Published on
:
2 min read
দুর্গা মানেই কি সোনালি উজ্জ্বল গৌরবর্ণা প্রতিমা? বাংলার দুর্গাপুজোর বৈচিত্র্য বলছে, দেবীর রূপের কোনও নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। কোথাও তিনি ডাকাতদের আরাধ্যা, কোথাও আবার রাজবাড়ির ঐতিহ্যের প্রতীক। কৃষ্ণনগরের নাজিরাপাড়ায় এমনই এক ব্যতিক্রমী পন্থায় দেবী দুর্গা পূজিত হন। সেখানে দেবী নীল অপরাজিতার রঙের। নাম তাঁর ‘নীল দুর্গা’। প্রতিমাশিল্পীর ভুল, দেবীর স্বপ্নাদেশ এবং প্রায় তিনশো বছরের পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই পুজোর ইতিহাস। রয়েছে ওপার বাংলার যোগও, চলুন জেনে নেওয়া যাক সেই নীল দুর্গার গল্প।
বাংলাদেশের বামরাইল থেকে কৃষ্ণনগরের নীল দুর্গা
কথিত, প্রায় ৩০০ বছর আগে অবিভক্ত বাংলা, অধুনা বাংলাদেশের বরিশাল জেলার বামরাইল গ্রামে চট্টোপাধ্যায় পরিবারে নীল দুর্গার পুজোর সূচনা করেন চিন্তাহরণ চট্টোপাধ্যায়। দেশভাগের পর পরিবারের সদস্যরা এপার বাংলায় চলে এসে কৃষ্ণনগরের নাজিরাপাড়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৪৭ সাল থেকে সেখানেই নতুন করে নীল দুর্গার পুজো প্রচলিত হয়। সময়ের সঙ্গে এই পুজো কৃষ্ণনগরের দুর্গোৎসবের অন্যতম ব্যতিক্রমী ঐতিহ্য হয়ে ওঠে।
তবে ১৯৯৮ সালে পুজোর বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। সেই বছর থেকে আলাদা ভাবে পুজো শুরু হয়। দুই পরিবারেই একচালা প্রতিমা তৈরি করে দেবী আরাধনা করা হয়। পারিবারিক বিভাজন ঘটলেও নীল দুর্গার ঐতিহ্য হারিয়ে যায়নি।
কেন নীল রঙের দেবী দুর্গা?
নীল দুর্গার পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক আশ্চর্য কাহিনি। লোকমুখে প্রচলিত, এক বছর পুজোর আগে প্রতিমা তৈরি করছিলেন এক বৃদ্ধ মৃৎশিল্পী। বয়সের ভারে তাঁর শরীর দুর্বল, দৃষ্টিশক্তিও ক্ষীণ। অথচ রাত পোহালেই পুজো, তার আগে প্রতিমার গায়ের রং করা বাকি।
কেরোসিনের লম্ফের ক্ষীণ আলোয় কাজ করতে গিয়ে ভুলবশত দেবীর গৌরবর্ণা রূপে নীল রং লাগিয়ে ফেলেন তিনি। ভোরের আলো ফুটতেই প্রতিমার গায়ে অপরাজিতার মতো নীল আভা দেখে সকলেই বিস্মিত হন। কী ভাবে সেই ভুল শুধরে নেওয়া যায়, তা নিয়ে শুরু হয় আলোচনা।
সেই সময় পরিবারের কর্তা জানান, আগের রাতে স্বপ্নে দেবী তাঁকে নীল রঙেই পুজো করার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর থেকেই দেবী নীলবর্ণা রূপে পূজিত হন চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে।
প্রতিমার বিন্যাসেও রয়েছে বিশেষত্ব
নীল দুর্গার প্রতিমার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো দেবদেবীদের অবস্থান। এখানে মা দুর্গার বাঁ দিকে সরস্বতীর সঙ্গে গণেশ এবং ডান দিকে লক্ষ্মীর সঙ্গে কার্তিক থাকেন।
কৃষ্ণনগরের নীল দুর্গা তাই শুধুমাত্র একটি পুজো নয়, বরং বাংলার লোকবিশ্বাস, পারিবারিক ইতিহাস ও দুর্গার বহুরূপী আরাধনার এক অনন্য নিদর্শন। নীল অপরাজিতার রঙে দেবীর এই রূপ মনে করিয়ে দেয়, বাংলার দুর্গাপুজোর সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যেই।
