দ্য ডেইলি স্টার ইতিহাস আড্ডায় বক্তারা বললেন, রাজনৈতিক বিভাজনে আড়াল হয়েছে কবির সাহিত্যিক অবদান
১০ মিনিট আগে
সর্বশেষ আপডেট: ১০ মিনিট আগে
স্টার অনলাইন রিপোর্ট
রাজনৈতিক পরিচয়ের বিতর্কে কবি ফররুখ আহমদকে খণ্ডিতভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। একদিকে তাকে পাকিস্তানপন্থি পরিচয়ে চিহ্নিত করে তার সাহিত্যিক অবদান উপেক্ষা করা হয়েছে, অন্যদিকে তাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখার প্রবণতা রয়েছে। এই দুই অবস্থানের বাইরে গিয়ে তার সাহিত্য, চিন্তার বিবর্তন ও ব্যক্তিসত্তাকে সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
আজ শনিবার ঢাকায় দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে আয়োজিত ইতিহাস আড্ডার ৩৩তম পর্বে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘রাজনীতির পালাবদলে ফররুখ আহমদ’ শীর্ষক আলোচনায় তারা বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কোনো কবির সাহিত্যকর্মকে অস্বীকার করা কিংবা তাকে একক কোনো আদর্শের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরা—দুটিই তার প্রতি অবিচার।
কবি জাকির আবু জাফর বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ফররুখকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তার সাহিত্যিক শক্তিকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
‘যখন কোনো জাতি তার শিল্প-সাহিত্যকে, তার কবিতাকে, তার কবিকে রাজনৈতিক বাটখারা দিয়ে ওজন করে, তাহলে সেই জাতি কখনো পৃথিবীতে সভ্য হতে পারে না,’ বলেন তিনি।
ফররুখের কবিতার ভাষা, চিত্রকল্প ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির ওপর গুরুত্ব দিয়ে জাকির আবু জাফর বলেন, ‘ফররুখ আহমদ শুধু তার আদর্শের জন্য টিকে নেই। তিনি টিকে আছেন তার শব্দের জন্য, তার বাণীর জন্য, তার চিত্রকল্পের জন্য। তিনি মানবতাবাদী, বিশ্বমানবতাবাদী কবি।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও ফররুখের কবিতার প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ফররুখ আহমদের কবিতা পড়লে মনে হয়, এই কবিতাগুলো কখনো কখনো যেন জুলাই বিপ্লবের পরে লেখা।’
কবি, প্রাবন্ধিক ও শিল্পসমালোচক সাখাওয়াত টিপু বলেন, কবিকে কেবল রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিচার করলে তার ভাষা, কল্পনা ও নন্দনতত্ত্বের গুরুত্ব বোঝা যায় না। ‘কবি হচ্ছেন একজন সাধক। উনি মানুষের কথা বলেন, কল্পনার কথা বলেন, চিত্রকল্পের কথা বলেন, ভাষার পালাবদলের কথা বলেন, ভবিষ্যতের কথা বলেন, স্বপ্নের কথা বলেন,’ বলেন তিনি।
বাংলা ভাষার প্রতি ফররুখের অনুরাগ এবং ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকার কথা উল্লেখ করে সাখাওয়াত টিপু বলেন, তাকে কোনো একক রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়। ‘ফররুখ আহমদ আমাদের সাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ শিল্পী এবং আমাদের সাহিত্যের যে সভ্যতা, সামনের পথ নির্মাতাদের একজন,’ বলেন তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক খোরশেদ আলমও রাজনৈতিক ও আদর্শিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে কবির সাহিত্য মূল্যায়নের ওপর জোর দেন। ফররুখের ‘সাত সাগরের মাঝি’ সময় অতিক্রম করে ধ্রুপদি মর্যাদা অর্জন করেছে উল্লেখ করে তিনি কবিতায় আরব-ফারসি ঐতিহ্য, বাংলা লোকসাহিত্য ও মানবতাবাদী চিন্তার বৈচিত্র্যের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘এই বাংলাদেশ আবার খুঁজে পাবে ফররুখ আহমদ।’
গবেষক ও সাংবাদিক সামসুদ্দোজা সাজেন বলেন, ফররুখ আহমদ পাকিস্তানের ধারণায় বিশ্বাস করতেন। তবে তার রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সাহিত্যিক অবদান উপেক্ষা করা উচিত নয়। একদিকে তাকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ও পাকিস্তানপন্থি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, অন্যদিকে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী তাকে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ করে রাখতে চায়। এই দুই প্রবণতার বাইরে গিয়ে কবির সাহিত্য, চিন্তা ও ব্যক্তিসত্তাকে মূল্যায়ন করা জরুরি।
শিল্পী কামরুল হাসানের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে সাজেন বলেন, ফররুখের চিন্তায় পরিবর্তন এলেও সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতা অটুট ছিল। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে লেখা ‘লাশ’ কবিতায় সেই দায়বদ্ধতার প্রতিফলন দেখা যায়। পাকিস্তানপন্থি হিসেবে পরিচিত হলেও পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের পুরস্কার ও সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে কবির স্বতন্ত্র অবস্থান ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ফররুখ আহমদের পুত্র সৈয়দ ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘তিনি (ফররুখ আহমদ) সব সময় মানুষের জন্য লিখেছেন এবং তার চিন্তার কেন্দ্রে ছিল পিছিয়ে পড়া সমাজ। কেবল কবি হিসেবে না, একজন আপসহীন ব্যক্তি হিসেবেও তার সময়কালে তিনি পরিচিত ছিলেন। প্রখ্যাত রাজনীতিক, সাংবাদিক, লেখক আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন তার গুরু।
ফররুখ আহমদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জানতে হলে তার সহকর্মীদের স্মৃতিকথা জানা জরুরি মন্তব্য করে তিনি তার কবিতা স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সিলেবাসে রাখার আহবান জানান।
১৯১৮ সালে জন্ম নেওয়া ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যে ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত তার ‘সাত সাগরের মাঝি’ বাংলা কবিতায় বিশেষ স্থান করে নেয়। তার কবিতায় মুসলিম ঐতিহ্য ও আরবি-ফারসি অনুষঙ্গের পাশাপাশি শোষণ, দারিদ্র্য ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও উঠে এসেছে। ১৯৭৪ সালে তার মৃত্যু হয়।
ইতিহাস আড্ডার এই পর্বটি সঞ্চালনা করেন দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক ইমরান মাহফুজ। অংশ নেন ছাত্র-শিক্ষক-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীসহ অনেকে।
