কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় যেন অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ আর সরকারি অর্থ আত্মসাতের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এ অনিয়ম ও দুর্নীতি চক্রের মূলে রয়েছেন কার্যালয়ের উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আমির হোসেন সোহাগ। জন্মনিবন্ধন অনুমোদন ও সংশোধন থেকে শুরু করে টিসিবির আবেদন তদন্ত, পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ, সম্পত্তি হস্তান্তর করের অর্থ বণ্টন এবং গ্রাম পুলিশদের প্রশিক্ষণের মতো প্রতিটি ক্ষেত্র থেকেই মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। শুধু দাপ্তরিক দুর্নীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি; সরকারি কর্মঘণ্টা ফাঁকি দিয়ে সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্লাবে জুয়ার আসর পরিচালনা ও নিয়মিত অংশ নেওয়ার অভিযোগও এসেছে তাঁর নামে। তাঁর এসব অপকর্মের সহযোগী হিসেবে উঠে এসেছে মোর্শেদ নামে অপর এক কর্মচারীর নাম।
জন্মনিবন্ধন সেবা ও টিসিবির আবেদনে খোলাখুলি চাঁদাবাজি
উপজেলা কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জন্মনিবন্ধন সংক্রান্ত কাজ। জন্মনিবন্ধন অনুমোদন ও বয়স সংশোধনের ফাইল সই করাতে প্রতিদিন ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার অবৈধ লেনদেন হয় বলে জানা গেছে। ইউনিয়ন পরিষদের সচিব, হিসাব সহকারী ও উদ্যোক্তাদের একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সোহাগ এই অনৈতিক অর্থ আদায় পরিচালনা করেন। অর্থ না দিলে মাসের পর মাস আটকে থাকে সেবা প্রার্থীদের ফাইল।
একইভাবে টিসিবির পণ্যপ্রাপ্তির সুবিধাসংক্রান্ত আবেদন তদন্তের নামেও চলেছে ব্যাপক চাঁদাবাজি। উপজেলায় আসা প্রায় ১৬০টি টিসিবির আবেদন যাচাই ও তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন সোহাগ। অফিসের খরচের বাহানা দিয়ে প্রতিটি আবেদনকারীর কাছ থেকে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। টিসিবির নিম্ন আয়ের কার্ডপ্রার্থীদের কাছ থেকে এভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
গ্রাম পুলিশের প্রশিক্ষণের চার লাখ টাকা আত্মসাৎ
২০২৬ সালের ২৪ ও ২৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত গ্রাম পুলিশদের কর্মদক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক প্রশিক্ষণের অর্থ লেনদেনে উঠে এসেছে সরকারি অর্থ আত্মসাতের ভয়াবহ চিত্র। প্রশিক্ষণের নাম করে ছয়টি ইউনিয়ন থেকে প্রতিটি ইউনিয়নের অনুকূলে ৮০ হাজার টাকা করে মোট ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা সংগ্রহ করেন সোহাগ। কিন্তু বাস্তব চিত্রে দেখা যায় ভিন্ন রূপ।
ছয়টি ইউনিয়নের মোট ৪৩ জন গ্রাম পুলিশকে প্রশিক্ষণ ও যাতায়াত ভাতা বাবদ দেওয়া হয় মাত্র ১ হাজার ৪০০ টাকা করে, যার মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৬০ হাজার ২০০ টাকা। অথচ সংগৃহীত হয়েছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এই দুই হিসাবের ব্যবধান ৪ লাখ ১৯ হাজার ৮০০ টাকা। বিশাল অঙ্কের এই অর্থ কোনো প্রকার স্বচ্ছ হিসাব ছাড়াই সরাসরি আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
সম্পত্তি হস্তান্তর করে চার শতাংশ কমিশন দাবি
সম্পত্তি হস্তান্তর করের এক শতাংশ খাত থেকে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে প্রায় ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের একটি সরকারি প্রক্রিয়া চলছিল। কিন্তু উন্নয়নমূলক এই সরকারি অর্থ বণ্টনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা সোহাগের চার শতাংশ কমিশনের দাবি। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রতিনিধিদের কাছে সরাসরি এই ঘুষ দাবি করা হয়।
