর একই নমুনা সারা বিশ্ববাসী অবলোকন করেছে।
আয়াতগুলোতে রাসুল পাঠাবার উদ্দেশ্য বর্ণনা করে বলা হয়েছে দীন জাতীয় বা দীনের শ্রেণীভুক্ত অন্য কথায় জীবন বিধান পদবাচ্য অন্য সমস্ত পদ্ধতি ও ব্যবস্থার ওপর ইসলামী জীবন বিধানকে জয়ী করবেন। অন্য কথায় রাসুলকে কখনো এ উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়নি যে, তিনি যে জীবন বিধান নিয়ে এসেছেন তা অন্যান্য জীবন ব্যবস্থার কাছে পরাজিত হয়ে ও পদানত থেকে তাদের দেয়া সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। বরং তিনি আকাশ ও পৃথিবীর একচ্ছত্র অধিপতির প্রতিনিধি হয়ে এসেছেন এবং নিজের মনিবের সত্য ও ন্যায়ের ব্যবস্থাকে যে কোন মূল্যে বিজয়ী করবেন। বরং সার্বভৌম কর্তৃত্বের একক মালিক আল্লাহর দুনিয়ায় যদি অন্য কোন ব্যবস্থার অস্তিত্ব থেকে থাকে তাহলে তাকে আল্লাহর ব্যবস্থার আওতাধীনেই তাঁর দেয়া সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে।
জীবনের যত শাখা আছে, যত পথ ও মত আছে, সবগুলোকে পরাভূত করে সেখানে আল্লাহর প্রেরিত বিধান তথা ইসলাম অনুযায়ী জীবন সৌধ গড়ে তুলতে হবে। আর এই কাজ করার জন্যই রাসুলদেরকে দুনিয়ায় প্রেরণ করা হয়েছে। গোটা সমাজ তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সেখানে নৈতিক চরিত্র, সভ্যতা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ধর্ম, আইন, কানুন, বিচার-ফয়সালা, রীতিনীতি ও দেশাচার, রাজনীতি, অর্থনীতি মোট কথা জীবনের প্রতিটি বিভাগের জন্য আকীদা-বিশ্বাস হিসাবে সেসব মূলনীতি মেনে নেয়া হবে এবং কার্যত চালু হবে যা মহান আল্লাহ তাঁর কিতাব ও রাসুলের মাধ্যমে দিয়েছেন। আল্লাহর মনোনীত দীন যেটিকে গোনাহ বলবে আইন সেটিকেই অপরাধ হিসেবে গণ্য করবে, সরকারের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সেগুলোকে উৎখাত করার চেষ্টা করবে, শিক্ষা-দীক্ষা সেটি থেকে বাঁচার জন্য মন মানসিকতা তৈরি করবে। মিম্বার ও মেহরাব থেকে এর বিরুদ্ধেই আওয়াজ উঠবে সমাজ এটিকে দোষনীয় মনে করবে এবং জীবিকা অর্জনের প্রতিটি কাজ-করবারে তা নিষিদ্ধ হবে। অনুরূপভাবে আল্লাহর দীন যে জিনিসকে কল্যাণ ও সুকৃতি হিসেবে আখ্যায়িত করবে আইন তাকেই সমর্থন করবে। ব্যবস্থাপনার শক্তি তার লালন পালন করবে। গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা মন মগজে সেটিকে বদ্ধমূল করতে এবং চরিত্র ও কর্মে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করবে। এভাবেই মানুষ পূর্ণ আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শান্তি লাভ করবে এবং বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক উন্নতির সমস্ত দরজা তার জন্য খুলে যাবে। কারণ আল্লাহ ও গায়রুল্লাহর দাসত্বের দ্বন্দ্ব-সংঘাত তাতে শেষ হয়ে যাবে। সমস্ত আম্বিয়া কেরামের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল যাতে এ ধরনের একটি মুসলিম উম্মাহর উত্থান ঘটুক যারা কুফর ও কাফেরদের আধিপত্য থেকে মুক্ত হয়ে জামায়াতবদ্ধভাবে আল্লাহর দীন অনুসরণ করবে। কুরআন ও সুন্নাত সম্পর্কে অজ্ঞ এবং বিবেক-বুদ্ধিহীন না হলে কেউ এ কথা বলতে পারে না যে নবী রাসুল সা: এর চেষ্টা সাধনার লক্ষ্য ছিল শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ঈমান ও আনুগত্য। সামাজিক জীবনে দীনে হক বা ন্যায় ও সত্যের আদর্শ কয়েম করার উদ্দেশ্য আদৌ তাঁদের ছিল না।
অত্যন্ত স্থুল মনের অধিকারী মানুষ ইসলাম বিশ্বজনীন জীবন ব্যবস্থা এটা বোঝে না। তাই তারা ইসলামকে এই মর্যাদা থেকে টেনে নামিয়ে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত জীবনে আবদ্ধ করতে চায়। সন্দেহ নাই যে, দেশের প্রখ্যাত ইসলামী স্কলার, আলেম ও ওলামাগণ ব্যক্তিগতভাবে ইসলাম পালনে অত্যন্ত মনযোগী। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম পালন হোক, দেশের অর্থনীতি, আইন-কানুন, অফিস-আদালত ইসলাম অনুযায়ী চলুক তা তারা পছন্দ করে বটে কিন্তু তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য চেষ্টা-সাধনা করবে, সেই ইচ্ছাটুকুও প্রকাশ করেন না। অথচ এগুলো প্রতিষ্ঠা করা সালাত ও সাওমের মতোই ফরয বিধান। যেমন: আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তিনি তোমাদের জন্য দীনের সেই সেসব নিয়ম-কানুন নির্ধারিত করেছেন যার নির্দেশ তিনি নুহকে দিয়েছিলেন, এবং যা এখন আমি তোমার কাছে ওহীর মাধ্যমে পাঠিয়েছি। আর যার আদেশ দিয়েছিলাম আমি ইবরাহিম, মুসা ও ঈসাকে। তার সাথে তাগিদ করেছিলাম এই বলে যে, এ দীনকে কায়েম করো এবং এ ব্যাপারে পরস্পর মতপার্থক্যে লিপ্ত হয়ো না।” (সুরা শুরা: ১৩)
