সরকার ঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মাদারীপুরের শিবচরে পদ্মা নদীতে চলছে ইলিশ শিকার। নদীঘেঁষা দুর্গম চরাঞ্চল ও বিভিন্ন ঘাটে বসছে ইলিশের অস্থায়ী হাট। এসব হাটে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে সদ্য ধরা ইলিশ, যার মধ্যে রয়েছে ডিমওয়ালা মা ইলিশও।
নিষিদ্ধ সময়ে নদীতে মাছ ধরা, পরিবহন ও বেচাকেনা বন্ধ রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার কথা বলা হলেও বাস্তবে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি ইলিশ শিকার ও বিক্রির কার্যক্রম। বরং পদ্মার তাজা ইলিশ কেনার আশায় প্রতিদিন এসব অস্থায়ী হাটে ভিড় করছেন নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সী ক্রেতা।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ইলিশের চাহিদা, বাজারে ভালো দাম এবং অধিক লাভের আশায় একশ্রেণির জেলে, মৌসুমি মাছ শিকারি ও ব্যবসায়ীরা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও সক্রিয় রয়েছেন। নদী থেকে ট্রলারে করে মাছ এনে কোথাও সরাসরি বিক্রি করা হচ্ছে, আবার কোথাও জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে খুচরা বাজার বসাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এসব হাটকে কেন্দ্র করে নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী দোকানপাট। মাছ কেনাবেচার পাশাপাশি জমে উঠেছে খাবারের দোকানসহ স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্যও।
শিবচর উপজেলার মাদবরেরচর, চরজানাজাত, বন্দরখোলা ও কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের পদ্মাতীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, কাজিরসূরা, হীরাখাঁর বাজার ও বাংলাবাজারসহ পাঁচ থেকে সাতটি স্থানে প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত চলে মাছ কেনাবেচা। দুর্গম চরাঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান, পর্যাপ্ত জনবলের অভাব এবং অভিযানের খবর আগেভাগে ছড়িয়ে পড়ার কারণে এসব কার্যক্রম বন্ধ করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বন্দরখোলা ইউনিয়নের কাজিরসূরা এলাকায় পদ্মার পাড়ে একটি অস্থায়ী ইলিশের হাট ঘুরে দেখা যায়, বিকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক মাছ ধরার ট্রলার ঘাটে এসে ভিড় করছে। জেলেরা ঝুড়ি ও ডালিভর্তি মাছ নিয়ে নদীর পাড়ে নামছেন। কেউ কেউ ঘাটে পৌঁছানোর আগেই ট্রলারে থাকা অবস্থায় পাইকারি বিক্রেতাদের কাছে মাছ বিক্রি করে দিচ্ছেন। পরে সেই মাছ নিয়ে নদীর পাড়ে বসছেন খুচরা বিক্রেতারা। ক্রেতারা দরদাম করে পছন্দের ইলিশ কিনে নিচ্ছেন।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাজারে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। শিবচরের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশপাশ থেকে মানুষ আসছেন মাছ কিনতে। পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে আসছেন। কেউ কিনছেন একাধিক ব্যাগভর্তি মাছ। ইলিশের হাট ঘিরে নদীর পাড়ে বসেছে মুখরোচক খাবারের দোকানও। মাছ কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে অস্থায়ী বাজারের আশপাশে ছোটখাটো ব্যবসা জমে উঠেছে। ফলে একদিকে যেমন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকার ও বিক্রির অভিযোগ সামনে আসছে, অন্যদিকে এসব হাটকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে সাময়িক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে।
ক্রেতাদের কাছে পদ্মার তাজা ইলিশের আকর্ষণ অনেক বেশি। এর সঙ্গে বাজারদরের তুলনায় কম দামে মাছ পাওয়ার প্রত্যাশাও তাদের এসব হাটে টানছে। তবে নিষেধাজ্ঞার সময় মা ইলিশ কেনাবেচায় অংশ নেওয়ার কারণে সংরক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবার-পরিজন নিয়ে মাছ কিনতে আসা মো. আকাশ মিয়া বললেন, ‘এ সময় মাছের দাম কমে পাওয়া যায়। তাছাড়া পদ্মা থেকে ধরা একদম তাজা মাছ সবার কাছেই লোভনীয়। আসলে আমি না কিনলেও কেউ না কেউ তো কিনবেই।’ তার এ বক্তব্যে নিষিদ্ধ সময়ে মাছ কেনার পেছনে ক্রেতাদের একাংশের মনোভাব ফুটে উঠেছে। কম দামে তাজা ইলিশ পাওয়ার আকর্ষণ তাদের কাছে প্রাধান্য পেলেও মা ইলিশ সংরক্ষণে ক্রেতাদের দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ। কাঁঠালবাড়ির পুরনো ফেরিঘাট এলাকায় গিয়েও দেখা যায়, নদী পার হয়ে ট্রলারে করে চরাঞ্চলের হীরাখাঁর চরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন নারী-পুরুষ। তাদের অনেকেই মাছ কেনার উদ্দেশে সেখানে জড়ো হয়েছেন।
হাফিজা আক্তার নামে এক নারী বলেছেন, ‘এত কষ্ট করে মাছ কিনতে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, এ সময়ে তাজা মাছ পাওয়া যায়। আবার এ মাছগুলো পদ্মা নদীর। বছরের বেশিরভাগ সময় তো আমরাও পদ্মা নদীর তাজা ইলিশ পাই না। তবে প্রশাসন মাঝেমধ্যে খুব বিরক্ত করে।’ স্থানীয়রা জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ শিকারে যুক্ত ব্যক্তিদের সবাই পেশাদার জেলে নন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মৌসুমি জেলে ও ব্যবসায়ীও। বছরের অন্য সময়ে নিয়মিত ইলিশ শিকার না করলেও নিষেধাজ্ঞার সময় মাছের প্রাপ্যতা ও বিক্রির সুযোগ কাজে লাগাতে কেউ কেউ নৌকা, ট্রলার ও জাল সংগ্রহ করে নদীতে নামছেন।
মৌসুমি জেলে ইলিয়াস মিয়া জানিয়েছেন, সারা বছর পদ্মা নদীতে তেমন ইলিশ মাছ পাওয়া যায় না। এ সময়ে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়, তবে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। মৌসুমি ব্যবসায়ী জালাল মিয়া বললেন, ‘আমরা সুযোগ পেলে জেলেদের কাছ থেকে এ ২২ দিন মাছ কিনে বিক্রি করি। অন্য সময়ের চেয়ে এ সময় প্রচুর মাছ পাওয়া যায়, আবার বিক্রিও বেশি হয়।
উপজেলা মৎস্য অফিস সংশ্লিষ্টরা জানান, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে পদ্মা নদীর শিবচর অংশের বিভিন্ন স্থানে মৎস্য বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও নৌপুলিশের একাধিক দল নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নদী থেকে ১০ জেলেকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর আগেও আটক ব্যক্তিদের জরিমানা করা হয়েছে। অভিযানে জব্দ করা বিপুল পরিমাণ অবৈধ জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
শিবচর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার বলেছেন, সরকার ঘোষিত ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে উপজেলা মৎস্য বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও নৌপুলিশের সমন্বয়ে পদ্মা নদীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ যাতে ইলিশ শিকার, পরিবহন, মজুদ ও বিক্রি করতে না পারে, সে বিষয়ে আমরা সতর্ক রয়েছি। তবে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু অসাধু জেলে নদীতে জাল ফেলছে এবং বিভিন্ন স্থানে মাছ বিক্রি করছে। এসব অনিয়ম বন্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
