চরম সংকটে বাড়ছে দারিদ্র্য পর্যালোচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নিন
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৯ পিএম
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় দারিদ্র্য মোকাবিলা করা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। বৈশ্বিক সংকট এ ধরনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য বিমোচনের দিকে সরকারের নজর থাকলেও তা খুব একটা কাজে আসছে না; বরং দারিদ্র্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। যুদ্ধ-সংঘাত, জ্বালানি ও খাদ্যসংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের অভাবে নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়েছে কোটি কোটি মানুষ। সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ যথেষ্ট পরিমাণে না হওয়ায় কর্মসংস্থান কমেছে এবং সেই সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। অর্থনীতির ধীরগতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে দারিদ্র্য ও বৈষম্য পরিস্থিতির ওপর। মৌলিক অধিকারের বহুমুখী অভাবে মানুষ আজ দিশেহারা। আর্থিক নিরাপত্তা হারানোর শঙ্কায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে নিম্ন মধ্যবিত্তরাও। এ ছাড়া অসহনীয় উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা গোষ্ঠী হয়ে যাচ্ছে দরিদ্র। জনসংখ্যার বড় একটা অংশ নিম্নবিত্ত থেকে নেমে যাচ্ছে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে। এদের সংখ্যা ৬ কোটিরও বেশি; যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ফলে ক্রমেই দারিদ্র্যের চক্রে এগোচ্ছে দেশ।
সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনীতির হালনাগাদ চিত্র নিয়ে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন মতে, এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। দেশে মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যা এখন ৫ কোটি ১৩ লাখ। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে চরম দারিদ্র্য বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দৈনিক তিন ডলারের কম ব্যয় করলে দারিদ্র্যসীমার আওতায় পড়েন।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক- এমপিআই অনুযায়ী বাসস্থান, পুষ্টি, সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা– এই মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাবেই তৈরি হয় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য। আর এর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা।
আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং এডিবি- তিনটি প্রধান আন্তর্জাতিক সংস্থা সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হয়ে আশির দশকের পর্যায়ে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে, যা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অর্থনীতির মধ্যে সর্বনিম্ন। পাকিস্তান ছাড়া বাংলাদেশের মতো এমন অবস্থায় দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো দেশই নেই। এতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে দারিদ্র্যের হার আবার বাড়ছে।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রফেসরিয়াল ফেলো ও অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য কমানোর জন্য যেসব কার্যক্রম প্রয়োজন, সেগুলোতে একধরনের স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। এর ওপর যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে দারিদ্র্য কমার ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
দেশে দারিদ্র্য বাড়ার প্রবণতা খুবই উদ্বেগজনক। বিশেষ করে গত চার বছরে এ ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক সুরক্ষার সীমাবদ্ধতার কারণে চরম বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। এ বৈষম্যের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষ। তাই সরকারকে এ সংকট অবস্থা থেকে উত্তরণে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সম্প্রতি আইএমএফের প্রতিবেদন বলছে, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ২৯ শতাংশ বেকার। তাই বেকারদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। অর্থনীতির গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈষম্য কমিয়ে আনা জরুরি। কী কারণে দারিদ্র্য বাড়ছে, সেসব বিষয় পর্যালোচনা করে সরকার একটি সমন্বিত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, এটাই প্রত্যাশা।
আরও পড়ুন
মহাসড়কে ডাকাতের দৌরাত্ম্য যাত্রীনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ জরুরি
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫১ পিএম
সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্রের দৌরাত্ম্যে মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রীরা আতঙ্কের মুখে। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর ও উত্তরাঞ্চলকে সংযুক্ত করা বিভিন্ন মহাসড়ক এবং আঞ্চলিক সড়কে প্রায়ই ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। যাত্রী, চালক ও পণ্যবাহী যানবাহনের কর্মীদের জন্য দীর্ঘ পথের যাত্রা ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোয় ডাকাতদের এমন তৎপরতা রোধের দায় কার? ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত থাকার পরও অপরাধীরা কীভাবে বারবার হামলার সুযোগ পাচ্ছে?
