একটি মৃত ছানাকে শুঁড় ও দাঁতের সাহায্যে আগলে নিয়ে চলেছে একটি হাতি। দৃশ্যটি দেখলে বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। ছানাটির মৃত্যু হয়েছে, তবু তাকে ছেড়ে যেতে পারছে না হাতিটি। কেন? হাতিটি কি নিজের সন্তান হারিয়েছে, নাকি অন্য কোনো হাতির ছানাকে এভাবে আগলে রেখেছে? ছবিটির দিকে তাকালে মনে হয়, হাতির মনের ভেতরেও হয়তো এমন কিছু অনুভূতি আছে, যা আমরা পুরোপুরি বুঝতে পারি না।
এই ছবিই ইতালির আলোকচিত্রী ফেদেরিকো ভেরোনেসিকে এনে দিয়েছে ২০২৬ সালের ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ারের খেতাব। বন্যপ্রাণীর ছবি তোলার ২০ বছরের অভিজ্ঞতায় এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখেননি তিনি। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল তাঁর দেখা সবচেয়ে হৃদয়বিদারক, বিস্ময়কর ও নাটকীয় ঘটনা।
প্রকৃতির গল্প শুধু এই একটি ছবিতেই শেষ নয়। মাঝেমধ্যে একটি ছোট্ট গুবরে পোকার পরিশ্রম কিংবা ফুলে বসার প্রস্তুতি নেওয়া ভোমরাও আমাদের সামনে খুলে দিতে পারে প্রকৃতির অন্য রকম এক জানালা। এমন সব মুহূর্ত ক্যামেরায় ধরে রাখার জন্যই প্রতিবছর আয়োজন করা হয় ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার প্রতিযোগিতা। লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের নানা প্রান্তের আলোকচিত্রীরা তাঁদের তোলা অসাধারণ সব ছবি জমা দেন।
২০২৬ সালের বিজয়ী ছবিগুলোর মধ্যে যেমন আছে প্রাণীদের জীবন ও আচরণের গল্প, তেমনি আছে পরিবেশের পরিবর্তন, মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সম্পর্ক এবং প্রকৃতির অদ্ভুত সব দৃশ্য। কোনো ছবি আমাদের মুগ্ধ করে, কোনোটি ভাবায়, আবার কোনোটি মন খারাপ করে দেয়। চলুন, একে একে দেখে নেওয়া যাক এবারের পুরস্কারজয়ী ছবিগুলোর গল্প।
মৃত ছানাকে আগলে রাখা হাতি

আলোকচিত্রী: ফেদেরিকো ভেরোনেসি, ইতালি
স্থান: নামিবিয়ার হুয়াব নদীর উপত্যকা
নামিবিয়ার হুয়াব নদীর উপত্যকায় হাতির খোঁজে ঘুরছিলেন ফেদেরিকো ভেরোনেসি। নদীর খাত তখন শুকনো। বালুর ওপর হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ে অদ্ভুত কিছু দাগ। দেখে মনে হচ্ছিল, কোনো ভারী জিনিস বালুর ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দাগগুলো অনুসরণ করতে করতে তিনি এমন একটি দৃশ্যের সামনে এসে দাঁড়ালেন, যা তাঁর দীর্ঘ আলোকচিত্রীজীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে।
একটি স্ত্রী হাতি মৃত একটি বাচ্চা নিয়ে হাঁটছে। বাচ্চাটির একটি পা আটকে আছে হাতিটির দাঁত ও শুঁড়ের মাঝখানে। হাতিটি এভাবেই বাচ্চাটিকে নিয়ে চলেছে। প্রথমে ভেরোনেসি ভেবেছিলেন, বাচ্চাটি ওই হাতিরই সন্তান। কিন্তু পরে তাঁর তোলা ছবিগুলো এলাকার হাতি গবেষকদের দেখান। তখন জানা যায়, ছানাটি ওই হাতির বাচ্চা কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
গবেষকেরা পরে হাতিটিকে চিনতে পেরেছিলেন। কয়েক বছর আগে হাতিটি নিজের একটি বাচ্চা হারিয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, অন্য স্ত্রী হাতির মৃত বাচ্চাও এর আগে তুলে নিতে দেখা গেছে ওই হাতিটিকে। ফলে ছবির হাতিটি নিজের বাচ্চাকে নিয়ে হাঁটছিল, নাকি অন্য কোনো হাতির বাচ্চা, তা অজানাই থেকে যায়।
তবে ছবিটির গুরুত্ব শুধু এই প্রশ্নে আটকে নেই। প্রাণীদের অনুভূতি নিয়ে আমাদের ধারণাকেও এটি নতুন করে ভাবতে শেখায়। ভেরোনেসি বলেছেন, প্রাণীদের ছবি তোলার ২০ বছরের অভিজ্ঞতায় এটিই তাঁর দেখা সবচেয়ে হৃদয়বিদারক, বিস্ময়কর ও নাটকীয় ঘটনা। তাঁর মতে, এই মুহূর্ত প্রাণীদের অনুভূতির গভীরতা ও জটিলতার কিছুটা আভাস দেয়।
আমরা প্রায়ই প্রাণীদের দেখি তাদের শরীর, আকার কিংবা আচরণের ভিত্তিতে। কিন্তু তাদেরও নিজস্ব সম্পর্ক, স্মৃতি ও অনুভূতি থাকতে পারে, সেটি মনে করিয়ে দিতে চান ভেরোনেসি। তাঁর আশা, ছবিটি দেখে মানুষ প্রাণীদের শুধু প্রাণী হিসেবে না দেখে আলাদা আলাদা সত্তা হিসেবেও চিনতে শিখবে।
তিনি ছবিটিকে বলেছেন, ‘এমন একটি ছোট্ট জানালা, যা সামান্য ফাঁক হয়ে প্রাণীদের জটিল জগৎ দেখার সুযোগ করে দেয়।’ ছবিটি আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেয় না। বরং নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। এটাই বোধ হয় একটি ভালো ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি।
ভালোবাসার শ্রম

