সমসাময়িক পরিসংখ্যান থেকে বাংলাদেশে জনজীবনের নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগজনক চিত্র প্রকাশ পায়। বাংলাদেশে প্রতি বছর কয়েক হাজার মানুষ প্রতিরোধযোগ্য দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়, বাস্তবতা হলো তাদের সামান্য অংশই কেবল ক্ষতিপূরণ পান।
গত শনিবার কক্সবাজারের ইনানী সৈকতের পাটুয়ারটেকে বাঁশ-কাঠের তৈরি ‘টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্ট’-এ অগ্নিদুর্ঘটনায় প্রাণ হারান অন্তত ১০ জন পর্যটক, যাদের ছয়জন একই পরিবারের। ধারণা করা হচ্ছে বাকি চারজন শিশুসহ একই পরিবারের, যাদের মরদেহ এখনো অশনাক্ত অবস্থায় রয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যমতে, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ জুনে পরিদর্শন করে রিসোর্টটিকে অগ্নিনিরাপত্তা না মানায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে নোটিস দিয়েছিল; কিন্তু সেই সতর্কতা উপেক্ষা করেই রিসোর্টটি অবৈধভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। এমনকি ফায়ার সার্ভিসের বিধি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির কোনো অগ্নিনিরাপত্তা সনদও ছিল না। একজন পর্যটক যখন অবকাশ যাপনের জন্য কোনো রিসোর্টে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার পক্ষে সেই স্থাপনার বৈধতা বা ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। সাধারণভাবে ধরে নেয় পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ রয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রয়েছে, ফায়ার সার্ভিসের তদারকি রয়েছে, পরিবেশ বিভাগের নজরদারি রয়েছে। বিভিন্ন দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের ওপর আমাদের অন্ধ আস্থা থেকেই চলমান একটি স্থাপনার নিরাপত্তা ও বৈধতা রয়েছে বলে আমরা ধরে নিই। কোনো স্থাপনা ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ থাকলে তারা প্রকাশ্যে নোটিস ঝুলিয়ে রাখেন যে স্থাপনাটি সেই ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ। প্রশ্ন হলো, নিরাপত্তাহীন বা ঝুঁকিপূর্ণ বা পরিবেশ আইন লঙ্ঘনকারী কোনো স্থাপনার সামনে কী কর্তৃপক্ষ এমন নোটিস বা সতর্কবার্তা দৃশ্যমান স্থানে ঝুলিয়ে রাখে, যা দেখে আমরা সতর্ক হতে পারি, আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি সেখানে অবস্থান করব কিনা বা কাজ করব কিনা? আমাদের জানাতে হবে, প্রায় চার মাস আগে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করার পরও অবৈধভাবে চলমান থাকা স্থাপনাটির বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছিল?
অর্থাৎ মৃত্যুগুলো কেবল ‘দুর্ঘটনা’ নয়, বরং আগাম জানা ঝুঁকির পরিণতি। সুতরাং রাষ্ট্র জানত, যথাযথ প্রতিষ্ঠান জানত, অথচ ঝুঁকি প্রশমনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বা গুরুত্ব দেয়নি। তাহলে কি আমরা চিহ্নিত ঝুঁকিগুলো যথাসময়ে সংশোধন না করে প্রাণহানির জন্য অপেক্ষা করেছি? প্রাণহানির ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মালিকের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে, একজন ম্যানেজার গ্রেফতার হয়েছেন, একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। প্রাণহানি ঘটার আগে কেন ফায়ার সেফটি, বিল্ডিং কোড লঙ্ঘন বা সরকারি সংস্থার সতর্কবাণী উপেক্ষা করে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার কারণে স্থাপনাটির মালিক বা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা পূর্ব হতেই গ্রহণ করা হয় না? এ ধরনের দুর্ঘটনার দায় কি কেবল মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের? আইন প্রয়োগকারী বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহিতা বা সক্রিয়তাও কি এর জন্য কখনো প্রশ্নের মুখে পড়েছে, নাকি কখনো পড়বে? ঘটনা-পরবর্তী, প্রাণহানি ঘটার পর আমাদের এ প্রতিক্রিয়াশীল নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি আমাদের জানমালের নিরাপত্তার জন্য আসলে কার্যকর ও ফলপ্রসূ বার্তা দেয়? এ প্রতিক্রিয়াশীল নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি মানুষের জীবনের অধিকার নিশ্চিতে যথেষ্ট?
