চারদিকে উত্তাল ব্রহ্মপুত্র নদ। দুর্গম রহমতপুর দেবারিখোলা অষ্ট আশির চরের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার একমাত্র ভরসা ছিল ‘খেওয়ার আলগা চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। তবে প্রশাসনিক কোনো অনুমোদন ও নিয়মনীতি না মেনে রাতারাতি সেই বিদ্যালয় ভবনটি ভেঙে লুটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ইউপি সদস্য ছাইফুর রহমানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে।
গত ১ অক্টোবর ভবনটি ভেঙে ফেলার পর থেকে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ ও স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই গত ১২ অক্টোবর থেকে পঞ্চম শ্রেণির মডেল টেস্ট পরীক্ষা শুরু হলেও কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করায় খোলা আকাশের নিচে গাছতলায় বেঞ্চ বসিয়ে পরীক্ষা দিতে বাধ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীভাঙনের অজুহাত দেখিয়ে গত ১ অক্টোবর চরের চার রুমের বারান্দাসহ প্রায় ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ের বিদ্যালয় ভবনটি ভেঙে নেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, ২০১৬ সালে নির্মিত ভবনটির পাশাপাশি চলতি ২০২৬ সালে প্রায় ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন নির্মিত ওয়াশ ব্লকের ইটও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৭ লাখ টাকার সরকারি সম্পদ উধাও করার এই ঘটনায় পুরো এলাকা জুড়ে ক্ষোভ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু বকর, সাহেব আলী ও রোস্তম মিয়া অভিযোগ করে জানান, বিদ্যালয় ভবনটি নদীভাঙনে ঝুঁকিপূর্ণ দাবি করে তড়িঘড়ি ভেঙে নেওয়া হলেও পাশেই থাকা সাবেক সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন ও অভিযুক্ত ইউপি সদস্য ছাইফুর রহমানের বসতবাড়ি এখনও অক্ষত রয়েছে। ভবন ভাঙার নামে কিছু মালামাল পাশে ফেলে রেখে বাকি মালামাল নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার নাটক সাজানো হয়েছে। তারা বিষয়টির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন।
বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জাহানারা বেগম জানান, "কমিটির সদস্য ছাইফুর মেম্বার লোকজন নিয়ে এসে বিদ্যালয়টি ভেঙেছেন। ইট, লোহার এঙ্গেল, সিঁড়ি ও টিনসহ যাবতীয় মালামাল তিনি নিয়ে গেছেন।" কোনো প্রশাসনিক ও কমিটি সংক্রান্ত অনুমোদন ছাড়া কেন এটি ভাঙা হলো— তা জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যান।
সহকারী শিক্ষক মরিয়ম নিপা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "অবকাঠামো না থাকায় শিক্ষার্থীদের মডেল টেস্ট পরীক্ষা বাধ্য হয়ে খোলা আকাশের নিচে নিতে হচ্ছে। ভবন ভাঙার সময়ে আমি নৈমিত্তিক ছুটিতে ছিলাম।"
তবে প্রস্তাবিত যে কমিটির তালিকায় ছাইফুর মেম্বারের নাম রয়েছে, সেটি এখনও অনুমোদিত হয়নি বলে জানা গেছে। অননুমোদিত পদ পরিচয় ব্যবহার করে অসৎ উদ্দেশ্যে তিনি এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ। অভিযুক্ত ইউপি সদস্য ছাইফুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, বিদ্যালয় ম্যানেজিং (অ্যাডহক) কমিটির সভাপতি ও সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জাহেদুল ইসলাম স্বীকার করেন, তিনি মেম্বারকে 'মৌখিকভাবে' বিদ্যালয়টি সরাতে বলেছিলেন। তবে প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া এবং বিকল্প পাঠদানের পথ না করে তিনি কীভাবে মুখে মৌখিক আদেশ দিলেন— এমন প্রশ্নের জবাব তিনি এড়িয়ে যান।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু বকর সিদ্দিক বলেন, "অনুমোদন ও নিয়ম ছাড়া সরকারি বিদ্যালয় ভবন ভাঙা গুরুতর অপরাধ। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসান জানান, "অনুমতি ছাড়া খেওয়ার আলগার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"
দুর্গম চরাঞ্চলের শিশুদের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি এভাবে হারিয়ে যাওয়ায় শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত অভিভাবকরা। দ্রুত বিকল্প শ্রেণিকক্ষ স্থাপন করে স্বাভাবিক শিক্ষা পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জোরালো দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব
