দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম সামুদ্রিক বন্দর মোংলা এখন এক মহা-রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২২ অক্টোবর সুন্দরবন ও মোংলা বন্দর পরিদর্শন করেছেন। এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান মোংলা বন্দর সফর করলেন। একই সাথে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি ছিল তার প্রথম খুলনা সফর। অর্থনৈতিক করিডোর তৈরি, চীনের এক্সিম ব্যাংকের মেগা ঋণচুক্তি এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরেজমিনে পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে বন্দরটিকে ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তৈরি হয়েছে নতুন উন্মাদনা। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দর কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রধান হাব বা ‘ফার্স্ট কলিং পোর্ট’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। শুধু সমুদ্রপথে পণ্য আনা-নেওয়াই নয়, বরং সড়ক, রেল ও আকাশপথের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়ে মোংলা বন্দরকে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হাব হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, গত ১০ অক্টোবর চীনের এক্সিম ব্যাংকের সাথে ৩৩৫.৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের (প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা) এক ঐতিহাসিক ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই বিশাল বড় বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য হলো— কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল পোর্ট সিস্টেমে রূপান্তর। মোংলা বন্দর চ্যানেলে নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পানির নাব্যতা বৃদ্ধি করা। এর ফলে অধিক ড্রাফট (গভীরতা)-এর বিশালাকার মাদার ভেসেল বা পণ্যবাহী জাহাজ সরাসরি জেটিতে নোঙর করতে পারবে, যা আগে সম্ভব ছিল না।
‘ফার্স্ট কলিং পোর্ট’ হওয়ার লড়াই : আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে ‘ঋরৎংঃ ঈধষষরহম চড়ৎঃ’ বা প্রথম নোঙরস্থল হওয়া যেকোনো বন্দরের জন্য অত্যন্ত সম্মানজনক ও লাভজনক। বিদেশী জাহাজগুলো চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি মোংলা বন্দরে ভিড়লে পণ্য খালাসের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এছাড়া তৈরি পোশাক, পাট, চামড়া ও হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানিতে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা তৈরি হবে।
শুধু বন্দর আধুনিকায়নই নয়, এর সাথে যুক্ত হচ্ছে মাল্টি-মোডাল যোগাযোগ ব্যবস্থা। খুলনা-মোংলা সড়কটি ৪ লেনে উন্নীতকরণ এবং খুলনা-ভাঙ্গা সংযোগ সড়ক নির্মাণ কাজ বেগবান করা। ওয়াগন ও কন্টেইনার ট্রেন চালুকরণের পাশাপাশি খান জাহান আলী বিমানবন্দর চালু এখন সময়ের দাবি। প্রস্তাবিত বেজা (ইঊতঅ) অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠলে মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী কারখানা স্থাপনে আগ্রহী হবে।
গত ২২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি মোংলা বন্দরের ৯ নং জেটি এবং প্রস্তাবিত বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শনের পর স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। ব্যবসায়ীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা অমীমাংসিত অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান হলে পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে যাবে। মোংলা বন্দর হবে দেশের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি।
খান জাহান আলী বিমানবন্দর চালু : আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী, বিদেশী জাহাজের প্রতিনিধি ও বড় বিনিয়োগকারীদের দ্রুত চলাচলের জন্য বহুকাঙ্ক্ষিত খান জাহান আলী বিমানবন্দর চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উত্থাপিত হয়েছে। এটি চালু হলে মোংলা বন্দর এবং প্রস্তাবিত বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগমন বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।
অবকাঠামোগত এই অমীমাংসিত চ্যালেঞ্জগুলোর দ্রুত সমাধান হলে মোংলা বন্দর কেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরো দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ উপ-পরিচালক মোঃ সালাহ্ উদ্দিন কবির জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় নাব্যতা অর্জন ও অন্যান্য চ্যালেঞ্জসহ বন্দরের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। এরপর তিনি প্রস্তাবিত বেজা (ইঊতঅ) অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা বন্দর চ্যানেল ড্রেজিং হলে নাব্যতা বাড়বে। ফলে অধিক ড্রাফটের জাহাজ এ বন্দরে আনা সম্ভব হবে মনে করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর আগমনে খুলনা, বাগেরহাটসহ গোটা দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে মোংলা বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। প্রধানমন্ত্রীর আগমনে মোংলা বন্দর এলাকার দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বা অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান হলে এ অঞ্চলের মানুষ উপকৃত হবে বলেও মনে করেন।
মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জুলফিকর আলী বলেন, মোংলা বন্দরের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ ত্বরান্বিত করবে। নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও এলএনজি টার্মিনাল নির্মিত হলে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শেখ সাহেদ আলী রবি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এ জন্য বন্দর চ্যানেলের নাব্যতা বাড়াতে ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি মোংলা কাস্টমস হাউস ও শুল্ক বিভাগের আধুনিকায়ন প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর সফর এসব উদ্যোগ এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে বলে আশা করেন তিনি।
বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের ফলে এ অঞ্চলে বিনিয়োগের গতি বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকার যেসব মানুষ কাজ হারাচ্ছেন, তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতেও উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ভূমিকা রাখতে পারে।
তার মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
খুলনা গেজেট/এএজে