সমসাময়িক পরিসংখ্যান থেকে বাংলাদেশে জনজীবনের নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগজনক চিত্র প্রকাশ পায়। বাংলাদেশে প্রতি বছর কয়েক হাজার মানুষ প্রতিরোধযোগ্য দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়, বাস্তবতা হলো তাদের সামান্য অংশই কেবল ক্ষতিপূরণ পান। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের হিসাবে ২০২৫ সালে দেশে ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, দৈনিক গড়ে ৭৫টি; এতে ৮৫ জন নিহত ও ২৬৭ জন আহত হন এবং প্রায় ৫৭০ কোটি টাকার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪ সালে অগ্নিকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা ছিল ১৪০, আর ২০২৩ সালে মৃতের সংখ্যা ১০২। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত আবাসিক ভবনের বাইরেও, ২০২৫ সালে অন্তত ১৫৩টি বাস এবং ২১৬টি অন্যান্য যানবাহনে আগুন লাগে। এছাড়া ১০টি ট্রেন, চারটি লঞ্চ এবং দুটি জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এছাড়া দোকানপাট, বাজার, শপিং মল, তৈরি পোশাক ও অন্যান্য শিল্প-কারখানা, গ্যাস সিলিন্ডারের দোকান, বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র, বহুতল ভবন, রেস্তোরাঁ ও হোটেল, সরকারি দপ্তর, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, পাটের গুদাম ও কলকারখানায়, রাসায়নিক পদার্থের গুদাম, বস্তি, মসজিদ, মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে পরিদর্শন করা ১০ হাজার ৫৩৩টি ভবনের মধ্যে ৬২২টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং আরো ৩ হাজার ৩১৬টি রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়; অর্থাৎ পরিদর্শন করা স্থাপনার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ স্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ও রাষ্ট্রের জানার মধ্যে থাকলেও পরিদর্শনের বাইরে আরো বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ মৃত্যুকূপ আমাদের চারপাশে রয়েছে। বাংলাদেশে দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বড় মৃত্যুকূপ হচ্ছে সড়ক। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত ও ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হয়েছেন; ১৩২টি নৌ দুর্ঘটনায় ১৪৯ জন মারা গেছে। মৃত্যুর ধরনভেদে এ চিত্র আলাদা, কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি অভিন্ন সত্য স্পষ্ট: মৃত্যুর সংখ্যা যত বড়, রাষ্ট্রের দায় স্বীকারের পরিসর কি ততটা প্রসারিত?
বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকারের চিত্র আরো আশঙ্কাজনক। শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের নিয়মিত ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও সংশোধনী পরিকল্পনার বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও আমরা দেখেছি কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত বিরতিতে অগ্নিকাণ্ড ও অন্যান্য দুর্ঘটনা চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সংবাদপত্রভিত্তিক জরিপে দেখা গেছে, বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ২০২৫ সালে ৭৩৫ জন এবং ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে আরো ১৮৬ জন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন; অর্থাৎ, মাত্র ১৫ মাসে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯২১-এ। অন্যদিকে অকুপেশনাল সেফটি, হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (ওশি) ফাউন্ডেশনের বার্ষিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে কর্মক্ষেত্র-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ১৯০ জন শ্রমিক নিহত এবং ২২২ জন আহত হয়েছে।
পেশা কিংবা স্থান যা-ই হোক না কেন, ক্রমবর্ধমান বিভিন্ন প্রকারের দুর্ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, জীবনের নিরাপত্তার অধিকার আসলে রাষ্ট্রের কাছে কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে রাষ্ট্র কতটা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করছে। ২০২১ সালে ঝালকাঠিতে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে আগুনে অন্তত ৪০ জন, ২০২৪ সালে বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে ৪৬ জন, ২০২৫ সালের অক্টোবরে মিরপুরের পোশাক কারখানা ও রাসায়নিক গুদামে অন্তত ১৬ জন, আর এখন কক্সবাজারে ১০ জন। প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়, মামলা হয়, কিন্তু নিহতের পরিবার আসলে কতটুকু প্রতিকার পায়, পরবর্তী ঘটনা প্রতিরোধে কী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে তা জানা সময়ের দাবি?
