ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা সমর্থিত সরকারি বাহিনীর ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সরবরাহপথ দখল এবং সরকারি শিবিরের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি এ অভিযানের সাফল্য নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। রাজধানী সানা পুনর্দখলের লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত এ অভিযানের ভবিষ্যৎ এখন অনেকাংশে নির্ভর করছে সৌদি আরবের সামরিক সহায়তা, রসদ সরবরাহের সক্ষমতা ও বিভিন্ন সরকারি বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর।
সম্প্রতি ইয়েমেনের বন্দরনগরী এডেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ আল-মাশিকের কাছে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হন। হামলার সময় দেশটির পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শায়া আল-জিন্দানি প্রাসাদে উপস্থিত থাকলেও তিনি অক্ষত ছিলেন। হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, সরকারি বাহিনী ও তাদের সমর্থনে নিয়োজিত সরঞ্জাম লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়েছে। নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হুথিদের স্থল অগ্রযাত্রা সরকারি বাহিনীর সামরিক তৎপরতা ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
বিজ্ঞাপন
গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে লোহিত সাগর উপকূল বরাবর দ্রুত অগ্রসর হয়ে হুথিরা মোখা বন্দর দখল করে। পশ্চিম তাইজ অঞ্চলে সরকারি বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ বন্দরটি রসদ সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। পাল্টা অভিযানে সরকারি বাহিনী হারানো কিছু এলাকা পুনর্দখল করতে পারলেও মোখা এখনো হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে উপকূলীয় এলাকায় সরকারি বাহিনীর সরবরাহব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও অবকাঠামোও হুমকির মুখে পড়েছে।
তাইজ শহরের পরিস্থিতি এ সংকটের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। হুথিরা শহরটির সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সদর দপ্তর এডেনের সংযোগকারী প্রধান সড়ক বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। আশপাশের পাহাড়ি এলাকার বিকল্প পথগুলোও বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শহরটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং গত সপ্তাহে পেট্রলের দাম তিন গুণ বেড়েছে। দীর্ঘস্থায়ী এ পরিস্থিতি বেসামরিক মানুষের জীবনযাত্রার পাশাপাশি সরকারি বাহিনীর গোলাবারুদ, জ্বালানি ও অতিরিক্ত সেনা সরবরাহেও বড় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
তবে সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, সরবরাহপথে বাধা সৃষ্টি হলেও অভিযান বন্ধ হবে না। পশ্চিম ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জয়েন্ট ফোর্সেসের মুখপাত্র কর্নেল ওয়াদাহ আল-দুবাইশের মতে, হুথিরা সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করার চেষ্টা করলেও পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি। স্থল, নৌ ও আকাশপথ ব্যবহার করে বিকল্প উপায়ে রসদ পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। তবে এতে সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে এবং কোনো কোনো রণাঙ্গনে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
বিকল্প সরবরাহপথ ও সৌদি সহায়তার ওপর নির্ভরতা
সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় পশ্চিমা সমর্থিত সরকারি বাহিনী বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ইয়েমেনের উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী ফয়সাল আল-মাজিদির ভাষ্য অনুযায়ী, শাবওয়া, মারিব, তাইজের হুথিমুক্ত এলাকা, লোহিত সাগর উপকূল এবং দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন কেন্দ্রকে কাজে লাগিয়ে পৃথক রণাঙ্গনে রসদ পৌঁছানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য কৌশলগত পাহাড়ি এলাকাগুলো দখলে রাখার চেষ্টা চলছে।
তাইজের আল-ওয়াজিয়াহ পার্বত্য জেলাটি এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এলাকাটি লোহিত সাগর উপকূলের ওপর নজরদারির সুযোগ দেয় এবং পশ্চিম দিক থেকে তাইজ শহরের অবরোধ ভাঙার সম্ভাব্য প্রবেশপথ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এ এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। তবে বিকল্প সরবরাহপথ থাকলেই যে দীর্ঘমেয়াদে একটি বড় সামরিক অভিযান চালানো সম্ভব হবে, তা নিশ্চিত নয়। কারণ, প্রতিটি রণাঙ্গনে নিয়মিত গোলাবারুদ, জ্বালানি, চিকিৎসাসামগ্রী ও নতুন সেনা পাঠাতে হলে কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা বজায় রাখা জরুরি।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সামরিক সহায়তা সরকারি বাহিনীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, অক্টোবরের শুরু থেকে তাদের হামলায় হুথিদের শত শত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে।
