যুদ্ধের মধ্যে ইন্টারনেটের ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। দেশটির কর্তৃপক্ষের দাবি, ইলন মাস্কের স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক শত্রুপক্ষের সামরিক কার্যক্রম, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এ কারণে সেবাটি বন্ধের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহারে আরও বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টিও বিবেচনা করছে তেহরান।
ইরানে স্টারলিংক ব্যবহার ও এর যন্ত্রাংশ বিতরণ আগে থেকেই নিষিদ্ধ। তবে প্রচলিত ইন্টারনেটের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে যোগাযোগের সুযোগ থাকায় দেশটিতে স্যাটেলাইটভিত্তিক এই সেবার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে ইরান সরকারের উদ্বেগও বাড়ছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সাইবারস্পেস কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ আমিন আগামিরি স্টারলিংককে শত্রুপক্ষের ‘যুদ্ধের হাতিয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, এই সেবা সামরিক নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ, গুপ্তচরবৃত্তি এবং তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করা হতে পারে।
স্টারলিংকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য ইরানের হাতে একাধিক ব্যবস্থা রয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। তবে কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বন্ধের চেষ্টা চলছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি আগামিরি।
তেহরানভিত্তিক এক ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে আল-জাজিরাকে জানান, স্টারলিংকের সংযোগ বাধাগ্রস্ত করতে বিভিন্ন ধরনের সংকেত-প্রতিবন্ধক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন যন্ত্র চালুর সময় অবস্থান শনাক্তকরণ ব্যবস্থায় বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টাও করা হচ্ছে।
ওই বিশেষজ্ঞের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় অ্যাপ ও সেবার সঙ্গে সংযোগের সময় স্টারলিংক-সংশ্লিষ্ট ইন্টারনেট প্রোটোকল শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়। এ ছাড়া যন্ত্রগুলো খুঁজে বের করতে টহল, চালকবিহীন আকাশযানের মাধ্যমে অনুসন্ধান এবং বিক্রয়কেন্দ্রে অভিযান চালানো হচ্ছে।
ইরানে স্টারলিংক ব্যবহার বা নিজের কাছে রাখার জন্য ছয় মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। যন্ত্র আমদানি ও বিতরণের ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের মেয়াদ পাঁচ বছর পর্যন্ত হতে পারে। জাতীয় নিরাপত্তা বা গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ যুক্ত হলে আরও কঠোর শাস্তির ঝুঁকি রয়েছে।
২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে নাফতালি বেনেট দাবি করেছিলেন, সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করতে ইসরায়েল ইরানে হাজার হাজার স্টারলিংক যন্ত্র পাচার করেছিল। তবে বর্তমানে দেশটিতে ঠিক কতটি যন্ত্র রয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায়নি।
স্টারলিংকের সম্প্রচার বন্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করছে ইরান। ২০২৩ সাল থেকে দেশটি আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের রেডিও রেগুলেশনস বোর্ডে বিষয়টি উত্থাপন করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র ও নরওয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে অননুমোদিত সম্প্রচার বন্ধ করাই এর লক্ষ্য।
গত ৪ অক্টোবর তেহরানে নরওয়ের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অননুমোদিত স্টারলিংক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানায় দেশটি।
ইরানের উদ্বেগ শুধু স্টারলিংক বন্ধ করতে না পারা নিয়ে নয়; বরং স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের বিস্তার দেশটির দীর্ঘদিনের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে বলেও আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এক নীতিনির্ধারণী বৈঠকে ইরানের উপপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোহাম্মদ হাফেজ হাকামি সতর্ক করে বলেন, স্টারলিংকের ব্যবহার ব্যাপক হলে তা দেশটির সাইবারস্পেস নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ‘কফিনে শেষ পেরেক’ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, এই সেবা প্রচলিত স্থানীয় নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর না করেই আন্তর্জাতিক ইন্টারনেটে প্রবেশের সুযোগ দেয়।