আলোকচিত্রী: অস্কার হুইটফিল্ড, জিম্বাবুয়ে ও যুক্তরাজ্য
স্থান: জিম্বাবুয়ের জাম্বেজি জাতীয় উদ্যান
একটি ছোট্ট গুবরে পোকা। ওটার সামনে গোবরের একটি বল। সেই বল ঠেলে বালুর ঢাল বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছে পোকাটা। কাজটা দেখতে সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু বলটি ঠেলে নিয়ে যেতে যে কতটা শক্তি ও পরিশ্রম দরকার, তা বোঝাতে হলে ছবিটা তুলতে হবে একেবারে পোকার চোখের সমান উচ্চতা থেকে।
সেই কাজটিই করেছেন অস্কার হুইটফিল্ড। পরিবারের সঙ্গে জিম্বাবুয়েতে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন তিনি। তাঁর বাড়ি ভিক্টোরিয়া ফলসের কাছে। সেখানে একদিন চোখে পড়ে গোবরের বল ঠেলে নিয়ে যাওয়া একটি গুবরে পোকা। পোকাটির পেছন পেছন উড়ছিল কয়েকটি মাছি। দৃশ্যটি দেখে ছবি তোলার সিদ্ধান্ত নেন অস্কার। নানা দিক থেকে তিনি ছবি তোলেন। নানা কোণ পরীক্ষা করতে করতে শেষ পর্যন্ত এমন একটি মুহূর্ত ধরে ফেলেন, যেখানে পোকার পরিশ্রম স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ছবিটি তোলার জন্য তাঁকে ধুলোর ওপর শুয়ে পড়তে হয়েছিল। ক্যামেরা নামিয়ে আনতে হয়েছিল মাটির কাছাকাছি। এতে গুবরে পোকার ছোট্ট জগৎটাও যেন আমাদের চোখের সামনে বড় হয়ে ওঠে। অস্কারের আশা, ছবিটি দেখে মানুষ প্রকৃতির ছোট ছোট ঘটনার দিকে নতুন করে তাকাবে। কারণ, প্রকৃতিতে অনেক কিছুই ঘটে আমাদের চোখের আড়ালে। যে কাজকে আমরা তুচ্ছ বলে পাশ কাটিয়ে যাই, তার পেছনেও থাকতে পারে অসাধারণ পরিশ্রমের গল্প।
বাম্বেলবি’র ওড়াউড়ি

আলোকচিত্রী: অ্যামেলি ডেভিস, যুক্তরাজ্য
স্থান: ইংল্যান্ডের সারে
পুরস্কারজয়ী ছবি তুলতে দামি ক্যামেরা লাগে, পাড়ি দিতে হয় দূরদেশে, মাঝেমধ্যে দুর্গম জঙ্গলে কাটাতে হয় দিনের পর দিন। তবে এই ধারনাটা কিন্তু পুরোপুরি সত্য নয়। অ্যামেলি ডেভিসের এই ছবিটি তা আবার প্রমাণ করেছে।
মাত্র ১০ বছর বা তার কম বয়সীদের বিভাগে পুরস্কার জিতেছে তাঁর তোলা একটি ভোমরার ছবি। আর ছবিটি তোলার জন্য তিনি ব্যবহার করেছেন বাবার স্মার্টফোন। জায়গাটিও দূরের কোনো বনজঙ্গল নয়, নিজেদের বাড়ির বাগান।
ছবিতে দেখা যায়, সাধারণ এক প্রজাতির ভোমরা ফুলে বসতে যাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে তার ডানার একটি ঝাপটাকে ক্যামেরায় আটকে ফেলেছেন অ্যামেলি। চোখের পলকে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি ছবিতে থেমে আছে। ভোমরাটি যেন আকাশে ভেসে আছে, ফুলের ওপর নামার জন্য তৈরি হচ্ছে।
প্রকৃতিতে এমন মুহূর্ত আমাদের চারপাশেই ঘটে। কিন্তু সেগুলো চোখে পড়ার জন্য দরকার একটু মনোযোগ, আর সঠিক সময়ে ছবি তোলার কৌশল। অ্যামেলির ছবিটি মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির বিস্ময় দেখতে সব সময় দূরে যেতে হয় না। মাঝেমধ্যে নিজের বাড়ির বাগানেই অপেক্ষা করে থাকে দারুণ দারুণ দৃশ্য।
জলাশয়ে দেখা

