কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ নাগরিক অস্থিরতায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর ক্ষমতার শেষ কয়েক মাস আরও সংকটময় হয়ে উঠেছে। সামাজিক ক্ষোভ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। দাবি মেটাতে সরকারের হাতে ব্যয় করার মতো অর্থ খুবই কম, রাজনৈতিক প্রভাবও তাঁর সামান্য অবশিষ্ট আছে এবং জনশৃঙ্খলার ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এসবের মধ্য দিয়ে একজন নেতা হিসেবে মাখোঁর অসহায়ত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গত শনিবার ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের মধ্যে দোকানপাটে লুটপাট, ভবনে আগুন দেওয়া ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ক্ষমতার মেয়াদের শেষ সময়ে এসে এ সহিংসতা মাখোঁর সামনে সম্ভবত সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ, দেশটির মানুষ সরকারের কাছ থেকে আরও বেশি কিছু চাইছে, অথচ সেই চাহিদা পূরণে বেশি ব্যয় করার সামর্থ্য এখন আর মাখোঁ সরকারের নেই।
প্রায় এক দশক আগে ক্ষমতায় এসে মাখোঁ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ফ্রান্সের স্থবির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সংস্কারে গতি আনবেন ও আরও দৃঢ় নেতৃত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন।
২০১৮-১৯ সালের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সময় জনরোষ প্রশমিত করতে মাখোঁ করছাড়, ভর্তুকিসহ শতকোটি ইউরোর আর্থিক ছাড় দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার সেই সুযোগ খুবই সীমিত। ফ্রান্সের সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ এবং বিভক্ত পার্লামেন্টের কারণে পরিস্থিতি সামাল দিতে মাখোঁর হাতে কার্যকর উপায় খুব কমই রয়েছে।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি ঠিক উল্টো। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হতে এখনো ছয় মাস বাকি। কিন্তু এ সময়ে কার্যত তিনি একজন ক্ষমতাহীন প্রেসিডেন্টে পরিণত হয়েছেন।
মাখোঁর নেতৃত্বে ফ্রান্স রাজনৈতিক অচলাবস্থায় আটকে আছে, তীব্র আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে এবং এমন এক অস্থিরতা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সীমাবদ্ধতাও সামনে নিয়ে এসেছে।
২০১৮-১৯ সালের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সময় জনরোষ প্রশমিত করতে মাখোঁ করছাড়, ভর্তুকিসহ শতকোটি ইউরোর আর্থিক ছাড় দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার সেই সুযোগ খুবই সীমিত।

ফ্রান্সের সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ এবং বিভক্ত পার্লামেন্টের কারণে পরিস্থিতি সামাল দিতে মাখোঁর হাতে কার্যকর উপায় খুব কমই রয়েছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে ফ্রান্সে ‘বিভক্ত পার্লামেন্ট’ তৈরি হওয়ার মূল কারণ, ২০২৪ সালের আগাম নির্বাচনে কোনো একক দল বা জোট সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় আসন পেতে ব্যর্থ হয়েছে। পার্লামেন্ট প্রধানত তিনটি প্রতিদ্বন্দ্বী ও চরম বিপরীতমুখী ব্লকে বিভক্ত।
মাখোঁর সাবেক মিত্ররাও এখন প্রকাশ্যে তাঁর কঠোর সমালোচনা করছেন। তাঁদের মতে, দেশের বর্তমান অচলাবস্থার পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালে মাখোঁর আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন দেওয়ার ওই সিদ্ধান্ত, যা তাঁর কর্তৃত্বকে দুর্বল করে দিয়েছে।
মাখোঁর শিবিরের সাবেক আইনপ্রণেতা লোয়িক কেরভ্রাঁ সামাজিকমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘এই মেয়াদের শেষটা যেন ধীরে ধীরে চলা এক যন্ত্রণা, যা মাখোঁর রাজনৈতিক অসহায়ত্ব ও ক্ষমতার ধীর পতনকে স্পষ্ট করে তুলছে। ২০২৪ সালে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার যে অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট নিয়েছিলেন, তাতে দেশ অচল হয়ে পড়েছে। পঞ্চম প্রজাতন্ত্রের (ফ্রান্সের বর্তমান সংবিধান ও সেই সংবিধানের অধীনে পরিচালিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা) ইতিহাসে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্ত।’
মাখোঁর এ দুরবস্থা ফ্রান্সের আরেক রাজনীতিকের রাজনৈতিক জীবনে সৌভাগ্য হয়ে উঠতে পারে। তিনি কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র্যালির নেত্রী মেরিন লো পেন। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে জনমত জরিপে এখন তিনিই সবচেয়ে এগিয়ে আছেন।
ফ্রান্সে চলমান অস্থিরতা লো পেনের জন্য রাজনৈতিক সুবিধা বয়ে আনতে পারে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে জনমত জরিপে এখন তিনিই এগিয়ে আছেন।
জীবনযাত্রার মানের অবনতি নিয়ে মানুষের ক্ষোভ এবং সপ্তাহান্তের সহিংসতার পর আইনশৃঙ্খলা নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগ—দুদিক থেকেই লো পেন লাভবান হতে পারেন।

মাখোঁর দলের সাবেক আইনপ্রণেতা জ্যঁ-বাতিস্ত মোরো রয়টার্সকে বলেন, ‘লো পেনের এখন নির্বাচনী প্রচারে আর কোনো অর্থ খরচ করারও প্রয়োজন নেই। তাঁর সামনে পথ শুধু পরিষ্কারই হয়ে যায়নি; বরং ছয় লেনের মহাসড়ক তৈরি হয়ে গেছে।’
গত রোববার এক ভিডিও বার্তায় জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেন লো পেন। সেখানে তিনি মাখোঁর সরকারকে ভেঙে পড়তে থাকা এক ক্ষমতা হিসেবে তুলে ধরেন এবং নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন, যিনি দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন।