ইরান সরকার অতীতেও বিভিন্ন সময়ে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ২০১৭-১৮ সালের জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধিবিরোধী বিক্ষোভের পর টেলিগ্রাম বন্ধ করা হয়। ২০১৯ সালের দেশব্যাপী বিক্ষোভের সময় প্রথমবারের মতো প্রায় এক সপ্তাহের জন্য ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়। পরে ২০২২-২৩ সালের বিক্ষোভের পর হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামও নিষিদ্ধ করা হয়।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিক্ষোভের সময় দেশজুড়ে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনাও ঘটে। হাকামির আশঙ্কা, বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থার বিস্তার অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতের কোনো সংকটে সরকারকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করার মতো চরম পদক্ষেপের কথাও বিবেচনা করতে হতে পারে।
ইরানের প্রায় ৯ কোটি মানুষ ২০২৬ সালে দুই দফায় দীর্ঘ সময় বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জানুয়ারিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভের সময় প্রায় তিন সপ্তাহ ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর যুদ্ধের প্রথম দিকে ৮৮ দিন ধরে ইন্টারনেট ব্যবহারে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
২০২২ সাল থেকে স্টারলিংক ইরানিদের সরকারি বিধিনিষেধ এড়িয়ে যোগাযোগের সুযোগ দিয়েছে। এর মাধ্যমে বিক্ষোভের ভিডিও ও অন্যান্য তথ্য দেশের বাইরে পাঠানোও সম্ভব হয়েছে। ধারণা করা হয়, কয়েক দশ হাজার স্টারলিংক যন্ত্র গোপনে দেশটিতে প্রবেশ করেছে। তবে সঠিক সংখ্যা অজানা।
তারপরও অধিকাংশ ইরানি এই সেবা ব্যবহার করতে পারেন না। যন্ত্রের সীমিত প্রাপ্যতা, উচ্চ ব্যয় এবং সরকারি অভিযানের ঝুঁকি এর প্রধান কারণ। ফলে বেশির ভাগ মানুষকে দেশটির নিজস্ব ইন্টারনেটব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়, যেখানে বহু আন্তর্জাতিক সেবা ও হাজার হাজার ওয়েবসাইট বন্ধ রয়েছে।
ইরানের সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সাইবার হামলা থেকে মানুষ ও জাতীয় সম্পদ রক্ষায় সরকারি সংস্থাগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ইন্টারনেটের গতি কমাচ্ছে।
তাঁর ভাষ্য, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার ও ইন্টারনেটভিত্তিক সেবার নিরাপত্তার কারণে কখনো কখনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ইন্টারনেটের গতি কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি সরকার অস্বীকার করছে না।
ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার ইঙ্গিতের মধ্যেও কিছু আন্তর্জাতিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি নীতিমালার নথিতে গুগল প্লে ও হোয়াটসঅ্যাপ চালুর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। ইউটিউব ও টেলিগ্রাম চালু করতে হলে ইরানের সঙ্গে আলোচনা এবং কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত কিছু শর্ত মানতে হতে পারে। তবে কবে এসব বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি।
সরকারি নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য অনেক ইরানি ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন)সহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। তবে এসব ব্যবস্থায় সংযোগের গতি কমে যেতে পারে, খরচ বাড়তে পারে এবং অনিরাপদ সংযোগের কারণে ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সরকার যখন ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, তখন এসব বিকল্প ব্যবহার করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও ব্যাংকিংসংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণেও আন্তর্জাতিক ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে ইরানিদের বাড়তি বাধার মুখে পড়তে হয়।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধের মধ্যে ইরানের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। একদিকে জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে স্টারলিংক বন্ধের চেষ্টা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বৈশ্বিক যোগাযোগের প্রয়োজন—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে দেশটির ইন্টারনেট ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
The post স্টারলিংককে ‘যুদ্ধের হাতিয়ার’ বলছে ইরান, বন্ধে মরিয়া সরকার appeared first on ভোরের চেতনা.