আলোকচিত্রী: জেমস লুইন, যুক্তরাজ্য
স্থান: কেনিয়ার চিউলু হিলস জাতীয় উদ্যান
জলাশয় অনেক প্রাণীরই মিলনস্থল। তৃষ্ণা মেটাতে কেউ আসে, কেউ আসে শরীর ঠান্ডা করতে। আবার কখনো একই জায়গায় এসে হাজির হয় ভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। তাদের মধ্যে কারও কারও দেখা হয়, কারও হয়তো কোনো কথাই হয় না। তবু একই জলাশয়ের পাশে তৈরি হয় প্রকৃতির নিজস্ব এক দৃশ্য।
জেমস লুইনের তোলা ছবিতে দেখা যায়, একটি তরুণ পুরুষ হাতি জলাশয়ের কাছে জেব্রাদের দিকে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছে। ছবিটি সাদাকালো। আলোও এমন কোমল যে পুরো দৃশ্যটিকে স্বপ্নের মতো মনে হয়।
সাধারণত দিনের তীব্র আলোয় ছবি তুললে প্রাণীদের গায়ের রং, ছায়া আর চারপাশের পরিবেশ বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই আলো কখনো কখনো ছবিকে কঠিন ও কড়া করে তোলে। লুইন এ সমস্যা এড়াতে এমন একটি ক্যামেরা ব্যবহার করেছেন, যেটিকে ইনফ্রারেড আলোতে ছবি তোলার উপযোগী করে বদলে নেওয়া হয়েছিল।
ফলে ছবিতে আলো-ছায়ার এক অন্য রকম খেলা তৈরি হয়েছে। হাতি ও জেব্রাদের পরিচিত দৃশ্যও হয়ে উঠেছে অচেনা, প্রায় স্বপ্নের মতো।
আড়াল থেকে উঁকি

আলোকচিত্রী: অ্যারন স্যান্ডার্স, যুক্তরাজ্য
স্থান: কর্নওয়ালের পোর্থকেরিস সৈকত
সমুদ্রের নিচে কেল্প নামে বড় সামুদ্রিক শৈবালের জঙ্গল। তার আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি অক্টোপাস। বাইরে থেকে হয়তো ওকে দেখাই যেত না। কিন্তু শৈবালের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে তার একটি চোখ। সেই চোখেই আটকে গেছে আলোকচিত্রী অ্যারন স্যান্ডার্সের দৃষ্টি।
সাধারণ অক্টোপাস সাধারণত ভূমধ্যসাগরের উষ্ণ পানিতে বেশি দেখা যায়। কিন্তু পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বসন্তকালে সমুদ্রের পানিও উষ্ণ হচ্ছে। ফলে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্রেও এই প্রাণীর দেখা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
স্যান্ডার্সের ছবিটি শুধু একটি অক্টোপাসের প্রতিকৃতি নয়। এটি যেন লুকিয়ে থাকা দুটি প্রাণীর চোখাচোখির মুহূর্ত। তিনি জানিয়েছেন, অক্টোপাসটির সঙ্গে তাঁর চোখাচোখি হওয়ার পর স্যান্ডার্স ও অক্টোপাসটিও স্থির হয়ে ছিল। তাঁর মনে হয়েছিল, উভয়ের মধ্যে যেন একই রকম কৌতূহল কাজ করছে।
মানুষ আর অন্য প্রাণীর মধ্যে এমন মুহূর্ত তৈরি হলে সেটি সহজেই আমাদের মনে দাগ কাটে। অক্টোপাসটি কী ভাবছিল, তা আমরা জানি না। কিন্তু তার চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, সেও যেন আমাদের লক্ষ করছে।
জলাভূমির গোপন দৃশ্য

আলোকচিত্রী: ইসাক প্রিটোরিয়াস, দক্ষিণ আফ্রিকা
স্থান: উগান্ডার মাম্বাবা জলাভূমি
জলাভূমির পানিতে নৌকা নিয়ে এগিয়ে চলেছেন আলোকচিত্রী ইসাক প্রিটোরিয়াস। সঙ্গে একজন পথপ্রদর্শক। চারপাশে জল আর জলজ উদ্ভিদ। এমন পরিবেশেই দেখা মিলল দুটি শুবিল পাখির। বিরল এই পাখি দুটিকে একসঙ্গে ক্যামেরাবন্দী করার সুযোগ হাতছাড়া করেননি তিনি।
ধারণা করা হচ্ছে, পাখি দুটি প্রজননরত এক জোড়া শুবিল। তারা বাসা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করছিল। শুবিল পাখির নাম শুনলে মনে হতে পারে, এটি বুঝি সারসজাতীয় কোনো পাখি। কিন্তু নামের মিল থাকলেও এরা আসলে সারসের চেয়ে পেলিক্যান, বক ও আইবিস পাখির সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
শুবিলদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ধারণা করা হয়, পৃথিবীর বুনো পরিবেশে পূর্ণবয়স্ক শুবিলের সংখ্যা পাঁচ হাজার তিন শরও কম। তাই প্রাকৃতিক পরিবেশে এমন দুটি পাখিকে একসঙ্গে দেখা এবং তাদের আচরণ ক্যামেরায় ধরে রাখা বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রিটোরিয়াসের ছবিটি আমাদের এমন এক জগতের সামনে দাঁড় করায়, যেখানে প্রাণীরা নিজেদের নিয়মে জীবন চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই জগৎ টিকে থাকবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে তাদের আবাসস্থল কতটা নিরাপদ থাকছে তার ওপর।
আলোয় আঁকা পাখির গান