কমিশনের বিশাল এই অংকের টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় এবং এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হওয়ায় অর্থ ছাড়ের ফাইলটি বর্তমানে পুরোপুরি আটকে রয়েছে। এর ফলে ইউনিয়নগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন থমকে গেছে।
নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ
২০২৬ সালের আগস্ট মাসে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা পরিষদে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগে চরম অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়। কার্যালয়ে পূর্বে থেকেই দুজন অফিস সহায়ক, একজন মালি ও একজন আনসার সদস্য কর্মরত থাকা সত্ত্বেও সোহাগের ব্যক্তিগত তদবিরে সম্পূর্ণ গোপনে নতুন নিয়োগ সম্পন্ন হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে কর্মরত পরিচ্ছন্নতাকর্মী রানী হরিজনের মেয়ে রাশিকে কোনো প্রকার প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষা বা উন্মুক্ত আবেদন ছাড়াই ১৪ হাজার টাকা মাসিক বেতনে নিয়োগ দেওয়া হয়। উপজেলা পরিষদের সংশ্লিষ্ট সদস্য ও অধিকাংশ কর্মকর্তা এ নিয়োগের বিষয়ে কিছুই জানতেন না। অনুমোদিত জনবল কাঠামোর বাইরে গিয়ে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে এই নিয়োগ কার্যকর করা হয়েছে।
ভুয়া ঠিকানায় বদলি ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা
মো. আমির হোসেন সোহাগ ২০১২ সালে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনে চাকরি জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে কুমিল্লার একটি ঠিকানা ব্যবহার করে কুমিল্লা জেলা প্রশাসনে বদলি হয়ে আসেন। তবে অনুসন্ধানে তাঁর ব্যবহৃত ঠিকানার সত্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি নথিতে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে তাঁর প্রকৃত তথ্যের কোনো মিল ছিল না বলে জানা গেছে।
দাপ্তরিক ক্ষেত্রেও তাঁর আচরণ চরম প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে। অফিসের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়মিত দুর্ব্যবহার ও অশোভন আচরণ করেন তিনি, যার ফলে অধস্তন কর্মচারীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ ছাড়া নিয়মিত অফিসে উপস্থিত না থাকার ভুরি ভুরি অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
কুমিল্লা টাউন হলে জুয়ার আসর ও ভিআইপি কক্ষ
সোহাগের রাতে আড্ডার প্রধান কেন্দ্র কুমিল্লা টাউন হল এলাকায় অবস্থিত কুমিল্লা মিনিস্টেরিয়াল অফিসার্স ক্লাব। অভিযোগ অনুযায়ী, ক্লাবে মাহবুব নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে অনিয়মিত জুয়ার আসর পরিচালনা করেন সোহাগ। সেখান থেকে প্রতিদিন তিনি নির্দিষ্ট পাঁচ হাজার টাকা করে পান।
শুধু আসর পরিচালনাই নয়, প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সোহাগ নিজে সেখানে জুয়া খেলায় মত্ত থাকেন। ক্লাবের ভেতরে তাঁর ব্যবহারের জন্য একটি বিশেষ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) কক্ষ পর্যন্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গভীর রাত পর্যন্ত জুয়া খেলার কারণে পরদিন দুপুরের আগে তিনি অফিসে উপস্থিত হতে পারেন না, যা তাঁর প্রশাসনিক দায়িত্বকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে তুলেছে।
তদন্ত ও প্রশাসনের বক্তব্য
এ সব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে কুমিল্লা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সজীব তালুকদার জানান, উপস্থাপিত অভিযোগগুলো তিনি এই অফিসে যোগদান করার পূর্বের ঘটনা। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগের ঘটনা সম্পর্কে অবগত নন দাবি করে বলেন, তিনি যোগদানের পর থেকে স্বচ্ছতার সাথে সকল দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছেন।
অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আমির হোসেন সোহাগের হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
