হুথিরা হলো মূলত ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন, যারা বর্তমানে লোহিত সাগরের কার্গো জাহাজ ও ট্যাংকারগুলোতে হামলার মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে ইয়েমেনের সুদূর উত্তরে ইসলাম ধর্মের শিয়া মতাবলম্বীদের জাইদি ধারার পুনরুজ্জীবন আন্দোলন হিসেবে এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। একসময় পুরো ইয়েমেন শাসন করলেও জাইদি সম্প্রদায়ের এই উত্তর প্রান্তের অঞ্চলটি পরবর্তীতে চরম অবহেলিত ও প্রান্তিক হয়ে পড়েছিল। এরপর তারা ইয়েমেনের জাতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কিছু গেরিলা যুদ্ধ এবং সুন্নিপ্রধান সৌদি আরবের সঙ্গে একটি সংক্ষিপ্ত সীমান্ত সংঘাতে লিপ্ত হয়।
২০১১ সালের আরব বসন্ত বা গণঅভ্যুত্থানের সময় ইয়েমেনের দীর্ঘকালীন প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতাচ্যুত হলে, গোষ্ঠীটি উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যস্থতায় হওয়া রাজনৈতিক রূপান্তর প্রত্যাখ্যান করে উত্তর ইয়েমেনে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও সংহত করে। ইরানের সহায়তায় গোষ্ঠীটির গোপন নেতা আব্দুল মালিক আল-হুথি পাহাড়ের এই গেরিলা যোদ্ধাদের নিয়ে হাজার হাজার সদস্যের একটি শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তোলেন।
২০১৪ সালে তারা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয়, যার ফলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর এডেনের দিকে সরে যেতে বাধ্য হয়।
হুথি আন্দোলনটি নিজেদের আনসারুল্লাহ (আল্লাহর সাহায্যকারী বা ডিফেন্ডার্স অব গড) বলে পরিচয় দেয়। তবে এর প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত হুসেইন বদরুদ্দিন হুথির নামানুসারে এটি বিশ্বজুড়ে হুথি আন্দোলন নামে পরিচিত।
সৌদি আরবের সঙ্গে হুথিদের সংঘাতের নেপথ্য কারণ
ইয়েমেনে ক্রমবর্ধমান ইরানি প্রভাব এবং নিজের সীমান্তে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়ানোর আশঙ্কায় ২০১৫ সালের শুরুর দিকে হুথিদের দমনে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে সৌদি আরব। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে হটিয়ে ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহাল করা এবং রাষ্ট্রীয় রূপান্তর পরিকল্পনা পুনরুজ্জীবিত করা।
এই গৃহযুদ্ধের ফলে বিশ্বে অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয় এবং সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্বাধীন জোটের তীব্র বিমান হামলায় দেশটিতে বছরের পর বছর ধরে ধ্বংসযজ্ঞ চলে। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দুই পক্ষের কেউই বড় ধরনের ভূখণ্ডগত সুবিধা অর্জন করতে পারেনি। ইয়েমেনের জনবহুল উত্তর-পশ্চিম অংশ হুথিদের দখলেই থেকে যায়। এই সময়ে তারা সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের শক্তিশালী সক্ষমতা প্রদর্শন করে।
বহু বছর ধরে চলা যুদ্ধের পর ২০২২ সালে জাতিসংঘ উভয় পক্ষের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে, যার মাধ্যমে চলতি বছর পর্যন্ত শান্তি বজায় ছিল।
গত বছরের অক্টোবরে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুরুর পর ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে ২০২৩ সালের নভেম্বরে লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজে হামলা এবং ইসরাইলে ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ শুরু করে হুথিরা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ট মিত্র ইরানের সংঘাতের জেরে এই বছর লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে এবং সৌদি আরবে হামলা পুনরায় শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর তেহরান হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে তেল চলাচল ব্যাহত করে। এর ফলে সৌদি আরবকে লোহিত সাগরের বন্দর এবং বাব আল-মানদেবের মাধ্যমে তাদের তেল রপ্তানি বাড়াতে বাধ্য হতে হয়।
এই পরিস্থিতি সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো এবং সামুদ্রিক পথগুলোকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। তেল পরিবহনের এই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিতে গত সেপ্টেম্বর মাসে লোহিত সাগরের মুখে অবস্থিত কৌশলগত পেরিম দ্বীপ এবং মোখা বন্দর নিজেদের দখলে নেয় হুথিরা। উল্লেখ্য, বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশই এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