আলোকচিত্রী: কনরাড গ্রেটার, জার্মানি
স্থান: জার্মানির বাডেন-ভুর্টেমবার্গ
বসন্তের সকাল। চারপাশে নতুন প্রাণের সাড়া। এ সময় পুরুষ ব্ল্যাকবার্ডরা উঁচু কোনো জায়গায় বসে গান গায়। সেই গানের উদ্দেশ্য শুধু চারপাশকে মুখর করে তোলা নয়। সঙ্গী খুঁজে পাওয়ার চেষ্টাও এর একটি কারণ।
কনরাড গ্রেটারের ছবিতে এমনই এক ব্ল্যাকবার্ড ধরা পড়েছে। ছবিটি তোলা হয়েছে ভোরবেলায়, একটি আঙুরের বাগানে। পাখিরা দিনের এই সময়টায় সবচেয়ে জটিল ও বৈচিত্র্যময় সুরে গান গায়। পাখির গান আমরা প্রায়ই শুনি। সকালে জানালার বাইরে, গাছের ডালে কিংবা বাড়ির পাশের ঝোপে। কিন্তু সেই গান যে কতটা যত্ন নিয়ে তৈরি হয়, তা সব সময় খেয়াল করি না। প্রতিটি সুর, বিরতি আর ডাকের মধ্যে থাকতে পারে যোগাযোগের নানা সংকেত।
ছবিটির নাম বার্ডসং পেইন্টেড ইন লাইট। অর্থাৎ আলোয় আঁকা পাখির গান। নামটি যেন দৃশ্যটিকে আরও সুন্দর করে তোলে। পাখির গান শোনা যায় কানে, আর তার সকালের উপস্থিতি ধরা পড়ে চোখে। গ্রেটারের ছবিতে সেই দুই অনুভূতি যেন এক হয়ে গেছে।
শহরের জঙ্গল

আলোকচিত্রী: শেথ ফরেস্টসন, যুক্তরাজ্য
স্থান: থাইল্যান্ডের ব্যাংককের লুম্ফিনি পার্ক
একদিকে আধুনিক শহরের আকাশছোঁয়া ভবন, অন্যদিকে কাদার ওপর বসে থাকা একটি গুইসাপ। দৃশ্যটি দেখে মনে হতে পারে, বন্যপ্রাণী আর শহর যেন দুই ভিন্ন জগতের বাসিন্দা। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রাণী মানুষের তৈরি পরিবেশের সঙ্গেও মানিয়ে নিয়ে বেঁচে আছে।
শেথ ফরেস্টসন ব্যাংককের লুম্ফিনি পার্কে এই ছবিটি তুলেছেন। গুইসাপটির ছবি তোলার জন্য তিনি নিজেও নেমে পড়েছিলেন কাদায়। নিচু হয়ে এমনভাবে ক্যামেরা ধরেছিলেন, যাতে প্রাণীটির পেছনে শহরের আকাশ দেখা যায়।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন শহরে এই ধরনের গুইসাপ দেখা যায়। এরা বেশ মানিয়ে নিতে পারে। খাবার হিসেবে যা পায়, তা-ই খাওয়ার চেষ্টা করে। মাছের মধ্যে ক্যাটফিশ ও কৈ মাছও এদের খাদ্যতালিকায় থাকতে পারে। শহরকে আমরা সাধারণত মানুষের জায়গা হিসেবেই দেখি। কিন্তু শহরের পার্ক, জলাশয় আর গাছপালার মধ্যে অন্য প্রাণীরাও নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকে। ফরেস্টসনের ছবিটি সেই সহাবস্থানের গল্প বলে। শহর যত বড় হচ্ছে, ততই আমাদের মনে রাখা দরকার, এই পৃথিবী শুধু মানুষের নয়।
ইলের ভালোবাসা

আলোকচিত্রী: টনি উ, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান
স্থান: জাপানের কিউশু দ্বীপের কাগোশিমা প্রিফেকচার
সমুদ্রের নিচে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যা মানুষের চোখে খুব কমই ধরা পড়ে। প্রাণীরা সেখানে নিজেদের মতো করে খাবার খোঁজে, আশ্রয় নেয়, সঙ্গী খোঁজে। কিন্তু তাদের আচরণ ক্যামেরায় ধরে রাখতে হলে শুধু ভালো যন্ত্র থাকলেই চলে না, প্রাণীদের বিরক্ত না করে তাদের কাছে পৌঁছানোও জরুরি।
টনি উ এমনই একটি কঠিন কাজ করেছেন। তিনি ‘অ্যাবটস মোরে ইল’ নামে সামুদ্রিক মাছের প্রণয় আচরণের ছবি তুলেছেন। ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের মতে, এই প্রজাতির মোরে ইলের প্রণয় আচরণ সম্ভবত এই প্রথম ক্যামেরায় ধরা পড়ল।
এ কাজের জন্য উ জীববিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। মাছগুলোকে বিরক্ত না করতে ব্যবহার করেছেন মৃদু লাল আলো এবং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি বিশেষ ফিশআই লেন্স। ফিশআই লেন্স দিয়ে চারপাশের অনেকটা বিস্তৃত দৃশ্য একসঙ্গে ছবিতে ধরা যায়।
সমুদ্রের নিচে ছবি তোলার সময় অতিরিক্ত আলো বা মানুষের নড়াচড়া প্রাণীদের স্বাভাবিক আচরণ বদলে দিতে পারে। তাই এমন ছবি তোলার ক্ষেত্রে ধৈর্য ও সতর্কতা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
সান ফ্রান্সিসকোর ধূর্ত কোয়োট

