ঘড়ির কাঁটায় তখন নেপাল সময় সকাল সাতটা। মোবাইলের অ্যালার্ম জানান দিচ্ছে ঘুম থেকে ওঠার সময় হয়েছে। কিন্তু এত ঠান্ডায় রুমে হিটার চালিয়ে এবং দুটি লেপ গায়ে জড়িয়েও ঠান্ডা কমছিল না। আড়চোখে মোবাইলে নেপালের তাপমাত্রা দেখে তো চোখ কপালে ওঠার জোগাড় তখন থামেলের তাপমাত্রা মাত্র ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস! ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও লেপের নিচ থেকে কিছুতেই উঠতে মন চাইছিল না।
এরই মধ্যে অভিনব দাদার ফোন, ‘আর ঘুমিয়ো না, এবার উঠে তৈরি হয়ে নাও।’ আজ আমার আর সানন্দার নেপাল ভ্রমণের তৃতীয় দিন। হিমালয়কন্যা নেপালের সৌন্দর্যে মুগ্ধ পুরো বিশ্ব। দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা এই পাহাড়ি দেশে ছুটে আসেন মাউন্ট এভারেস্ট, শত বছরের পুরনো মন্দির, আকাশচুম্বী পর্বতমালা, জলপ্রপাত এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি দেখতে। পৃথিবীর যেসব দেশে সহজে একা ভ্রমণ করা যায়, তার মধ্যে নেপাল অন্যতম। পর্বতারোহীদের পছন্দের শীর্ষে থাকা এই দেশে অন্নপূর্ণা কিংবা এভারেস্ট জয়ের জন্য সারা বছরই ভিড় জমান দুঃসাহসীরা।

তবে সাধারণ পর্যটকরাও কম যান না, হিমালয়ের পাশ থেকে সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্তের দৃশ্য কিংবা অন্নপূর্ণার শুভ্র চূড়া দেখতে তাঁরাও ভিড় করেন সেখানে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভূমিবেষ্টিত নেপালের কোনো সমুদ্র না থাকলেও হিমালয়ের সৌন্দর্যের দরজা হিসেবে দেশটি বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। আর শুধু হিমালয়ই নয়, নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতেও আছে দেখার মতো দারুণ সব স্থান।
প্রায় ৫০ লাখ মানুষের এই মহানগরে ঐতিহ্য, বাণিজ্য ও নানাবিধ স্থাপত্যের নিদর্শন একে আপন মহিমায় উজ্জ্বল করে রেখেছে।
নিজের সাথে অনেক যুদ্ধ করে অবশেষে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে নিলাম নতুন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। আমাদের আজকের ভ্রমণ গন্তব্য চন্দ্রগিরি হিল। ঢাকার মতোই কাঠমান্ডুর রাস্তায় যানজট, আর রাস্তার অবস্থাও বেশ খারাপ। দিনভর বেশ গরম থাকলেও শেষরাতে গা কিছুটা শিনশিন করে। সূর্যদেবের ছোঁয়ায় উঁচু-নিচু পথ পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি, আর দূরের পাহাড়ি চূড়ায় সাদা বরফের আনাগোনা আমাদের মুগ্ধ করছে। সকালের ঠান্ডার কথা ভেবে আগে থেকেই কয়েকটি গরমের পোশাক পরেছিলাম, কিন্তু কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই গরমে ঘেমে উঠছি বারবার।

তখনই অভিনব দাদা বললেন, ‘একটু অপেক্ষা করো, ঠান্ডায় কাঁপবে।’
কাঠমান্ডু শহর থেকে দেড় ঘণ্টার পথ চন্দ্রগিরি। সেখানেই এত শীত হবে! ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। মেঘেদের দেশে এসে অনেকেরই আবদার ছিল মেঘ ছোঁয়ার। স্বল্প সময়ে এভারেস্টের কাছে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় সেই মেঘের ছোঁয়া পেতেই অভিনব দাদা আমাদের চন্দ্রগিরি নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। ভ্রমণসঙ্গী সানন্দা আগে থেকেই চন্দ্রগিরি হিলের ট্রাভেল ব্লগ দেখিয়েছিল, কিন্তু আমার উচ্চতাভীতি থাকায় প্রথমে যেতে চাইনি। শেষ পর্যন্ত সানন্দার জোরাজুরিতে যেতেই হলো।

