বাংলাদেশে ইতিহাসের সেরা পূজা উদযাপন
বিশ্বব্যাপী তারেক রহমান সরকারের প্রশংসা
-
সাইফুর রহমান: - আপডেট সময় ০৮:৪৬:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
তারেক রহমান সরকারের আমলে বাংলাদেশে ইতিহাসের সেরা পূজা উদযাপনের ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। তারেক রহমান সরকারের প্রশংসায় করছেন প্রতিবেশী ভারত ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের হিন্দু এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা। ভারতের বিখ্যাত দ্য হিন্দু পত্রিকা শারদীয় দুর্গা পূজায় উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হিন্দু সম্প্রদায়েরর উদ্দেশে শুভেচ্ছা বক্তব্যের ছবিসহ প্রকাশিত একটি সংবাদে লিখেছে,‘সরকার দুর্গাপূজার জন্য অনুদান, ছুটির দিন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা বৃদ্ধি করার প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান দুর্গাপূজা মণ্ডপগুলো পরিদর্শন করেছেন। এমন এক সময়ে তিনি এই পরিদর্শন করলেন, যখন সরকার হিন্দু সম্প্রদায়ের সহায়তায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে; যার মধ্যে রয়েছে দুর্গাপূজার জন্য আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি, সরকারি ছুটির মেয়াদ বাড়ানো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা।
এই পদক্ষেপগুলোকে বাংলাদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা, সমান অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রসারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।’
বাংলাদেশ ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের বর্ষীয়ান নেতারা এবং সাধারণ সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এই উৎসবমুখর ও নিরাপদ আয়োজনের জন্য সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। একই সাথে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের এই অভূতপূর্ব সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও চমৎকার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় বার্তা দিয়েছে।
বাংলাদেশে এবারের শারদীয় দুর্গাপূজা এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। বিজয়া দশমীতে ওয়াইজঘাটসহ সারাদেশের হাজারো জলাশয়ে মূর্তি বিসর্জনের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শেষ হয় পাঁচ দিনের এই উৎসব। ঢাকঢোল, কাঁসর-ঘণ্টার বাদ্য এবং ভক্তদের প্রার্থনায় বিসর্জনের আয়োজন সর্বজনীন রূপ নেয়। ভক্তরা বিষাদ আর প্রার্থনার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান এবং নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী দেশ ও পরিবারের মঙ্গল কামনা করেন।
এ বছরের দুর্গাপূজাকে দেশীয় গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম এবং সাধারণ নেটিজেনরা এক বাক্যে “এ যাবৎকালের সেরা ও নিরাপদ পূজা” বলে আখ্যায়িত করেছেন। এমনকি বাংলাদেশে বেড়াতে আসা ভারতীয় পর্যটকরা এবারের শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন উৎসব-আয়োজনের ভূইসী প্রশংসা করেছেন। ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনের সার্বিক তদারকিতে কেবল ঢাকায় নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশে কোথাও কোনো বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেনি।
গণমাধ্যমে বাংলাদেশে পূজার এই অভূতপূর্ব সাফল্যের পেছনে প্রধানত ৭টি ঐতিহাসিক অর্জনের কথা উঠে এসেছে:
১. রেকর্ডসংখ্যক পূজামণ্ডপ: পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্যমতে, সারাদেশে মণ্ডপের সংখ্যা ৩২ হাজার ৩৫১টি থেকে বেড়ে ৩৩ হাজার ৮৫১টিতে উন্নীত হয়, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দেড় হাজার বেশি।
২. সর্বোচ্চ সরকারি বাজেট ও অনুদান: পূজার সরকারি বাজেট আগের ৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে বিশেষ বরাদ্দে উন্নীত করা হয়। অসচ্ছল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে নতুন বস্ত্র ও অনুদান বিতরণ করা হয়।
৩. রেকর্ড সরকারি ছুটি: পূর্বে দুর্গোৎসবে ছুটি ১ দিন থাকলেও এবার তা বাড়িয়ে টানা ৩ দিন করা হয়। সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হয়ে টানা ৫ দিনের দীর্ঘ অবকাশ মেলে, যা সর্বস্তরের মানুষের মাঝে উৎসবের নতুন আমেজ তৈরি করে।
৪. সরকার ও প্রশাসনের সর্বোচ্চ তদারকি: মাঠপর্যায়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি) ও ইউএনওদের নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের কারণে মণ্ডপগুলোতে ভক্তদের ঢল নামে। বিচ্ছিন্ন দু-একটি ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখে।
৫. রাজনৈতিক দলগুলোর মানবঢাল ও পাহারা: তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা মন্দির পাহারা ও সার্বিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন, যা চাঁদাবাজি ও উসকানিমুক্ত আনন্দময় পরিবেশ নিশ্চিত করে।
৬. শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি ও অভয়: বিভিন্ন বিভাগের মণ্ডপগুলোতে সরেজমিনে পরিদর্শন করে পূজার সর্বজনীনতা জোরদার করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, সংবিধানের চোখে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকারের অধিকারী।