আলোকচিত্রী: লরেন এলিয়ট, যুক্তরাষ্ট্র
স্থান: যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো
একটি বড় শহরে মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর বসবাস কেমন হতে পারে? সান ফ্রান্সিসকোর কোয়োটদের গল্পে তার একটি নমুনা পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, সান ফ্রান্সিসকো শহরে প্রায় ১০০টি কোয়োট বাস করে। মানুষের ভিড়, গাড়ি, বাড়িঘর আর শহরের ব্যস্ততার মধ্যেই তারা নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। তবে মানুষের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সব সময় মসৃণ নয়।
কোয়োট সুযোগ পেলে পোষা প্রাণীর ওপর আক্রমণ করতে পারে। এ কারণে অনেক বাসিন্দা তাদের নিয়ে উদ্বিগ্ন। আবার কোয়োট শহরের রোগ ছড়াতে পারে এমন ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ফলে কেউ তাদের বিপজ্জনক মনে করেন, কেউ আবার শহরের পরিবেশে তাদের উপস্থিতিকে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নেন।
লরেন এলিয়টের আলোকচিত্রভিত্তিক এই গল্পের বিষয় কোয়োটদের সেই জটিল জীবন। শহরের মধ্যে বন্যপ্রাণীর বসবাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু প্রাণীটিকে ভালো বা খারাপ বললেই চলে না। দেখতে হয়, মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন, পরিবেশে তার ভূমিকা কী এবং দুই পক্ষের নিরাপদ সহাবস্থান কীভাবে সম্ভব।
সন্তান রক্ষার চেষ্টা

আলোকচিত্রী: অ্যান্টন সরোকিন, যুক্তরাষ্ট্র
স্থান: ক্যালিফোর্নিয়ার কনট্রা কোস্টা কাউন্টি
পুকুরের পানি ঘোলা। তার নিচে ক্যামেরা আর আলো নামিয়ে এমন একটি মুহূর্ত ধরে রেখেছেন অ্যান্টন সরোকিন, যা সাধারণত পানির ওপর থেকে দেখা কঠিন। ছবিতে দেখা যায়, একটি ক্যালিফোর্নিয়া নিউট ডিম পাড়ছে। নিউট একধরনের উভচর প্রাণী। জীবনের এক পর্যায়ে এরা পানিতে থাকে, আবার অনেক প্রজাতির জীবনচক্রে স্থলভাগেও চলাফেরা করার পর্ব রয়েছে।
পানির নিচে ছবি তোলার সময় ঘোলাটে পানি, কম আলো আর চারপাশের বাধা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তার ওপর প্রাণীটি যেন মানুষের উপস্থিতিতে বিরক্ত না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হয়। সরোকিন ক্যামেরা ও আলো পুকুরের পানিতে নামিয়ে এই বিশেষ মুহূর্তটি ধরে রেখেছেন।
ছবিটির নাম প্রোটেকটিভ পোজ, অর্থাৎ রক্ষার ভঙ্গি। এই নামটিই প্রমাণ করে, প্রকৃতিতে নতুন জীবনের শুরু কত নীরবে ঘটে। ডিম পাড়ার মতো সাধারণ একটি জৈবিক ঘটনাও ঠিকভাবে দেখলে হয়ে উঠতে পারে অসাধারণ এক দৃশ্য।
বালুর নিচে আশ্রয়

আলোকচিত্রী: সীতারাম রাউল, ভারত
স্থান: ভারতের রাজস্থানের থর মরুভূমি
সীতারাম রাউল রাতের বেলায় থর মরুভূমির বালিয়াড়ি ঘুরে অনেক বিচ্ছু দেখেছিলেন। তারা খাবারের খোঁজে এদিক-ওদিক ঘুরছিল। কিন্তু সূর্য ওঠার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করলে তীব্র গরম থেকে বাঁচতে একটি বিচ্ছু বালুর নিচে গর্ত খুঁড়ে ঢুকে পড়ছিল। সেই মুহূর্তই ক্যামেরায় ধরে রাখেন রাউল।
ছবিটির নাম শিফটিং স্যান্ড, অর্থাৎ সরে যাওয়া বালু। মরুভূমিতে বালু সব সময় এক জায়গায় থাকে না। বাতাসের সঙ্গে বদলে যায় বালিয়াড়ির আকার। এই পরিবর্তনশীল পরিবেশে বিচ্ছুর মতো প্রাণীদেরও নিজেদের টিকে থাকার কৌশল তৈরি করতে হয়েছে।
বাইরে থেকে মরুভূমিকে প্রাণহীন মনে হতে পারে। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, সেখানে জীবন থেমে নেই। প্রাণীরা কখনো রাতের অন্ধকারে সক্রিয় হয়, কখনো গরম থেকে বাঁচতে মাটির নিচে লুকিয়ে পড়ে। রাউলের ছবিতে ধরা পড়েছে টিকে থাকার সেই ছোট্ট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।
রাতের আধারে খাবারের খোঁজ