কাঠমান্ডু মূলত পাহাড়ঘেরা একটি উপত্যকা। প্রায় দুই ঘণ্টা মাইক্রোবাসে চেপে আমরা নামলাম থানকোট। সেখান থেকে শুরু হলো পাহাড়ি পথ। পাহাড় কেটে তৈরি শক্ত কংক্রিটের সুদৃশ্য পথ এঁকেবেঁকে গিয়ে থামল চন্দ্রগিরি কেবল কার স্টেশনে। বিশাল এই এলাকা থেকে নিচের থানকোট শহর বেশ স্পষ্ট দেখা গেলেও, একটি পাহাড় ডিঙিয়ে কাঠমান্ডু খুব একটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। তবে চন্দ্রগিরিতে এসেই রীতিমতো কাঁপতে শুরু করলাম আমরা! সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় সাড়ে আট হাজার ফুট, তাই কাঁপুনি তো ধরবেই।
দুপুর নাগাদ এসে পৌঁছালাম চন্দ্রগিরির প্রবেশপথে। গাড়ি থেকে নেমে পদব্রজে এগিয়ে যেতে লাগলাম। হিমশীতল বাতাসে একটু পরপর শরীর কেঁপে উঠছিল। আমাদের মতো আরও অনেকেই এসেছেন চন্দ্রগিরি দর্শনে। দেখা মিলল এক সুন্দর ফোয়ারার। আমার উচ্চতার ভয় থাকা সত্ত্বেও অনিচ্ছা সত্ত্বেও কেবল কারের দিকে এগিয়ে গেলাম। সিঁড়ি বেয়ে উঁচু একটি ভবনে উঠে টিকিট কাটলাম। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মাথাপিছু টিকিট ১ হাজার ১০০ নেপালি রুপি। ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে দেখলাম সহস্রাধিক মানুষের দীর্ঘ লাইন।

লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার সময় অভিনব দাদা জানালেন, চন্দ্রগিরির পৌরাণিক তাৎপর্য বিবেচনা করেই নেপাল সরকার এখানে কেবল কার নির্মাণ করেছেন। চন্দ্রগিরির উচ্চতা ৮,২৬৮ ফুট। পৌরাণিক যুগে এই উচ্চতা কীভাবে পাড়ি দিয়ে পাহাড়ের মাথায় ভালেশ্বর মন্দির গড়ে উঠেছিল, তা আজও এক রহস্য-যেমন রহস্য মিশরের সুউচ্চ পিরামিডে বিশাল বিশাল পাথর স্থাপন।
অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার পর আমরা উঠে বসলাম কেবল কারে। কারের দুই পাশে মুখোমুখি আমরা মোট ছয়জন বসেছি। যাঁরা নিচের দৃশ্য দেখতে চান না, তাঁরা উল্টো দিকে বসলেন। সরসর করে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করল কেবল কার। যত ওপরে উঠছি, নিচের শহর তত ছোট হতে লাগল, আর ঘন সবুজ বন রূপ নিল কালচে ছায়ায়। খানিকটা ওপরে উঠতেই কোথা থেকে একদল মেঘ এসে লাগল কারের গায়ে, কাচে জমল বিন্দু বিন্দু জলকণা। আমাদের গায়ে লাগল হিমেল পরশ, শীতও জাঁকিয়ে বসল।

আমি নিচে তাকাতেই তো ভয়ে পিলে চমকে ওঠার জোগাড়! আমার অবস্থা হলো-ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’। অন্যদিকে কারের অন্য যাত্রীদের মুখে তখন শুধুই ‘ওয়াহ’, ‘কী সুন্দর’, ‘বাহ’ ধ্বনি। মাঝেমধ্যে পাশের একটি-দুটি কার অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে। কিছু দূর ওঠার পর নিচে আর বন দেখা গেল না, শুধু দেখা মিলল মেঘের খেলা। কালচে মেঘের চাদর ঢেকে দিয়েছে সবুজ প্রকৃতি। ঠান্ডা আরও বাড়তে থাকল। মেঘের এই অপার সৌন্দর্য আর ভয়মিশ্রিত এক তীব্র অনুভূতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলল আমাদের চন্দ্রগিরি যাত্রা...।
সংশ্লিষ্ট সংবাদ: ভ্রমণ
১৪ অক্টোবর ২০২৬
১৩ অক্টোবর ২০২৬
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