পুলিশ সদর দপ্তর পরিসংখ্যান পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ১২৩টি। একই সময়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ৪৬৭টি। এসব তথ্য পুলিশের নথিভুক্ত অপরাধের হিসাব। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মামলা না হওয়ার কারণে অনেক ঘটনা সরকারি পরিসংখ্যানে স্থান পায় না। অর্থাৎ নথিভুক্ত অপরাধের সংখ্যা দিয়েই সড়কে মানুষের প্রকৃত নিরাপত্তাহীনতার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত অন্তত ১৫টি স্থানকে ডাকাতিপ্রবণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণত দুই ধরনের ডাকাতির ঘটনা ঘটে। একদিকে নির্জন সড়ক বেছে নিয়ে ডাকাতি করা হয়; অন্যদিকে প্রবাসী বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। অপরাধের ধরন যখন পুলিশের জানা, তখন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকার কারণ কী। শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর মামলা গ্রহণ, কয়েকজনকে গ্রেপ্তার কিংবা অভিযান চালানোর খবর প্রচার করে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। জনগণ জানতে চান, এসব অভিযানে কতজন সংঘবদ্ধ ডাকাত গ্রেপ্তার হয়েছে, কতটি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে, কতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং কতটি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও হাইওয়ে পুলিশকে সমন্বিতভাবে সড়ক নিরাপত্তার জবাবদিহিমূলক কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করতে পারলে চলমান অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোয় টহলের নির্দিষ্ট সময়সূচি, জনবল, নজরদারির ব্যবস্থা এবং জরুরি সহায়তা পাওয়ার কার্যকর পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি ডাকাতির ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, অপরাধী চক্র শনাক্ত এবং আন্তজেলা যোগাযোগব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত বিরতিতে অপরাধের পরিসংখ্যান, তদন্তের অগ্রগতি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার বাস্তবায়নের অবস্থা প্রকাশ করা জরুরি। কোনো এলাকায় বারবার ডাকাতির ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাইতে হবে; দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, গুরুতর অপরাধে জড়িতদের গ্রেপ্তারের পর দ্রুত জামিনে মুক্তি, দীর্ঘ বিচার-প্রক্রিয়া এবং যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ার প্রবণতা পুনরায় অপরাধে জড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে জামিনকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষীর নিরাপত্তা, শক্তিশালী অভিযোগপত্র এবং সময়মতো বিচার। একই সঙ্গে তদন্তে গাফিলতি ও মামলার অগ্রগতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সড়কে ডাকাতি কোনো বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত সমস্যা নয়; এটি নাগরিকের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। যাত্রী বা চালক ডাকাতের হামলার শিকার হলে তাদেরই কেন নিরাপত্তার ঝুঁকি বহন করতে হবে? ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত থাকার পরও অপরাধ ঘটলে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। মানুষ শুধু গ্রেপ্তারের ঘোষণা শুনতে চান না; চান অপরাধ কমার প্রমাণ, দ্রুত বিচার এবং নিরাপদ যাতায়াতের নিশ্চয়তা। সড়ক ও মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার হিসাবও সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে।
আরও পড়ুন
সৌরবিদ্যুতে পরস্পরবিরোধী নীতি প্রকল্প বাতিল নয়, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৪ পিএম
জ্বালানিসংকট যখন দেশের অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন ও কৃষিকে ক্রমাগত চাপে ফেলছে, তখন বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোই হওয়া উচিত সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। সৌরবিদ্যুৎ সেই বিকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। অথচ এমন একসময়ে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প স্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যখন সরকার নিজেই বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে উদ্যোগী হচ্ছে। একদিকে সরকারি দপ্তর ও সংস্থার ভবনে সোলার প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনা, অন্যদিকে কৃষিতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের প্রকল্প বাতিল–এই পরস্পরবিরোধী নীতি শুধু প্রশ্নবিদ্ধ নয়, জ্বালানিসংকট মোকাবিলার কৌশল হিসেবেও অদূরদর্শী।
২০১৮ সালে নেওয়া প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল দেশের ছয় বিভাগের ২২ জেলার ১৫৮ উপজেলায় দুই হাজার সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প স্থাপন। উদ্দেশ্য ছিল কৃষিতে সেচের সুবিধা বাড়ানো, সেচ মৌসুমে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো এবং ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরতা হ্রাস করা। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের জন্য এই উদ্যোগের গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়। কৃষির উৎপাদন ব্যয় কমানো, জ্বালানি আমদানির চাপ হ্রাস এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির বিস্তার–সব দিক থেকেই প্রকল্পটি ছিল সময়োপযোগী। এমন একটি উদ্যোগের বাস্তবায়নে ব্যর্থতা থাকলে তা সংশোধন করা প্রয়োজন। কিন্তু তাই বলে প্রকল্পই বাতিল করে দেওয়া, কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না।
প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুতর ত্রুটি ছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পল্লি বিদ্যুতায়ন বোর্ডকে (বাপবিবো)। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পরামর্শকের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হলেও সেই সমীক্ষা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। সুবিধাভোগী কৃষকদের মতামতও নেওয়া হয়নি। ফলে পরিকল্পনা, কারিগরি সক্ষমতা ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা প্রকট হয়ে ওঠে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা বা প্রশাসনিক ভুলের শাস্তি কেন পেতে হবে কৃষকদের? কেন জনগণের অর্থে কেনা যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত পড়ে থাকবে? আর কেনইবা একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগের সুফল থেকে বঞ্চিত হবে দেশের কৃষি খাত?