জীবনের অধিকার দয়া নয়, রাষ্ট্রের আইনি দায়
প্রতিটি মানুষের জীবনের অধিকার কোনো নৈতিক আবেদন বা করুণা নয়; এটি বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত একটি বাধ্যতামূলক অধিকার। জীবনের নিরাপত্তা বাংলাদেশের সংবিধান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড ও একটি বিচারিক স্বীকৃতি। কাজ, বিনোদন, অবাধ যাতায়াত সবকিছুই মানুষের মানবাধিকার। মানুষ স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনাচার ও অর্থনৈতিক কিংবা বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে যখন দায়িত্বে অবহেলাজনিত কারণে অথবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অকার্যকারিতায় জীবনের হুমকির মুখে পড়েন, তখন মানবাধিকারের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকার নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
প্রথমত, ভয়হীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার বা জীবনের নিরাপত্তার প্রথম ভিত্তি হচ্ছে বাংলাদেশের সংবিধান। সংবিধানের ৩১ নং অনুচ্ছেদ বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিককে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার দেয় এবং স্বীকৃতি দেয় যে আইনগত ভিত্তি ছাড়া কারো জীবন, শরীর বা সম্পত্তির ক্ষতি করা যাবে না। ৩২ নং অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করে। ১৫(ঘ) নং অনুচ্ছেদ পঙ্গুত্ব বা অসুস্থতাজনিত কারণে অভাবগ্রস্ততায় সরকারি সাহায্য লাভের অধিকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে উল্লেখ করে। আমাদের উচ্চ আদালত ব্যাখ্যা করেছেন যে ৩২ নং অনুচ্ছেদের ‘জীবন’ মানে কেবল বেঁচে থাকা নয়, মর্যাদা ও নিরাপত্তাসহ জীবন।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকার ও বাধ্যবাধকতা। জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা (অনুচ্ছেদ ৩) এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর, অনুচ্ছেদ ৬) মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষের জীবনের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার করেছে। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার চুক্তির (আইসিইএসসিআর) অনুচ্ছেদ ৭ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশের নিশ্চয়তা দেয়, আর শিশু অধিকার সনদের অনুচ্ছেদ ছয় শিশুর জীবন রক্ষার দায় রাষ্ট্রের ওপর দেয়। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটির সাধারণ মন্তব্য নং ৩৬ অনুযায়ী, জীবনের অধিকার মানে শুধু রাষ্ট্র কাউকে হত্যা করবে না তা নয়। রাষ্ট্রকে পূর্বানুমেয় বিপদ, যেমন শিল্প দুর্ঘটনা ও অগ্নিকাণ্ড থেকে মানুষকে রক্ষায় সক্রিয় পদক্ষেপও নিতে হবে।
রাষ্ট্রকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সবার কাছ থেকে যুক্তিসংগতভাবে আগাম অনুমেয় প্রাণঘাতী ঝুঁকি প্রতিরোধে ‘যথাযথ সতর্কতা’ দেখাতে হবে। আইসিসিপিআরের ২(৩) অনুচ্ছেদ অধিকার লঙ্ঘনে ‘কার্যকর প্রতিকার’ নিশ্চিত করার দায় দেয়, আর জাতিসংঘের ২০০৫ সালের প্রতিকার ও ক্ষতিপূরণ বিষয়ক মৌলিক নীতিমালা ক্ষতিপূরণকে প্রতিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে।
বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি অজানা হিসেবে বিবেচনা করা অমূলক। ২০২৫ সালে দেশে ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, অর্থাৎ দিনে গড়ে ৭৫টি, এবং একই বছর কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ১৯০ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। তালাবদ্ধ জরুরি বহির্গমন পথ, অনুমোদনহীন রাসায়নিক গুদাম আর ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস সিলিন্ডারের মতো একই কারণে বারবার মানুষ মরছে। এর উদাহরণ ঝালকাঠির অভিযান-১০ লঞ্চ, বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ, মিরপুরের পোশাক কারখানা এবং সম্প্রতি কক্সবাজারের রিসোর্টের আগুন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স বা অনুমোদন ছিল না, স্থান ত্যাগ করার জরুরি বা বিকল্প রাস্তা ছিল না। ঝুঁকি জানা থাকা সত্ত্বেও প্রতিরোধ না করলে এসব মৃত্যুকে কি নিছক ‘দুর্ঘটনা’ বলা যায়? এগুলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তদারকি ও আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা, যা জীবনের অধিকার লঙ্ঘন করে।
