কালবেলা · আন্তর্জাতিক
পাকিস্তানের চার প্রদেশকে আরও ভাঙতে চান আসিম মুনির!
১২/১০/২০২৬

ইতিহাস বলে, একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে যুগের পর যুগ ধরে এক প্রাচীন মন্ত্র জপে আসছেন ক্ষমতাধর শাসকরা; ‘ভাগ করো আর শাসন করো’ (ডিভাইড অ্যান্ড রুল)। এবার সেই একই পুরোনো ও পরীক্ষিত পথে হাঁটছেন পাকিস্তানের আসল ক্ষমতার চাবিকাঠি হাতে থাকা সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।
কাগজে-কলমে দেশে একজন প্রেসিডেন্ট আছেন, আছেন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীও। তবে সবাই জানেন, আসল হুকুম আসে এক সেনা সদর দপ্তর থেকেই। আন্তর্জাতিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতাকে পুরোপুরি নিজের মুঠোয় নিতে এবার পাকিস্তানের দীর্ঘ ৭৭ বছরের পুরোনো রাজনৈতিক মানচিত্রটাই বদলে দিতে চান জেনারেল মুনির। দেশের মূল চারটি প্রদেশ ভেঙে এক ডজন বা তারও বেশি টুকরো করার এক সুদূরপ্রসারী ছক কষেছেন তিনি।
১৯৪৭ সালে জন্ম নেওয়ার পর থেকে পাকিস্তানের প্রশাসনিক মানচিত্র মূলত চার স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে- পাঞ্জাব, সিন্ধু, খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তান। তবে এদের মধ্যকার জনসংখ্যার বৈষম্য আকাশছোঁয়া। ১২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ নিয়ে পাঞ্জাব একাই পুরো পাকিস্তানের অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে, আয়তনে বিশাল হলেও বেলুচিস্তানের জনসংখ্যা মাত্র দেড় কোটির কাছাকাছি। জাতীয় জনসংখ্যার যা মোটে ৬ শতাংশ।
বাইরে থেকে আসিম মুনির যুক্তি দিচ্ছেন, প্রশাসনিক সুবিধার্থেই এ পুনর্বিন্যাস। এত বড় বড় প্রদেশ সামলানো নাকি অসম্ভব, আর সে কারণেই নাকি পাকিস্তানের এমন বেহাল দশা! তিনি এ চার প্রদেশকে ভেঙে ১২, ১৫ বা ১৬টি ছোট ছোট ‘মিনি-প্রদেশে’ রূপ দিতে চান।
কিন্তু সমালোচকদের মতে, এ যুক্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর চাল। ছোট ছোট এ প্রদেশে কোনো স্বাধীন ক্ষমতা থাকবে না। সেখানে শাসন চালাবেন সেনা মনোনীত প্রতিনিধি কিংবা দুর্বল সব স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যাদের কলকাঠি থাকবে সরাসরি ফিল্ড মার্সালের হাতেই।
বর্তমানে পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘর ছাড়িয়েছে, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রতিবেশী ভারতের অর্ধেকেরও নিচে। দেশ যখন দেউলিয়া হওয়ার মুখে, তখন সেনাপ্রধান মুনির আঙুল তুলছেন প্রশাসনিক জটিলতার দিকে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এ ধ্বংসাতঙ্কের আসল রূপকার অন্য কেউ নন, খোদ দেশটির সেনাবাহিনী নিজেই!
দি ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক নগ্ন সত্য, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী মূলত করদাতাদের বিপুল অর্থ গিলে খায়। দেশের সবচেয়ে দামি জমির মালিক তারা, আর তাদের অধীন বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যগুলো দেশের সাধারণ ব্যবসায়ীদের তোয়াক্কাই করে না। ১৯৪৭ থেকে এখন পর্যন্ত অর্ধেকেরও বেশি সময় দেশ চলেছে সরাসরি সামরিক বুটের নিচে। আর বাকিটা সময় শাহবাজ শরিফদের মতো বেসামরিক সরকারগুলো বন্দুকের নলের ভয়ে তটস্থ থেকে শুধু তাদের আজ্ঞা পালন করে গেছে।
এমনকি ভারতের সঙ্গে শত্রুতার কৃত্রিম আগুন জিইয়ে রাখাও তাদের এক চিরচেনা কৌশল। প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরিতা দেশের প্রবৃদ্ধিকে ধূলিসাৎ করলেও সেনা বাজেট ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলার জন্য তা মোক্ষম এক হাতিয়ার। বিখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক ফ্রয়েডের ভাষায় বলতে গেলে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিজেই সেই সমস্যা, যার সমাধান করার ‘রক্ষক’ সেজে তারা ঘুরে বেড়ায়!
জেনারেল আসিম মুনিরের এই পরিকল্পনা নিয়ে মূলত দুটি বড় আশঙ্কার কথা জানিয়েছে দি ইকোনমিস্ট। প্রথমত, পাকিস্তানের এ বড় বড় প্রদেশ এতদিন সরকারের একচ্ছত্র ক্ষমতার বিরুদ্ধে একটা বাধা হিসেবে কাজ করত। যেমন পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশ যথাক্রমে পিএমএল-এন এবং পিপিপি দলের শক্ত ঘাঁটি। অতীতে সামরিক শাসকরা ক্ষমতা দখল করলেও এ দলগুলো সেখানে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে পেরেছিল। আসিম মুনির মূলত এ বিকল্প শক্তির কেন্দ্রগুলোকেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে চান, যাতে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো আর কেউ না থাকে।
দ্বিতীয়ত, আসিম মুনির কতটা কঠোর হাতে দেশ চালাতে পারেন, তা গত কয়েক বছরে পরিষ্কার হয়ে গেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টকে তিনি নিজের হাতের পুতুল বানিয়ে রেখেছেন। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা ও সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানকে তিনি জেলে ভরেছেন। এমনকি টিভিতে ইমরানের নাম নেওয়াও নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং তার সমর্থকদের ওপর চলছে নির্মম দমনপীড়ন।
পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন বা শাসনব্যবস্থা সহজ করা আসিম মুনিরের মূল লক্ষ্য নয়। চার প্রদেশকে টুকরো টুকরো করে রাজনৈতিক দলগুলোকে মেরুদণ্ডহীন করাই এ নীলনকশার মূল উদ্দেশ্য, যাতে পুরো পাকিস্তানের শাসক হিসেবে আসিম মুনিরের একচ্ছত্র সাম্রাজ্যে টুঁ শব্দ করার মতো কেউ না থাকে।
সূত্র : দি ইকোনমিস্ট
মূল প্রতিবেদনে যান ↗