প্রকল্পের জন্য ইতালি থেকে দুই হাজার সেচপাম্প, মোটর, ইনভার্টারসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছিল। অথচ দীর্ঘ সাড়ে আট বছরে স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৬৪২টি পাম্প। এতে উৎপাদিত হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৪ মেগাওয়াট কম। বাকি কাজ সম্পন্ন না করেই গত জুনে প্রকল্পের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে প্রকল্প বাতিলের পরিবর্তে প্রয়োজন ছিল পূর্ণাঙ্গ পুনর্মূল্যায়ন। কোথায় ভুল হয়েছে, কেন নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি, কোন সংস্থার কী দায়–এসব নির্ধারণ করে একটি বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা যেত। অন্যদিকে সরকারি দপ্তর, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে সরকারি ভবনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ানো এবং কৃষিতে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচের বিস্তার–দুটি উদ্যোগই একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব এবং সেটিই উপযুক্ত পন্থা বলে আমরা মনে করি। অতএব, সৌর সেচ প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। প্রকল্পটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের কৌশলপত্রের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন। সে ক্ষেত্রে এটি বাতিল না করে কীভাবে দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সরকারকে সেই পথ খুঁজতে হবে। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, অপচয়ের কারণ অনুসন্ধান করতে হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায়ে কৃষি ও জ্বালানি খাতের একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগকে বিসর্জন দেওয়া উচিত হবে না।
সরকারের কাছে প্রত্যাশা, সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করে প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করা হবে। ভুল পরিকল্পনা সংশোধন করা সরকারের দায়িত্ব; সেই ভুলের অজুহাতে প্রকল্প বাতিল করে জনগণের অর্থ, কৃষকের সম্ভাবনা এবং দেশের জ্বালানি-নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলা কোনো দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত হতে পারে না।
আরও পড়ুন
অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় পদক্ষেপ জরুরি আইএমএফের পূর্বাভাস
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম
আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৫ এএম
বাংলাদেশের অর্থনীতি সংকটে পড়তে যাচ্ছে বলে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এ দুটি সংস্থা তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে। এতে সাধারণ মানুষ আরও চাপে পড়বে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা বেশি নাজুক হতে পারে।
আগামী কয়েক বছরেও এ দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নেই। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এ দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থা এমন মূল্যায়ন প্রতিবেদন দিল। এটি বর্তমান অর্থনীতির জন্য চরম উদ্বেগের বিষয়। ভবিষ্যৎ অর্থনীতিও খুব একটা ভালো থাকবে, তেমনটাও আশা করা যাচ্ছে না। দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের টিকে থাকার জন্য এক ধরনের লড়াই করে বাঁচতে হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, গত চার বছরে দেশে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে আছে দেশের প্রায় সোয়া ৬ কোটি মানুষ। বর্তমানে মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব লক্ষণীয়। তার ওপর দেশের অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে আছে, বিনিয়োগের অভাবে কর্মসংস্থান খুব একটা নেই বললেই চলে। শিল্পমালিকদের তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে বড় ধরনের বেগ পেতে হচ্ছে।
প্রবৃদ্ধির এই নিম্নগামী অবস্থা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। দক্ষিণ এশিয়ার বিশেষ করে ভুটান ও শ্রীলঙ্কা যেখানে তাদের মন্দা কাটিয়ে ৫ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরছে, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাকফুটে চলে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাজারে শক্ত অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে।
গত ৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। গত মাসে এডিবি বলেছে, এবার প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ শতাংশ। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এই দুই সংস্থাটির চেয়েও কম প্রবৃদ্ধির কথা বলেছে। তারা বলেছে, মোট দেশজ উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে। একই সময়ে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি। এটি বিগত চার দশকের মধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় শ্লথগতির ইঙ্গিত। তবে সরকার চলতি অর্থবছরে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করেছে।