আলোকচিত্রী: অ্যালেক্স লিন্ডব্লুম, যুক্তরাষ্ট্র
স্থান: ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া অঞ্চলে চেন্দেরাওয়াসিহ উপসাগরের কাছে
রাতে আলো জ্বলছে একটি ভাসমান মাছ ধরার মঞ্চে। স্থানীয়ভাবে এ ধরনের মঞ্চকে বলা হয় ‘বাগান’। সেখানে জাল ফেলে মাছ ধরা হয়। আর সেই আলোয় আকৃষ্ট হয়েছে বিশাল এক হোয়েল শার্ক।
হোয়েল শার্ক পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মাছ। নামের মধ্যে ‘হোয়েল’ থাকলেও এটি মাছ, স্তন্যপায়ী প্রাণী নয়। আকারে বিশাল হলেও সাধারণত এরা ছোট ছোট সামুদ্রিক প্রাণী ও খাদ্যকণা ছেঁকে খায়। অ্যালেক্স লিন্ডব্লুম এই ছবিটি তোলার জন্য ভোরের দিকে হাঙরের খোঁজ করছিলেন। তখন প্রাকৃতিক আলো এত কম ছিল যে ড্রোন দিয়ে ছবি তোলা কঠিন। তাই মাছ ধরার মঞ্চের উজ্জ্বল আলো কাজে লাগান তিনি। সেই আলোয় শার্কটিকে দেখা যায়, মাছ ধরার মঞ্চে ধরা পড়া মাছের দিকে এগিয়ে আসছে।
ছবিটির মধ্যে রাতের সমুদ্রের এক অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। একদিকে মানুষের মাছ ধরার ব্যবস্থা, অন্যদিকে খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো বিশাল সামুদ্রিক প্রাণী। তাদের পথ এসে মিশেছে একই জায়গায়।
আলোয় জেগে ওঠা মাশরুম

আলোকচিত্রী: আগোরাস্তোস পাপাতসানিস, গ্রিস
স্থান: গ্রিসের পিয়েরিয়ার লিতোখোরো
মরা গাছের গুঁড়ির ওপর ছোট ছোট মাশরুম গজিয়েছে। স্বাভাবিক আলোয় এগুলো হয়তো খুব সাধারণই দেখাত। কিন্তু বিশেষ আলো ব্যবহার করে দৃশ্যটিকে অন্য রকম করে তুলেছেন আগোরাস্তোস পাপাতসানিস।
গ্রিসের অলিম্পাস পর্বতের নিচের ঢালে একটি পচতে থাকা গাছের গুঁড়িতে জন্মেছিল মাশরুমগুলো। এগুলো বিউটিফুল বনেটস নামে পরিচিত। পাপাতসানিস মাশরুমগুলোকে আলোকিত করতে অতিবেগুনি আলো ব্যবহার করেন।
অতিবেগুনি আলো মানুষের চোখে সাধারণত সরাসরি দেখা যায় না। তবে উপযুক্ত আলোকচিত্রের কৌশলে এই আলো ব্যবহার করে কোনো দৃশ্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা সম্ভব। পাপাতসানিসের ছবিতে তাই মাশরুমগুলোকে মনে হয় যেন অন্ধকারের মধ্যে আলাদা করে জেগে উঠেছে।
মরা গাছের গুঁড়ি মানেই যে জীবনের সমাপ্তি, তা নয়। পচতে থাকা কাঠে নানা ছত্রাক ও ক্ষুদ্র প্রাণী জন্মায়। তারা পরিবেশে পুষ্টি ফিরিয়ে দিতেও সাহায্য করে। অর্থাৎ, একটি গাছের জীবন শেষ হওয়ার পরও তার শরীর অন্য জীবের বেঁচে থাকার উপকরণ হয়ে উঠতে পারে।
এই ছবির নাম শেডিং লাইট। সত্যিই, বিশেষ আলোয় পাপাতসানিস এমন একটি জগৎ দেখিয়েছেন, যা সাধারণ চোখে সহজে ধরা পড়ে না।
ক্ষুদ্র জগতের বিস্ময়

আলোকচিত্রী: অ্যালেক্সিস টিঙ্কার-সাভালাস, জার্মানি
স্থান: জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের উত্তর আয়ারল্যান্ড
আমাদের চোখের সামনেই কত প্রাণী ঘুরে বেড়ায়, অথচ তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা জানি না। বিশেষ করে খুব ছোট প্রাণীদের কথা ভাবলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। গাছের গুঁড়ি, পাতার নিচে কিংবা শহরের কোনো ভেজা কোণে এমন অনেক জীব বাস করে, যাদের খালি চোখে ঠিকমতো দেখাও কঠিন।
অ্যালেক্সিস টিঙ্কার-সাভালাস ম্যাক্রো ফটোগ্রাফির সাহায্যে এই ক্ষুদ্র জগতের নানা খুঁটিনাটি তুলে ধরেন। ম্যাক্রো ফটোগ্রাফিতে খুব ছোট কোনো বিষয়কে অনেক বড় করে দেখানো যায়। ফলে প্রাণীর শরীরের সূক্ষ্ম গঠন, অদ্ভুত আকৃতি কিংবা এমন সব বৈশিষ্ট্যও দেখা সম্ভব হয়, যা স্বাভাবিকভাবে চোখে পড়ে না।
তাঁর বিশেষ আগ্রহের বিষয় স্লাইম মোল্ডসহ নানা ক্ষুদ্র জীব। স্লাইম মোল্ড এমন একধরনের জীব, যাদের অনেকেই খুব ছোট। করোনাভাইরাস মহামারির সময় লকডাউনে বার্লিনের বাড়ির আশপাশের পরিবেশেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়েছিল টিঙ্কার-সাভালাসকে। সেই সময়ই ম্যাক্রো ফটোগ্রাফির প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও বাড়ে। দূরে যেতে না পারলেও কাছের পরিবেশে যে কত কিছু আবিষ্কার করা যায়, তা তিনি বুঝতে পারেন। এই ছবিগুলোর বিশেষত্ব এখানেই। বড় জগৎকে বুঝতে হলে মাঝেমধ্যে খুব ছোট জগতের দিকে তাকাতে হয়।
উড়ে যাওয়ার শিল্প