তৃতীয়ত, বিচারিক স্বীকৃতি প্রতিকার পাওয়ার একটি মানদণ্ড। বাংলাদেশের উচ্চ আদালত সাংবিধানিক ভিত্তিতে দুর্ঘটনায় খতিগ্রস্ত পরিবারকে রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ দেয়ার ধারণা গ্রহণ করেছেন: অর্থাৎ মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন প্রমাণ হলে রিট এখতিয়ারে ক্ষতিপূরণ দেয়া যায়। বেইলি রোড অগ্নিকাণ্ডের পর ব্লাস্ট ও আসকের রিটে হাইকোর্ট ২০২৪ সালের ৪ মার্চ রুল জারি করে জানতে চান, কেন নিহত ও আহতদের পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয়া হবে না। ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আগুনে নিহতদের চার পরিবারকে হাইকোর্ট প্রাথমিকভাবে ৩০ লাখ টাকা করে দেয়ার আদেশ দিলেও আপিল বিভাগ তা প্রাথমিকভাবে ২৫ লাখ টাকা করে দেয়ার আদেশ দেন। কিন্তু সমস্যা হলো, এ পথ ব্যতিক্রমী, ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত। অর্থাৎ ক্ষতিপূরণ এখনো ‘অধিকার’ নয়, ভাগ্যক্রমে পাওয়া ‘অনুগ্রহ’।
রাষ্ট্রের করণীয়
জীবনের অধিকারকে কাগজ থেকে বাস্তবে আনতে হলে ক্ষতিপূরণকে ‘মানবিক সহায়তা’ নয়, ‘আইনি অধিকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা থেকে প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আসতে হবে, জীবনের ঝুঁকিকে শূন্য সহনশীলতায় বিবেচনা করতে হবে। নিরাপত্তা ঝুঁকি নিরূপণ শুধু এককালীন উদ্যোগে সীমাবদ্ধ না রেখে ধারাবাহিক কার্যক্রম ও কাঠামোগতভাবে নিয়মিত করা প্রয়োজন। প্রাসঙ্গিকভাবে জাতিসংঘ কর্তৃক প্রণীত মানবাধিকার সুরক্ষায় যথাযথ করণীয় বা সতর্কতা পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। যদিও মানবাধিকার সুরক্ষায় যথাযথ করণীয় পদ্ধতিটি ব্যবসায় মানবাধিকার সুরক্ষায় প্রণীত হয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এরই মধ্যে একে আইনি বাধ্যবাধকতায় পরিণত করছে, এ কাঠামোটি বাংলাদেশের জনসমাগম হয় এমন সব প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরাপত্তাকেন্দ্রিক মানবাধিকার যথাযথ সতর্কতা (এইচআরডিডি) বাধ্যতামূলক পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। এর আওতায় শুধু কারখানা নয়, থাকবে রেস্তোরাঁ, শপিং মল, বাজার, হোটেল-রিসোর্ট, লঞ্চ ও ফেরি, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হোস্টেল এবং সব ধরনের বহুতল বাণিজ্যিক ভবন।
পাঁচ ধাপের অগ্নিনিরাপত্তা এইচআরডিডি কাঠামোয় থাকবে— প্রথমত, নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন: প্রতিটি প্রতিষ্ঠান বছরে অন্তত একবার স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ দিয়ে অগ্নিঝুঁকি মূল্যায়ন করাবে। মূল্যায়নে দেখা হবে ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার ও প্রকৃত ব্যবহার মিলছে কিনা, জরুরি বহির্গমন পথ পর্যাপ্ত ও ব্যবহারযোগ্য কিনা, গ্যাস ও বৈদ্যুতিক লাইন নিরাপদ কিনা, দাহ্য পদার্থ কোথায় ও কীভাবে মজুদ আছে এবং একসঙ্গে সর্বোচ্চ কতজন মানুষের উপস্থিতি নিরাপদ। দ্বিতীয়ত, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা: মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে; অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, স্মোক ডিটেক্টর ও স্প্রিংকলার স্থাপন; কোনো অবস্থাতেই বহির্গমন পথ তালাবদ্ধ না রাখা; সব কর্মীকে অগ্নিনিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দেয়া; প্রতি তিন মাস অন্তর অগ্নি মহড়া করা এবং প্রতিটি শিফটে অন্তত একজন প্রশিক্ষিত ‘ফায়ার ওয়ার্ডেন’ নিয়োগ করা। তৃতীয়ত, কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ: গৃহীত ব্যবস্থাগুলো কাগজে নয়, বাস্তবে সক্রিয় ও কার্যকর কিনা, তা নিয়মিত যাচাই করতে হবে। এজন্য স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ নিরীক্ষা করবে এবং ফায়ার সার্ভিস আগাম নোটিস ছাড়া আকস্মিক পরিদর্শন চালাবে। চতুর্থত, তথ্য প্রকাশ: প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথে কিআর কোডসহ অগ্নিনিরাপত্তা সনদ প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোড স্ক্যান করে যেকোনো নাগরিক জানতে পারবেন সনদের মেয়াদ আছে কিনা, সর্বশেষ পরিদর্শন কবে হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকির মাত্রা কেমন এবং নিরাপত্তা কার্যক্রম নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন।