লোহিত সাগরে হুথিদের এই অবরোধ বৈশ্বিক বাণিজ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চলাচলকারী কার্গো জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথ বেছে নিতে বাধ্য করায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
চলতি বছরের অক্টোবর মাসে এসে সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করে, যখন সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী হুথিদের কাছ থেকে ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালায় এবং সৌদি আরবও গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করে।
ইয়েমেনের এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে হুথিদের হাতে, যেখানে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ বসবাস করে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ সশস্ত্র যোদ্ধা রয়েছে। তাদের অস্ত্রভাণ্ডারে ট্যাংক, সাঁজোয়া যান, অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড মিসাইল থেকে শুরু করে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পর্যন্ত রয়েছে।
তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইল পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম এবং তাদের নিখুঁত নিশানার কারণে তারা সৌদি বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনার মতো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হানতে পেরেছে।
পাশাপাশি, ইয়েমেন লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযোগকারী বাব আল-মানদেবের কাছে অবস্থিত হওয়ায় সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপরও তাদের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে সংযোগ
লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকি শিয়া মিলিশিয়াদের মতো ইরান হুথিদেরও তাদের আঞ্চলিক প্রতিরোধ অক্ষ-এর অংশ হিসেবে সমর্থন করে। তবে অন্যান্য দলগুলোর তুলনায় ইরানের সঙ্গে হুথিদের সম্পর্ক কিছুটা ভিন্ন। হিজবুল্লাহ বা ইরাকি গোষ্ঠীগুলোর মতো হুথিরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে তাদের চূড়ান্ত ধর্মীয় গুরু হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। তাদের মূল উদ্দেশ্য অভ্যন্তরীণ হলেও আদর্শগতভাবে তারা তেহরানের সাথে সমান্তরাল অবস্থানে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হিজবুল্লাহর সহায়তায় ইরান হুথিদের অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। তবে হুথিরা নিজেদের কোনো প্রক্সি বা অনুচর গোষ্ঠী হিসেবে অস্বীকার করে দাবি করে যে তারা নিজেদের প্রযুক্তিতেই অস্ত্র তৈরি করে।
হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই কেন এত কঠিন
হুথিরা দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল এবং সুবিশাল মরুভূমি এলাকা থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী লাহেজ প্রদেশের শাব আল-জিনসহ বিভিন্ন মরুভূমি ও পাহাড়ি এলাকায় বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেলেও বিমান হামলায় তাদের সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব হয়নি।
বিদ্রোহীদের কাছে থাকা উন্নত অস্ত্রের ভাণ্ডার প্রমাণ করেছে যে তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ইয়েমেন থেকে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূরে ইসরাইল পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম। এছাড়া সৌদি বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলোর মতো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতেও তারা সফলভাবে আঘাত হেনেছে।
বিভিন্ন গতিবেগের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র একসাথে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার কৌশল রপ্ত করেছে হুথিরা। তাদের উন্নত অস্ত্রভাণ্ডারের মধ্যে রয়েছে মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যেমন হাইপারসনিক সক্ষমতাসম্পন্ন দুই ধাপের সলিড ফুয়েল ক্ষেপণাস্ত্র 'ফিলিস্তিন-২' এবং ইরানের 'ঘদর' ক্ষেপণাস্ত্রের আদলে তৈরি 'তুফান'। এছাড়াও তাদের কাছে বুরকান ও বদর সিরিজের বেশ কিছু স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে, যা মূলত ইরানি প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। সূত্র: এনডিটিভি
তামান্না রুপা/