৭. সর্বোচ্চ সাজসজ্জা ও আন্তর্জাতিক প্রশংসা: সারাদেশের প্রধান প্রধান মণ্ডপগুলোতে ছিল চোখধাঁধানো রোশনাই ও সাজসজ্জা। রাজধানীর বনানীর পূজামণ্ডপ ও ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের ব্যবস্থাপনা দেখে বিদেশি কূটনীতিক ও ভারতীয় দর্শনার্থীরাও মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ভারতীয় পর্যটক এবং সনাতন ধর্মীয় দর্শনার্থী অকপটে স্বীকার করেছেন যে, এ বছর বাংলাদেশে যে মাত্রায় নিরাপদ, আনন্দময় ও বৈচিত্র্যময় পরিবেশে পূজা উদযাপিত হয়েছে, তা তাদের প্রত্যাশাকে বহুগুণ ছাড়িয়ে গেছে।
প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গাপূজা সম্পন্ন
গত বুধবার ছিল বিজয়া দশমী। ঢাকের বাদ্য, উলুধ্বনি আর শঙ্খের আওয়াজে মুখর ছিল সারাদেশের পূজামণ্ডপ। দেবী দুর্গার প্রতিমার সামনে চলে সিঁদুর খেলা। উচ্ছ্বাসের রঙে মাখামাখি আনন্দের মাঝেই ছিল ভক্তদের মনে বিচ্ছেদের বিষণ্ণতা। শুরু হয় দেবীর বিদায়ের ক্ষণ। গতকাল বুধবার পাঁচ দিনের উৎসব শেষে পূজা, পুষ্পাঞ্জলি ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে মণ্ডপে মণ্ডপে চলে শেষ দিনের আনুষ্ঠানিকতা। শঙ্খনাদ, উলুধ্বনি, ঢাকের বাদ্য আর চারদিকে ভক্তদের ‘বলো দুর্গা মাই কি জয়’ ধ্বনির মধ্য দিয়ে আনন্দ ও বিষাদের মিশ্র অনুভূতিতে শুরু হয়েছে দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের বর্ণাঢ্য বিজয়া শোভাযাত্রা।
গত বুধবার বিকাল ৪টায় রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির (পলাশী মোড়) থেকে এ যাত্রা শুরু হয়। রাজধানীর বিভিন্ন ম-প থেকে আসা প্রতিমা নিয়ে জগন্নাথ হল, দোয়েল চত্বর, গুলিস্তান মোড়, নবাবপুর রোড ও রায়সাহেব বাজার হয়ে রাতে বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটে গিয়ে এই শোভাযাত্রা শেষ হয়। হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার দিন ‘কন্যারূপে’ মর্ত্যে আসা দেবী দুর্গা টানা পাঁচ দিনের পূজার পর দশমীর দিন পিতৃগৃহ ছেড়ে কৈলাসে স্বামীগৃহে ফিরে যান। অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে দেবীর এই বিজয়ের কারণে দিনটি ‘শুভ বিজয়া’ হিসেবে উদযাপিত হলেও বিদায়বেলায় ভক্তদের হৃদয় বিষাদে আপ্লুত হয়। সকালে বিজয়া দশমীর শাস্ত্রীয় আনুষ্ঠানিকতা এবং দুপুরে সধবা নারীদের সিঁদুর খেলার মধ্য দিয়ে বিদায়পর্ব শুরু হয়। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে সকাল ৭টায় দশমীর বিহিত পূজা শুরু হয়। সকাল ৯টায় দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে পূজার শাস্ত্রীয় সমাপ্তি ঘটে। এরপর সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলে বিজয়া দশমীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ—সিঁদুর খেলা। স্বামীর দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনায় সধবা নারীরা দেবীর চরণে সিঁদুর নিবেদন করেন। এরপর তারা একে অপরের কপালে ও গালে সিঁদুর মেখে উল্লাসে মেতে ওঠেন। বিজয়া দশমী উপলক্ষে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের শুভেচ্ছা বিনিময়ের আয়োজন করা হয়। সেখানে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদসহ ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পূজা কমিটির প্রায় ১০০ সদস্য অংশগ্রহণ করেন।
মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশিষ কুমার বিশ্বাস সাধন বলেন, “আমাদের মধ্যে যে সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে উঠেছে, তা ধরে রাখতে চাই। এ বন্ধনকে ধারণ করেই সামনের দিনে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চাই। দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে মন্দির প্রাঙ্গণে বিনামূল্যে মেডিক্যাল ক্যাম্প চালানো হয়। এছাড়া বুধবার দুপুরে মন্দিরে প্রায় ৫০ বছর ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী রক্তদান কর্মসূচিও চলে।
নবমীর রাতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের মধ্যে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয় জানিয়ে শুভাশিষ কুমার বিশ্বাস বলেন, “বিশ্বের মধ্যে এটি বিরল যে এক ধর্মের অনুষ্ঠান সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে অন্য ধর্মের মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ভাইয়েরা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সহযোগিতা করেন। পুরান ঢাকার ওয়ারীর বাসিন্দা কারিগর চন্দন চন্দ্র দাস বলেন, “মা দুর্গা আমাদের আরাধ্য দেবী। জগতের সব শক্তির উৎস তিনি। আজ আবার ধরাধাম থেকে তিনি মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ীতে চলে যাবেন। জগতের অশুভ শক্তি বিনাশ হোক— এই প্রার্থনা নিয়েই মাকে বিদায় জানাচ্ছি। দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। তবে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের বিসর্জনে রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য। এখানকার মূল প্রতিমাটি বিসর্জন দেওয়া হয় না। এ বিষয়ে শুভাশিষ কুমার বিশ্বাস সাধন বলেন, “ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দেবী দুর্গা স্বয়ং অধিষ্ঠিত। মন্দির প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ঐতিহ্য রয়েছে, এই প্রতিমা আমরা এক বছর সংরক্ষণ করি। পরবর্তী পূজার আগে বিসর্জন দেওয়া হয়। এ বছর রাজধানীর বিভিন্ন ম-পের প্রতিমা বিসর্জনের জন্য বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদের মোট ১১টি ঘাট নির্ধারণ করা হয়েছে। এবার ঢাকা মহানগরে ২৫৮টিসহ সারা দেশে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি ম-পে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ট্যাগস :