আলোকচিত্রী: মিখাল মিখালস্কি, পোল্যান্ড
স্থান: গ্রিসের পিয়েরিয়ার লিতোখোরো
ছবিতে কী দেখতে পাচ্ছেন? বাশগাছের সারি? না। এই গাছগুলোতে কোনো পাতা নেই। এগুলো বার্চগাছ। গাছের সামনে দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একঝাঁক পাখি। ছবিটি দেখে মনে হতে পারে, কেউ যেন প্রকৃতির ক্যানভাসে তুলি দিয়ে পাখির দল এঁকে দিয়েছে।
মিখাল মিখালস্কি ছবিটি তুলেছেন স্লো শাটার স্পিড ব্যবহার করে। ক্যামেরার শাটার বেশি সময় খোলা রাখলে চলন্ত বস্তুর নড়াচড়া ছবিতে একধরনের গতির ছাপ তৈরি করতে পারে। পাখিদের উড়ে যাওয়ার মুহূর্তে এই কৌশল ব্যবহার করায় ছবিটি পেয়েছে আলাদা এক শৈল্পিক রূপ।
ঘটনার পেছনেও রয়েছে ছোট্ট একটি গল্প। মাঠে সূর্যমুখী চাষ করা হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো তোলা হয়নি। সেই সূর্যমুখীর বীজ খেতে সেখানে জড়ো হয়েছিল নানা প্রজাতির পাখি। তাদের মধ্যে ছিল গোল্ডফিঞ্চ ও ব্র্যাম্বলিং। হঠাৎ একটি বাজ পাখির উপস্থিতিতে ঝাঁকটি ভয় পেয়ে উড়ে যায়।
পাখিদের কাছে সেটি ছিল বিপদের মুহূর্ত। আর আলোকচিত্রীর কাছে সেই মুহূর্ত হয়ে উঠল শিল্পের মতো সুন্দর এক দৃশ্য। প্রকৃতিতে সৌন্দর্য ও বিপদ কখনো কখনো পাশাপাশি থাকে। পাখিরা প্রাণ বাঁচাতে উড়ছে, কিন্তু ক্যামেরায় সেই উড়ালই হয়ে উঠেছে নান্দনিক এক ছবি।
জলাভূমির বুকে গোলাপি রেখা

আলোকচিত্রী: অ্যালেক্স ভিসবাল, কলম্বিয়া
স্থান: যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যের গ্রেট সল্ট লেকের স্ট্যান্সবেরি উপসাগর
দূর থেকে দেখলে জলাভূমির ওপর গোলাপি রঙের এক অদ্ভুত রেখা চোখে পড়ে। দৃশ্যটি সুন্দর, কিন্তু এর পেছনের গল্পটি পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগের।
অ্যালেক্স ভিসবাল দীর্ঘদিন ধরে জলপথের ওপর শিল্পকারখানা ও মানুষের তৈরি কাঠামোর প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর এই ছবিতে দেখা যায়, মানুষের তৈরি একটি সরল রেখা কীভাবে পুরো জলাভূমির পরিবেশ বদলে দিতে পারে।
গ্রেট সল্ট লেক অত্যন্ত লবণাক্ত একটি হ্রদ। এর একটি অংশ মিঠাপানির প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর সেখানে লবণাক্ত পানিতে টিকে থাকতে পারে এমন অণুজীবের বিস্তার ঘটেছে। সেই অণুজীবের কারণেই পানিতে গোলাপি রং দেখা যায়।
ছবিটির নাম দ্য গ্রেট ডিভাইড। নামটি শুধু ছবিতে দেখা রেখাটির কথা বলে না, প্রকৃতির ওপর মানুষের তৈরি বিভাজনের প্রভাবও মনে করিয়ে দেয়। জলাভূমি মানে শুধু পানি আর কাদা নয়। সেখানে মাছ, পাখি, উদ্ভিদ ও অসংখ্য ক্ষুদ্র জীবের জীবন একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বদলে গেলে সেই সম্পর্কগুলোও বদলে যেতে পারে। কখনো একটি ছোট পরিবর্তনই বিশাল এলাকার পরিবেশে প্রভাব ফেলে।
ভিসবালের ছবিটি তাই একই সঙ্গে সুন্দর ও চিন্তার। প্রকৃতির রং আমাদের মুগ্ধ করে, আবার সেই রঙের পেছনের কারণ আমাদের সতর্কও করে দেয়।
সতর্কবার্তা

