Published on
:
3 min read
শান্তিপুরের অলিগলিতে ঢুকলেই কানে আসে তাঁতের খটখট শব্দ। ঘরের এক কোণে বসে দক্ষ হাতে সুতোয় সুতোয় নকশা ফুটিয়ে তুলছেন শিল্পী। কোথাও তৈরি হচ্ছে হালকা, মিহি সুতির শাড়ি, কোথাও জামদানির সূক্ষ্ম বুননে ফুটে উঠছে ঐতিহ্যের ছাপ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ ভাবেই বাংলার তাঁতশিল্পের গৌরব বয়ে নিয়ে চলেছেন নদিয়ার শান্তিপুরের তাঁতিরা। একসময় তাঁদের তৈরি শাড়ির ক্রেতা মূলত নির্ভর করতেন স্থানীয় হাট, পরিচিত ব্যবসায়ী, পাইকারি বাজার কিংবা দোকানের উপরে। ভালো শাড়ি বুনতে পারলেও দেশের দূরদূরান্তের ক্রেতার কাছে পৌঁছনোর সুযোগ ছিল সীমিত। এখন সেই ছবিটাই ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। তাঁতের ঘর থেকে তৈরি শাড়ি সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে বেঙ্গালুরু, দিল্লি-সহ দেশের নানা প্রান্তের ক্রেতার কাছে। এমনকী অনলাইন বিপণনের হাত ধরে শান্তিপুরের ঐতিহ্যবাহী তাঁত ও জামদানি শাড়ির সামনে খুলে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারের সম্ভাবনাও। ফ্লিপকার্ট ও অ্যামাজ়নের মতো ই-কমার্স সংস্থার উদ্যোগে স্থানীয় শিল্পীরা এখন আর শুধু শাড়ি বুনেই দায়িত্ব শেষ করছেন না, ডিজিটাল বিপণনের মাধ্যমে নিজেদের পণ্যকে বৃহত্তর বাজারে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগও পাচ্ছেন। ফলে শান্তিপুরের তাঁতশিল্পে ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রযুক্তি, আর স্থানীয় শিল্পের অর্থনীতিতে তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা।
অনলাইনে বাড়ছে বিক্রি:
এই পরিবর্তনের ছবিটা স্পষ্ট হচ্ছে অনলাইন বাজারে তাঁত ও জামদানি শাড়ির বিক্রেতা এবং তাঁতিদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এই বিভাগে ফ্লিপকার্টের সঙ্গে যুক্ত বিক্রেতা ও তাঁতিদের সংখ্যা ছিল ২৫০-র কিছু বেশি। সেই সংখ্যা বেড়ে ২০২৬ সালে ৭৭৭-এ পৌঁছেছে। অর্থাৎ কয়েক মাসের মধ্যেই প্রায় তিন গুণ হয়েছে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অনলাইন বিক্রেতাদের সংখ্যা। সংস্থার লক্ষ্য, ২০২৭ সালের মধ্যে শান্তিপুরের এই ক্লাস্টার থেকে প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় তাঁতি ও বিক্রেতার সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যাক। পাশাপাশি, অনলাইন বিপণনের মাধ্যমে তাঁদের সম্মিলিত বিক্রিও আগামী দিনে দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই পরিসংখ্যান শুধু ই-কমার্স ব্যবসার বিস্তারের ছবি নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাজারের উপর নির্ভরশীল একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পের ক্রমশ ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বিক্রির অঙ্কে গতি:
বিক্রির অঙ্কও সেই সম্ভাবনাকে জোরালো করছে। ২০২৫ সালে ই-কমার্স সংস্থাগুলির, বিশেষ করে ফ্লিপকার্টের মাধ্যমে শান্তিপুরের তাঁত, হ্যান্ডলুম ও জামদানি শাড়ির সঙ্গে যুক্ত তাঁতি এবং বিক্রেতাদের মোট বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০ কোটি টাকা। ২০২৬ সালে তা ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছে সংস্থা। অর্থাৎ এক বছরের মধ্যে বিক্রি উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি তাঁতিদের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শান্তিপুরের এই ক্লাস্টারের সরাসরি তাঁতিদের বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। বর্তমানে প্ল্যাটফর্মে শান্তিপুরের শাড়ি বিক্রির সঙ্গে সক্রিয় ভাবে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৩০ শতাংশই সরাসরি তাঁতি। অর্থাৎ শুধু ব্যবসায়ী বা মধ্যস্থতাকারী নন, যাঁদের হাতে শাড়ির জন্ম, তাঁরাও ক্রমশ অনলাইন বাজারে নিজেদের জায়গা তৈরি করছেন। শুধু তাঁতি-ই নয়, তাঁত শিল্পের সঙ্গে একটি গ্রাম, একটি এলাকার বহু মানুষ জড়িয়ে পড়েছেন। অর্ডার বাড়ার ফলে কাজ বাড়ছে, সময়ে তা ডেলিভারি দিতে এলাকার ঘরে ঘরে শাড়ি তৈরি, নকশা বোনা, সুতো তৈরি এমনকী শাড়িতে মাড় দেওয়ার কাজ করছেন বহু মানুষ। যা একটা গোটা অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
শান্তিপুরের তাঁত-সহ দেশের হ্যান্ডলুম শিল্পকে নতুন বাজার দিতে তাদের প্ল্যাটফর্মে ‘উইভসমার্ট’ বলে একটি আলাদা বিভাগ খুলেছে অ্যামাজ়ন। এর মধ্যেই ওই বিভাগে সারা দেশের ৩ হাজারেরও বেশি তাঁতি এবং তাঁদের তৈরি ২০ হাজারের বেশি পণ্য যুক্ত হয়েছে।
অনলাইনে পণ্য বিক্রির জন্য ছবি তোলা, পণ্যের বিবরণ তৈরি, ক্যাটালগ সাজানো, অর্ডার সামলানো এবং সরবরাহের ব্যবস্থা করার মতো কাজ করে দিচ্ছে ই-কমার্স সংস্থাগুলি। এমনকী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর ক্যাটালগ তৈরির ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে, যাতে প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞ শিল্পীদের পক্ষে পণ্য অনলাইনে তোলা সহজ হয়। পাশাপাশি, সরবরাহ ব্যবস্থা ও লজিস্টিক্স-এর সহায়তা থাকায় শান্তিপুরের কোনও তাঁতির পক্ষে কলকাতার বাইরে থাকা ক্রেতার কাছে শাড়ি পাঠানোও আগের তুলনায় অনেক সহজ হচ্ছে।
ফ্লিপকার্টের মার্কেটপ্লেস ও ফ্যাশন বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট কপিল থিরানির বক্তব্য, শান্তিপুরে সরেজমিনে তাঁতঘর ও উৎপাদনকেন্দ্র ঘুরে দেখার পরেই এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত দক্ষ তাঁতি ও বিক্রেতাদের চিহ্নিত করে তাঁদের অনলাইন বাজারে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কারণ, শান্তিপুরের শাড়ির দাম এবং নকশার বৈচিত্র ই-কমার্সের ক্রেতাদের চাহিদার সঙ্গে মানানসই।
শুধু শান্তিপুরের তাঁত-ই নয়, আগামী দিনে ধনেখালির তাঁত, মুর্শিদাবাদের সিল্কের শাড়িও তাদের প্ল্যাটফর্মে আনতে আগ্রহী ই-কমার্স সংস্থাগুলি। ইতিমধ্যেই সেই প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে বলে তাদের দাবি।