এ আয়াতের মাধ্যমে একটি কথা অত্যন্ত সুস্পষ্ট তা হলো, দীন কায়েমের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাজটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, শেষ নবী মুহাম্মাদ সা:, হযরত নুহ আ:, হযরত ইবরাহিম আ:, মুসা আ: ও ঈসা আ: করেছেন। প্রথমে হযরত নুহ আ: এর নাম উল্লেখ করার কারণ হলো, মহাপ্লাবনের পর তিনিই ছিলেন বর্তমান মানব গোষ্ঠীর সর্বপ্রথম পয়গাম্বর। তারপর নবী সা: এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি শেষ নবী। তারপর হযরত ইবরাহিম আ: এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, আরবের লোকেরা যাঁকে নেতা বলে মানতো। সর্বশেষ হযরত মুসা এবং ঈসার কথা বলা হয়েছে যাদের সাথে ইহুদী ও খৃষ্টানরা তাদের ধর্মকে সম্পর্কিত করে থাকে। এর উদ্দেশ্য এ নয় যে, শুধু এই পাঁচজন নবীকেই উক্ত দীন কায়েমের জন্য নির্দেশ দেয়া ছিল। বরং পৃথিবীতে যত নবীই এসেছেন সকলেই একই দীনের কাজ করেছেন। সর্বোপুরি কথা হলো, দীন প্রতিষ্ঠার কাজটি কোন ্ঐচ্ছিক কাজ নয় বরং এটি প্রত্যেকের জন্য বাধতামূলক কাজ ছিল, আছে এবং থাকবে।
দীন মানে কারো নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে তার আদেশ-নিষেধের আনুগত্য করা। দীন মানে জীবন বিধান বা জীবনাচার, পন্থা, পদ্ধতি যা অনুসরণীয় বা অনুসরণযোগ্য। বান্দার জন্য তার মালিকের অবশ্য অনুসরণীয় আইন, যার অনুসরণ না করা বিদ্রোহের শামিল। যে ব্যক্তি তা অনুসরণ করে না সে প্রকৃতপক্ষে তার মালিকের আধিপত্য, সার্বভৌমত্ব এবং দাসত্ব অস্বীকার করে।
আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “তার সাথে তাগিদ করেছিলাম এই বলে যে, এ দীনকে কায়েম করো এবং এ ব্যাপারে পরস্পর বিভক্ত হয়ো না।” শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলবী এ আয়াতের অনুবাদ করেছেন “দীনকে কায়েম করো” আর শাহ রফিউদ্দীন ও শাহ আবদুল কাদের অনুবাদ করেছেন,“ দীনকে কায়েম রাখো” এই দু’টি অনুবাদই সঠিক। আরবী ইকামাত শব্দের অর্থ কায়েম করা ও কায়েম রাখা উভয়ই। নবী-রাসুলগণ আ: এ দু’টি কাজ করতেই আদিষ্ট ছিলেন। তাঁদের প্রথম দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল, যেখানে এই দীন কায়েম নেই সেখানে তা কায়েম করা। আর দ্বিতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল যেখানে তা কায়েম হবে কিংবা পূর্ব থেকেইই কায়েম আছে সেখানে তা কায়েম রাখা। এ কথা সুস্পষ্ট যে, কায়েম করা এবং তা ধরে রাখার জন্য ক্রমাগত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ কায়েম করে অবসর গ্রহণ করার কোন সুযোগ নেই।
কায়েম করার কথাটি যখন কোন বস্তুগত বা দেহধারী জিনিসের জন্য ব্যবহৃত হয় তখন তার অর্থ হয় উপবিষ্টকে উঠানো। যেমন কোন বস্তুকে উঠানো। কিংবা পড়ে থাকা জিনিসকে উঠিয়ে দাঁড় করানো। যেমন বাঁশ বা কোন থাম তুলে দাঁড় করানো অথবা কোন জিনিসের বিক্ষিপ্ত অংশগুলোকে একত্র করে সমুন্নত করা। যেমন কোন খালি জায়গায় বিল্ডিং নির্মাণ করা। অবস্তুগত জিনিস তার জন্য যখন কায়েম করা শব্দ ব্যবহার করা হয় তখন তার অর্থ হয় আহ্বান, কার্যে পরিণত করা, প্রচলন ঘটানো এবং কার্যত চালু করা। এই ব্যাখ্যার পর এ কথা বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয় যে, নবী-রাসুলগণকে যখন এই দীন কায়েম করার ও রাখার যে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, তার অর্থ শুধু এতটুকুই ছিল না যে, তাঁরা নিজেরাই কেবল এ দীনের বিধান মেনে চলবেন এবং অন্যদের কাছে তার তাবলীগ বা প্রচার করবেন, যাতে মানুষ তার সত্যতা মেনে নেয়। বরং তার অর্থ এটিও যে মানুষ যখন তা মেনে নেবে তখন আরো অগ্রসর হয়ে তাদের মাঝে পুরো দীনের প্রচলন ঘটাবেন, যাতে সেই অনুসারে কাজ আরম্ভ হতে এবং চলতে থাকে।