আল-দুবাইশের মতে, ইরানের সরবরাহ করা উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সক্ষমতাসম্পন্ন হুথিদের মোকাবিলায় সৌদি সহায়তা ছাড়া ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর পক্ষে বড় ধরনের অভিযান চালানো কঠিন। সৌদি বিমান হামলা হুথিদের শক্তিবৃদ্ধি ঠেকানো, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণব্যবস্থা ধ্বংস করা এবং স্থলবাহিনীকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে তাইজ অবরোধের সাম্প্রতিক পর্যায়ে সরকারি বাহিনীর কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পৌঁছাতে আগের মতো আকাশপথে সরবরাহের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে বড় বাধা বাহিনীগুলোর সমন্বয়হীনতা
সরকারি বাহিনীর জন্য শুধু রসদ সংকটই নয়, অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতাও বড় সমস্যা। হুথিবিরোধী শিবিরের বিভিন্ন সামরিক ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে পৃথক নেতৃত্ব, অর্থায়ন ও কমান্ড কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়েছে। ফলে কোনো এলাকায় হুথিরা দ্রুত অগ্রসর হলে অন্য বাহিনীগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। গত সেপ্টেম্বরে লোহিত সাগর উপকূলে সরকারি বাহিনীর পরাজয়ের পেছনেও এ দুর্বলতা ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এ সমস্যা দূর করতে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল জানুয়ারিতে সুপ্রিম মিলিটারি কমিটি (এসএমসি) গঠন করে। জাতিসংঘ-স্বীকৃত সরকারের প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমির নেতৃত্বাধীন কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য হলো বিভিন্ন হুথিবিরোধী বাহিনীকে একটি কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীনে এনে সরকারি সামরিক কাঠামোর সঙ্গে সমন্বিত করা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থনপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের বাহিনী পরাজিত হওয়ার পর এ উদ্যোগ আরো গুরুত্ব পায়।
ইয়েমেনের সামরিক বিষয়ে গবেষক আদনান আল-জাবারনির মতে, বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় আগের তুলনায় উন্নত হচ্ছে। তবে নতুন কমান্ড কাঠামো কার্যকর করতে সময় প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক বিভাজন, পৃথক অর্থায়ন এবং নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। তাই কাগজে-কলমে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে তার বাস্তব প্রতিফলন কতটা ঘটছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
পশ্চিমা সমর্থিত সরকার দীর্ঘমেয়াদে টিকবে কি না
ইরান সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনীর অভিযান এখন একাধিক রণাঙ্গনে ছড়িয়ে রয়েছে। লোহিত সাগর উপকূল, তাইজ শহরের আশপাশ এবং সানার পূর্বাঞ্চলে মারিব ও আল-জাওফ এলাকায় লড়াই চলছে। এসব এলাকায় একযোগে অভিযান পরিচালনা করতে হলে বিপুল পরিমাণ রসদ, নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ এবং সমন্বিত সামরিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। হুথিরা যদি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সরবরাহকেন্দ্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো বাড়াতে পারে, তাহলে সরকারি বাহিনীর পক্ষে একই সঙ্গে সব রণাঙ্গনে চাপ বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে, সৌদি বিমান সহায়তা এবং বিকল্প সরবরাহপথের ব্যবহার সরকারি বাহিনীকে অভিযান অব্যাহত রাখার সুযোগ দিতে পারে। সরকারি কর্মকর্তারা মনে করছেন, হুথিদের হামলা তাদের অভিযান থামানোর বদলে আরো জোরদার করতে পারে। তবে এ দাবি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো, তাইজের অবরোধ ভাঙা এবং মোখার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো পুনর্দখলের সক্ষমতার ওপর।
সব মিলিয়ে, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী আপাতত অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখলেও হুথিদের পরাজিত করে সানা পুনর্দখলের লক্ষ্য অর্জন এখনো অনিশ্চিত। সৌদি আরবের সামরিক সহায়তা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই একমাত্র নির্ধারক নয়। সরবরাহপথ সচল রাখা, যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং বিভিন্ন বাহিনীকে কার্যকর একক কমান্ডের অধীনে পরিচালনা করতে পারাই হবে অভিযানের স্থায়িত্ব ও সাফল্যের প্রকৃত পরীক্ষা।
আরএ