সর্বশেষ, প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা। প্রতিষ্ঠানের জন্য দায় বীমা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কর্মী ও নাগরিকদের ঝুঁকি বা অনিয়ম জানানোর জন্য একটি অভিযোগ হটলাইন থাকবে। দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতিগ্রস্তরা যেন দ্রুত ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পান, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া প্রয়োজন এমন একটি সমন্বিত ‘দুর্ঘটনা ও প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু ক্ষতিপূরণ আইন’, যেখানে মৃত্যুর স্থান বা পেশা নয়, অবহেলাজনিত মৃত্যুই হবে ক্ষতিপূরণের ভিত্তি; কোনো স্থির ও অপর্যাপ্ত অংকে নয়, ক্ষতিপূরণের অংক নির্ধারিত হবে আইএলও কনভেনশন ১২১-এর মতো আয়ের ক্ষতি ও নির্ভরশীলের সংখ্যার ভিত্তিতে। ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা হবে রাষ্ট্রের দায়ভিত্তিক, যেখানে রাষ্ট্র একটি জাতীয় তহবিল থেকে নির্দিষ্ট সময়ের (যেমন ৯০ দিন) মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে অর্থ দেবে, তারপর দায়ী প্রতিষ্ঠান ও বীমাকারীর কাছ থেকে তা আদায় করবে। এ ব্যবস্থা পরিবারকে বছরের পর বছর মামলার ঘানি টানার হাত থেকে রক্ষা করবে। লাইসেন্সিং সংস্থাগুলোর সমন্বিত ডিজিটাল নিবন্ধন থাকা প্রয়োজন, যেখানে ফায়ার সার্ভিসের নোটিস পাওয়া প্রতিষ্ঠানের তালিকা সিটি করপোরেশন, পর্যটন কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকবে এবং নির্দিষ্ট সময়ে ত্রুটি না সারালে ব্যবসা সিলগালা করা বাধ্যতামূলক হবে; পরিদর্শনের ফলাফল জনসাধারণের জন্য থাকবে সহজে প্রবেশযোগ্য ও প্রকাশ্য। নিশ্চিত করতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা, যেখানে যে প্রতিষ্ঠান জানা ঝুঁকিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি, তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও প্রয়োজনে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেয়ার স্পষ্ট বিধান করতে হবে। দণ্ডবিধিতে করপোরেট হত্যাকাণ্ডের সংজ্ঞায়ন স্পষ্ট করতে হবে; প্রতিষ্ঠানকে অপরাধী সাব্যস্ত করা, টার্নওভারের অনুপাতে জরিমানা এবং সর্বোচ্চ শাস্তি বাড়ানো আবশ্যক। স্বাধীন তদন্ত ও প্রতিবেদন প্রকাশের বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে; বড় দুর্ঘটনার তদন্ত হবে একটি স্থায়ী, স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে, যার প্রতিবেদন নির্দিষ্ট সময়ে সংসদে ও জনসমক্ষে প্রকাশিত হবে। যে ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা রয়েছে, সে ক্ষেত্রে সংস্কার আনতে হবে: আবেদনের সময়সীমা বাড়ানো, আবেদন প্রক্রিয়া সহজ ও অনলাইন করা, উপজেলা পর্যায়ে সহায়তা ডেস্ক এবং অনিয়মের অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মিলিয়ে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর একটি নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান তৈরি করতে হবে এবং নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে, যার আলোকে প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা ও নীতিনির্ধারণ করা যায়।
পরিশেষে বলা যায়, মানুষের জীবনের কোনো অর্থমূল্য হয় না। ক্ষতিপূরণ জীবনের দাম নয়, আর দায় এড়ানোও রাষ্ট্রের লক্ষ্য হতে পারে না। তাই রাষ্ট্রকে মানবিক ও দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে এ নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে যে জীবন সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজ সর্বোচ্চ পর্যায়ে দায়িত্বশীল থাকবে এবং জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্নে শূন্য সহনশীলতার কার্যকর নজির স্থাপন করবে।
সংবিধানে প্রদত্ত জীবনের অধিকার রক্ষার দায় এবং জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে গৃহীত আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে রাষ্ট্রকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর কেবল কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করে থেমে গেলে চলবে না। রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার যে দুর্বলতা দুর্ঘটনাকে সম্ভব করে তোলে, তা চিহ্নিত করে দূর করতে হবে। নাগরিকদের জন্য নিরাপদ সমাজ নিশ্চিত করতে শুধু অঙ্গীকার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তবায়নযোগ্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। কারণ অগ্নিনিরাপত্তারসহ সব দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে প্রতিরোধই সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।
আওরঙ্গজেব আকন্দ: সহযোগী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