সরকারের দায়িত্ব এখন দুই দাতা সংস্থার পূর্বাভাসকে আমলে নিয়ে সে অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এজন্য দরকার সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা। আমরা লক্ষ্য করেছি, কার্যকর নীতি গ্রহণ খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। সরকারের আয় কম কিন্তু ব্যয় খুবই বেশি। ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ দিনে দিনে বাড়ছে।
এরই মধ্যে সরকার সরকারি কর্মচারীদের বেতন ভাতা বাড়িয়েছে। বিমানের জন্য উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছে। বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। কৃচ্ছ্রতা সাধন কেবল কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগ খুব একটা চোখে পড়ছে না। এদিকটাও সরকারকে নজর দিতে হবে। এ অবস্থায় বর্তমান অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ কাজে লাগাতে হবে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির বাধা দূর করে সরকার সংকট উত্তরণে সমন্বিত উদ্যোগ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।
আরও পড়ুন
চতুর্থ বর্ষে খবরের কাগজ নির্ভীক ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাই লক্ষ্য
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম
দেখতে দেখতে খবরের কাগজ তিন বছর পেরিয়ে চতুর্থ বছরে পা রাখল। পত্রিকাটি ৫ জুলাই ২০২৩ থেকে প্রকাশিত হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে এর যাত্রা শুরু হয় ১৫ অক্টোবর। গৃহপ্রবেশের মাধ্যমে একঝাঁক মেধাবী পেশাদার সাংবাদিকের সমন্বয়ে গঠিত হয় খবরের কাগজ টিম। দেশের অত্যন্ত বৈরী পরিবেশে এবং দ্রুততম সময়ে পত্রিকাটি বাজারে আসে। শুরুতেই বিপুল পাঠকের হৃদয় জয় করে নেয়। মুক্তচিন্তার স্বাধীন দৈনিক খবরের কাগজের মূল শক্তিই হচ্ছে এর নিরপেক্ষতা এবং সত্য প্রকাশে সাহসী ভূমিকা। দলীয় স্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ ও ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে সমাজের অবহেলিত, নিগৃত মানুষের পাশে থেকে অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। শুধু প্রতিশ্রুতিই নয়, দৃঢ় অঙ্গীকার ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে খবরের কাগজ তার জায়গা করে নিয়েছে। আমরা অনুসন্ধান করছি খবরের নেপথ্যের খবর।
খবরের কাগজ প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ‘মুক্ত করো ভয়’ ও দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ‘ভয়কে করো জয়’ প্রতিপাদ্য ধারণ করেছে। অনুরূপ তৃতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রতিপাদ্য নির্ধারণ হয়েছে ‘চির উন্নত শির’। প্রতিটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণের পেছনে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে। সত্যনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাই এ পত্রিকাটির মূল লক্ষ্য। দায়িত্বশীলতা ও পেশাগত উৎকর্ষ দিয়ে একটি সুসম্পাদিত দৈনিক নিয়মিতভাবে পাঠকের হাতে তুলে দিতে আমরা সক্ষম হয়েছি। পেশাদারত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের কারণেই পত্রিকাটি সর্বমহলে সমাদৃত হয়েছে। সংবাদপত্রের সত্যনিষ্ঠা বদলে দিতে পারে সমাজের সব বাধা ও বিপত্তি। নিরেট সত্য ও প্রকৃত তথ্য পরিবেশন করে পাঠকের তৃষ্ণা মেটানো আমাদের কর্তব্য ও দায়। সত্য তথ্য প্রকাশে আমরা নির্ভীক। দেশ ও বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার দিকে আমাদের বিশেষ নজর রয়েছে।
খবরের কাগজ একই সঙ্গে প্রিন্ট মাধ্যম, বিভাষিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং মাল্টিমিডিয়ার কার্যক্রম দিয়ে সংবাদপিপাসুদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের পরেও প্রিন্ট ভার্সন খবরের কাগজের পাঠকসংখ্যা বেড়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই বৃদ্ধিটা আশাব্যঞ্জক। তিন বছর ধরে আমরা তথ্যনিষ্ঠ ও সত্যনিষ্ঠ থেকে সমাজের নিপীড়িত মানুষের পক্ষে সংবাদ প্রকাশ করে যাচ্ছি। পাঠকের সত্য সন্ধানের অভিযাত্রায় আমরা সব সময় সহযাত্রী হয়ে থাকতে চাই। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার, সমস্যা, সম্ভাবনা ও আশার কথা তুলে ধরা পেশাদার সাংবাদিকের নৈতিক দায়িত্ব।
আমরা সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছি এবং গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি এবং করে যাচ্ছি। এ প্রচেষ্টা আমাদের অব্যাহত থাকবে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে ‘চির উন্নত শির’ প্রত্যয়কে ধারণ করে আমরা নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে চাই। আমরা পেশাদারত্ব বজায় রাখব এবং হলুদ সাংবাদিকতাকে 'না' বলব। নির্ভীক ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাই হবে আমাদের মূল লক্ষ্য।
খবরের কাগজের ওপর আস্থা রাখার জন্য পাঠকদের জানাই অন্তরের অন্তস্তল থেকে ধন্যবাদ ও গভীর শ্রদ্ধা-ভালোবাসা।
আজকের এই শুভক্ষণে আমরা স্মরণ করছি আমাদের অগণিত পাঠক, লেখক, হকার, এজেন্ট, শুভানুধ্যায়ী ও নেপথ্য কারিগরদের; যাদের ভালোবাসা ও আস্থার শক্তিতে আমরা আজও বলীয়ান।
খবরের কাগজ পাঠক পরিবারকে শুভেচ্ছা।
