গুরুদক্ষিণা নয়। বরং গুরুর কাছেই প্রাপ্তি। যেন গুরুপ্রসাদ! কলেজ জীবন থেকেই মননে গেঁথে যাওয়া তাঁর শিল্পকর্ম। আর সেই শিল্পকর্ম যে ঘরে তিনি ফুটিয়ে তোলেন তা ঠিক কেমন? তা চোখে দেখে ক্যামেরা বন্দি করতেই ছবি তুলতে যেতেন তিনি। আর সেই ছবি তোলার সময়ে গুরু-ই ওই ভক্তের ছবি এঁকে তাঁকে উপহার হিসেবে হাতে তুলে দেন। গুরুর কাছে এ তো আর কম প্রাপ্তি নয়! চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরির তুলির টান থেমে যেতেই প্রান্তিক পুরুলিয়ার স্টুডিওতে বসে তাঁকে কাছ থেকে দেখার স্মৃতি আওড়াচ্ছেন জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত আলোকচিত্রী স্বরূপ দত্ত।
গুরু চিত্রকর। আর ভক্ত চিত্রগ্রাহক। যেন আত্মিক সম্পর্ক। শহর পুরুলিয়ার ডাক্তারডাঙার বাড়ির স্টুডিওতে বসে স্বরূপ দত্ত বলছিলেন, “একটি সাহিত্য পত্রিকায় বিকাশ ভট্টাচার্য, যোগেন চৌধুরী, সোমনাথ হোড়, গণেশ পাইনের প্রচ্ছদে একটি সংখ্যা বার হয়। সেটাই বোধহয় শিল্পীর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ।” এরপর কখন যে কলেজে পড়া ওই তরুণের গুরু হয়ে গিয়েছেন কিংবদন্তি শিল্পী, তা বোধহয় তিনি নিজেও জানেন না। ২০১৪ সালে বিড়লা একাডেমিতে শিল্পীর একক চিত্র প্রদর্শনীতে সাক্ষাৎ হয়েছিল। তারপরই ভাব জমে যায়। ক্যামেরা বার করে একের পর এক ক্লিকে ছবি তুলে যেতেন তিনি। স্বরূপের কথায়, “পেশাগত কারণে তখন আমি যাদবপুরে থাকি। ফলে কলকাতায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে দেখা হত। তাঁর চারুবাসনা আর্ট গ্যালারিতে যেতাম প্রায় নিয়মিত। ফলে তাঁর সান্নিধ্য পাওয়া আমার কাছে সহজ হয়ে উঠেছিল।”
এভাবেই স্বরূপের মনে প্রশ্ন জাগে প্রখ্যাত শিল্পীর আঁকার ঘর কেমন? তা তিনি ক্যামেরাবন্দি করতে চান। বহুদিন ধরে এই প্রস্তাবটা শিল্পীকে দেবেন বলে ভেবে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সাহস হচ্ছিল না। ওই জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত চিত্রগ্রাহকের কথায়, “উনি মাটির মানুষ ছিলেন। ওঁনার সঙ্গে দেখা করার ক্ষেত্রে কোথাও কোনও বাধা ছিল না। আমি ২০২৪ সালের ২১ এপ্রিল তাঁর আঁকার ঘরে যাওয়ার প্রথম সুযোগ পাই। মনে আছে একসঙ্গে ৩০ টি ছবি তুলে নিয়েছিলাম।” এরপর ওই বছরের ২১ জুলাই আবার তাঁর আঁকার ঘরে অনুমতিক্রমে স্বরূপ ছবি তুলতে যান। সেই সময়ই ওই চিত্রগ্রাহকেরই ছবি আঁকেন প্রখ্যাত শিল্পী যোগেন। সেই ছবি শিষ্যকে উপহারও দেন।
স্বরূপ বলেন, “সেদিন আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এ যে আমার কাছে কত বড় প্রাপ্তি তা বলে বোঝাতে পারব না। ওই ছবি নিয়ে আমি তাঁর সঙ্গে ফটো তুলে রেখে দিয়েছি। আজ চোখের সামনে ভাসছে সে সব কথা।” ওই চিত্রগ্রাহকও শিল্পীর বিভিন্ন বয়সের ছবি স্কেচ করে তাঁর হাতে তুলে দিয়েছেন। সেইসব ছবির পাশে শিল্পী লিখে দিয়েছেন ‘খুব সুন্দর হয়েছে’। কেমন ছিল শিল্পীর সেই আঁকার ঘর? চিত্রগ্রাহকের কথায়, “পরে কোনও এক ফটো অ্যালবামে তা সামনে আসবে। তবে বয়স হওয়ার পর তিনি সোফায় বসেই ছবি আঁকতেন।”
