আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতীয় ক্রিকেটে অভিষেকের আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি অমিত মিশ্রর জীবনে। ২০০৩ সালে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পরই ভারতীয় দল থেকে বাদ পড়তে হয়েছিল তাঁকে। এরপর ঘরোয়া ক্রিকেটেও সুযোগ হারানো এবং খারাপ ফর্মের জেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এই প্রাক্তন লেগ স্পিনার। সম্প্রতি প্রাক্তন ভারতীয় ওপেনার আকাশ চোপড়ার সঙ্গে এক আলোচনায় নিজের জীবনের সেই কঠিন অধ্যায়ের কথা তুলে ধরেছেন তিনি। অমিত মিশ্র জানিয়েছেন, প্রায় দেড় বছর ধরে ডিপ্রেশনের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছিল তাঁকে।
নিজের সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে অমিত মিশ্র বলেন, “আমি দেড় বছর ধরে ডিপ্রেশনে ভুগেছিলাম। বারবার ভাবতাম, আমার ভুলটা কোথায় ছিল? আমি বিভিন্ন জায়গায় খেলছিলাম, কিন্তু মাথার মধ্যে একটাই প্রশ্ন ঘুরত,আমি কী ভুল করেছিলাম?”
ভারতীয় দলের হয়ে খেলার পরেও কেন তাঁকে বারবার উপেক্ষা করা হচ্ছিল, তা বুঝতে পারছিলেন না মিশ্র। জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর দলীপ ট্রফি এবং জোনাল পর্যায়ে ইন্ডিয়া ‘এ’ দলেও জায়গা পাননি তিনি। সেই সময় তাঁর পারফরম্যান্সও প্রত্যাশা অনুযায়ী হচ্ছিল না।
অমিত মিশ্রর কথায়, “আমি ভারতের হয়ে খেলেছিলাম, কিন্তু তারপর দল থেকে বাদ পড়লাম। দলীপ ট্রফিতে সুযোগ পেলাম না। জোনাল পর্যায়ে ইন্ডিয়া ‘এ’ দলেও জায়গা হল না। বুঝতেই পারছিলাম না, আমার সঙ্গে কী হচ্ছে। একটা মরশুম খুব খারাপ গেল।”
পরিস্থিতি বদলাতে তাঁকে নিজের পারফরম্যান্সের দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন এক নির্বাচক। সেই পরামর্শ থেকেই নিজের ভুল বুঝতে পারেন মিশ্র। তিনি উপলব্ধি করেন, ভারতীয় দলে ফেরার স্বপ্ন দেখলেও ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিকভাবে ভাল পারফর্ম করতে পারছিলেন না।
কিন্তু ক্রিকেটের মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি মানসিক অবসাদের সঙ্গে লড়াই করাটাও তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল। সেই সময় মনের কথা ভাগ করে নেওয়ার মতো কাউকে পাশে পাননি বলেও জানিয়েছেন মিশ্র। এমনকি পরিবারের সদস্যদেরও নিজের সমস্যার কথা বলতে পারেননি তিনি। তাঁদের আরও চিন্তায় ফেলতে চাননি এই ক্রিকেটার।
অমিত মিশ্র বলেন, “আমার খারাপ সময়ে কথা বলার মতো কেউ ছিল না। পরিবারকেও কিছু বলতে পারিনি। কারও সঙ্গে এসব নিয়ে আলোচনা করতে পারতাম না। সম্পূর্ণ একা ছিলাম।”
তবে একটা সময়ে নিজের পরিস্থিতি বদলানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বুঝতে পারেন, দলে ফিরতে হলে পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাটিংয়েও উন্নতি করার দিকে নজর দেন তিনি। পরিশ্রমের ফলও মেলে। একটি মরশুমে ভাল পারফরম্যান্সের পর ফের দলীপ ট্রফিতে খেলার সুযোগ পান তিনি।
তাঁর কথায়, “আমি বুঝতে পেরেছিলাম, পারফর্ম না করলে কিছুই হবে না। আমাকে ব্যাটিংয়েও উন্নতি করতে বলা হয়েছিল। সেটার ওপরও কাজ করেছিলাম। একটা মরশুমে ভাল খেলার পর দলীপ ট্রফিতে সুযোগ পেলাম। তখন বুঝলাম, এভাবেই এগোতে হবে। আমার কোনও গডফাদার ছিল না। তাই জানতাম, নিজেকে বারবার প্রমাণ করতে হবে।”
অবশেষে ২০০৮ সালের অক্টোবরে ভারতীয় দলে প্রত্যাবর্তন করেন অমিত মিশ্র। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হয় তাঁর। পরবর্তী সময়ে দেশের হয়ে ২২টি টেস্ট, ৩৬টি একদিনের আন্তর্জাতিক এবং ১০টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন তিনি।
আইপিএলেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন এই লেগ স্পিনার। ১৬২টি ম্যাচে ১৭৪টি উইকেট রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। আইপিএলের ইতিহাসে তিনটি হ্যাটট্রিক করা একমাত্র বোলারও অমিত মিশ্র।
কেরিয়ারের শুরুর দিকে মানসিক অবসাদ, দল থেকে বাদ পড়া এবং একাকিত্বের মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন মিশ্র, তাঁর সেই অভিজ্ঞতা আবারও মনে করিয়ে দিল,খেলোয়াড়দের সাফল্যের আড়ালেও লুকিয়ে থাকতে পারে গভীর মানসিক লড়াই।
