ঢাকঢোলের বাদ্য, উলুধ্বনি আর ভক্তদের উচ্ছ্বাসে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে জড়ো হন নানা বয়সী মানুষ। কারও হাতে প্রতিমা, কারও কণ্ঠে বিদায়ের সুর। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে সৈকতপাড় পরিণত হয় সম্প্রীতির মিলনমেলায়।
আনন্দ, আবেগ আর উৎসবের আবহে বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা।
এর আগে মঙ্গলবার মহানবমী উপলক্ষে কক্সবাজারের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ছিল উপচে পড়া ভিড়। ভক্তরা দেবীর চরণে অঞ্জলি নিবেদন করেন এবং প্রসাদ গ্রহণ করেন। সন্ধ্যা আরতি শেষে শুরু হয় বিদায়ের আবহ। পরের দিন দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান ভক্তরা। এর মধ্য দিয়েই শেষ হয় এবারের দুর্গোৎসব।
বুধবার দুপুরে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সহায়তায় সৈকতের উন্মুক্ত মঞ্চে আয়োজিত বিসর্জন পূর্ববর্তী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা পূজা উদযাপন কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন।
বিশেষ অতিথি ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল, শাহজাহান চৌধুরী, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না, জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান, পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমানসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সংস্থার অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আজকের এই সম্প্রীতির বন্ধন তারই প্রমাণ। বর্তমান সরকারের আমলে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে তাদের ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারছেন। অতীতের তুলনায় এ সরকার তাদের সুযোগ-সুবিধাও বেশি দিচ্ছে।”
বিসর্জন ঘিরে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সেনাবাহিনী, এসআরবি, পুলিশ, আনসার, কোস্টগার্ড, দমকল ও লাইফগার্ডদের সমন্বয়ে গঠিত ছিল কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয়।
এদিকে, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বার্ষিক ধর্মীয় উৎসবের শেষ দিনটি পরিণত হয়েছে সার্বজনীন উৎসবে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীসহ সাধারণ পর্যটকরাও অংশ নেন এই বর্ণিল আয়োজনে।
রামু থেকে আসাধ সঞ্জয় শর্মা বলেন, “মা দুর্গা দুর্গতি নাশ ও অসুর বিনাশের প্রতীক। আমরা দেবীর কাছে প্রার্থনা করেছি, মানুষের অশুভ প্রবৃত্তি ও সমাজের অশান্তি দূর হোক। দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকুক, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
উখিয়া থেকে আসা কণিকা রাণী ধর বলেন, “সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করুক, কেউ যেন অন্যায়-অবিচারের শিকার না হন। সবাই যেন সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করতে পারেন, মহানবমীতে দেবীর কাছে সেই মঙ্গল কামনা করে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েছি।”
রাজধানীর মিরপুর থেকে আশা পর্যটক সালমান হোসাইন বলেন, “এটি একটি সম্প্রীতির বন্ধন। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই উৎসবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা সকলেই আনন্দ ভাগাভাগি করছি।”
এর আগে মঙ্গলবার নবমীতে অশুভ শক্তির বিনাশ, শান্তি ও মঙ্গল কামনায় মহানবমীর পূজা ও অঞ্জলি দিয়েছেন ভক্তরা। কক্সবাজার কেন্দ্রীয় সরস্বতী বাড়ি মন্দিরে সকাল থেকে পূজারিদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। মন্ত্রপাঠ, উলুধ্বনি, ঢাক ও কাঁসর ঘণ্টার শব্দে চলে পূজার আনুষ্ঠানিকতা। পূজা শেষে অনেকে কালীবাড়ি মন্দিরসহ শহরের অন্যান্য মন্দির প্রাঙ্গণে ঘুরাঘুরি ও কেনাকাটা করেন।
এবার কক্সবাজার জেলায় ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৬৯টি মণ্ডপে ঘটপূজা এবং ১৫৫টিতে প্রতিমাপূজা হয়েছে। উপজেলাগুলোর মধ্যে রামুতে ৩৭টি, টেকনাফে ৬টি, চকরিয়ায় ৭১টি, উখিয়ায় ৯টি, কুতুবদিয়ায় ৪৪টি, পেকুয়ায় ৯টি, মহেশখালীতে ২৮টি, ঈদগাঁওয়ে ২৯টি এবং কক্সবাজার সদরে ৩১টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
এছাড়া কক্সবাজার পৌরসভায় ২৬টি, চকরিয়া পৌরসভায় ২৫টি এবং মহেশখালী পৌরসভায় ৬টি পূজামণ্ডপ ছিল।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু বলেন, “কক্সবাজারের পাশাপাশি পাশের জেলা থেকেও অনেক মানুষ প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। সবার সহযোগিতা ও সুন্দর ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়েছে। ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে আমাদের পারস্পরিক সম্প্রীতি ও বন্ধন অটুট থাকুক এটাই প্রত্যাশা করি। অনুষ্ঠানটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করায় সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।”
শারদীয় দুর্গাপূজা গত ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়। এরপর সপ্তমী, অষ্টমী ও মহানবমীর পূজা শেষে বুধবার পালিত হয় বিজয়া দশমী।