আলোকচিত্রী: ফ্রান্সিসকো নেগ্রোনি, চিলি
স্থান: আর্জেন্টিনার সান্তা ক্রুজ প্রদেশের রুট ৪০
পাহাড়, বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর বুনো প্রকৃতির মধ্যে একটি মৃত পুমাকে শিকারের ট্রফি হিসেবে প্রদর্শন করা হচ্ছে। ছবিটি সুন্দর কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখায় না। বরং মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সম্পর্কের এক অস্বস্তিকর দিক সামনে নিয়ে আসে।
চিলির আলোকচিত্রী ফ্রান্সিসকো নেগ্রোনি আর্জেন্টিনার প্যাটাগোনিয়া অঞ্চলের সান্তা ক্রুজ প্রদেশে এই দৃশ্যটি ধারণ করেছেন। সেখানে পুমা শিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল ২০২৫ সালে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও অবৈধভাবে পুমা হত্যা ও নিপীড়ন বন্ধ হয়নি।
পুমা বড় আকারের বন্য বিড়ালজাতীয় প্রাণী। এরা প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু মানুষের সঙ্গে সংঘাত, শিকার কিংবা অন্য নানা কারণে এদের জীবন বিপন্ন হতে পারে।
শিকার করা প্রাণীকে ট্রফি হিসেবে প্রদর্শন করার মধ্যে কিছু মানুষের কাছে গৌরবের বিষয় থাকতে পারে। কিন্তু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের দৃষ্টিতে এমন দৃশ্য অন্য বার্তা দেয়। একটি প্রাণীকে হত্যা করে তার দেহ প্রদর্শন করা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের হাতে প্রকৃতি কত সহজে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ওয়ার্নিং সাইন বা সতর্কবার্তা নামটি তাই যথার্থ। ছবিটি শুধু একটি মৃত পুমার গল্প নয়। এটি আইন থাকা সত্ত্বেও বন্যপ্রাণীর বিরুদ্ধে মানুষের সহিংসতা কীভাবে চলতে পারে, তার দলিলও।
গোপন জগৎ

আলোকচিত্রী: কুতুব উদ্দিন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য
স্থান: যুক্তরাজ্যের ইংল্যান্ডের পশ্চিম সাসেক্স
একটু মনোযোগ দিয়ে মাটির দিকে তাকালে হয়তো এমন কিছু দেখা যাবে, যা আগে কখনো চোখে পড়েনি। পচে যাওয়া কাঠের গায়ে, ভেজা পাতার পাশে কিংবা মাটির কাছাকাছি লুকিয়ে আছে ক্ষুদ্র জীবের এক বিশাল জগৎ। কুতুব উদ্দিনের ছবিগুলো সেই জগৎকেই সামনে নিয়ে আসে।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই আলোকচিত্রীর কাজের বিষয় স্লাইম মোল্ড। এরা এমন একধরনের জীব, যাদের অনেককে খালি চোখে প্রায় দেখাই যায় না। অথচ উপযুক্ত পরিবেশে এদের শরীরে তৈরি হয় নানা রকম গঠন, আকৃতি ও রঙের সমাহার।
স্লাইম মোল্ডের ফলধারী কাঠামো কখনো মাত্র এক থেকে দুই মিলিমিটার উঁচু হয়। এত ছোট কোনো গঠনকে সাধারণ ক্যামেরায় স্পষ্ট করে তোলা কঠিন। তাই এ ধরনের ছবি তুলতে প্রয়োজন বিশেষ আলোকচিত্রের কৌশল, ধৈর্য এবং খুব সূক্ষ্মভাবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা।
কুতুব উদ্দিনের ছবিগুলো ক্ষুদ্র জীবের সেই জটিল গঠনগুলোকে বড় করে আমাদের সামনে তুলে ধরে। তখন বোঝা যায়, প্রকৃতির সৌন্দর্য শুধু পাহাড়, সমুদ্র কিংবা বড় বড় প্রাণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের পায়ের কাছেই লুকিয়ে থাকতে পারে এমন এক জগৎ, যা সম্পর্কে আমরা প্রায় কিছুই জানি না।
সিক্রেট ওয়ার্ল্ডস বা গোপন জগৎ নামটি যেন এই কথাই বলে। প্রকৃতির সব বিস্ময় চোখে পড়ার মতো বড় নয়। কিছু বিস্ময় এত ছোট যে সেগুলো দেখতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলাতে হয়।
ছবির বাইরের গল্প
আমরা প্রতিদিন চারপাশের পৃথিবী দেখি। কিন্তু দেখা আর সত্যিকারের লক্ষ করা এক বিষয় নয়। ভালো আলোকচিত্র আমাদের সেই পার্থক্যটা বুঝতে সাহায্য করে। যে দৃশ্যের পাশ দিয়ে আমরা হয়তো না তাকিয়েই চলে যেতাম, ক্যামেরা সেটিকেই থামিয়ে দেয়। তখন একটি মুহূর্তের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে পুরো একটি গল্প। সেই গল্পগুলোই আমাদের বুঝিয়ে দেয়, পৃথিবীকে জানার এখনও অনেক বাকি!
