কানাডার অন্টারিও প্রদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর মিসিসাগা। টরন্টোর পশ্চিমে অবস্থিত এই শহরে বিশ্বের নানা দেশের মানুষের বসবাস। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, মিসিসাগার জনসংখ্যা ৭ লাখ ১৭ হাজার ৯৬১ জন। তাঁদের ৫৩ দশমিক ২ শতাংশই অভিবাসী। বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসও এই শহরে। বিমানবন্দর, বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বহুজাতিক জনগোষ্ঠীর কারণে মিসিসাগা কানাডার অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। শহরটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে মিসিসাগা সিটি কাউন্সিল, যা একজন মেয়র ও ১১ জন নির্বাচিত কাউন্সিলর নিয়ে গঠিত। নাগরিকদের সম্পত্তিকর, সড়ক, গণপরিবহন, আবাসন, পার্ক ও বিভিন্ন সেবার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় এই পরিষদ।
সেই মিসিসাগায় এখন মেয়র নির্বাচন ঘিরে জমে উঠেছে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। যিনি একসময় প্রায় এক দশক শহরের মেয়র ছিলেন, তিনি আবার সেই পদে ফিরতে চান। যিনি বর্তমানে মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন, তিনি আরও চার বছর সুযোগ চাইছেন। আর তাঁদের দুজনের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছেন অপেক্ষাকৃত তরুণ এক কাউন্সিলর, যাঁর প্রতি ভোটারদের সমর্থন গত দুই মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগামী সোমবার, ২৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে মিসিসাগার মেয়র নির্বাচন। ভোটের ঠিক আগে প্রকাশিত সর্বশেষ জনমত জরিপ বলছে, সাবেক মেয়র বনি ক্রম্বি এগিয়ে থাকলেও বর্তমান মেয়র ক্যারোলিন প্যারিশ এবং কাউন্সিলর অ্যালভিন টেডজোর সঙ্গে তাঁর ব্যবধান খুব বেশি নয়। ফলে নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে এই তিন প্রার্থীর লড়াই ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল।
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর প্রকাশিত লিয়াজোঁ স্ট্র্যাটেজিসের (Liaison Strategies) জরিপে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কোনো প্রার্থীর দিকে ঝুঁকে থাকা ভোটারদের মধ্যে বনি ক্রম্বির সমর্থন ৩৫ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছেন অ্যালভিন টেডজো, তাঁর সমর্থন ৩১ শতাংশ। বর্তমান মেয়র ক্যারোলিন প্যারিশ ২৮ শতাংশ সমর্থন নিয়ে নেমে গেছেন তৃতীয় স্থানে।
মাত্র আড়াই সপ্তাহ আগেও চিত্রটি ছিল অন্য রকম। ৫ অক্টোবরের জরিপে ক্রম্বি পেয়েছিলেন ৩০ শতাংশ, প্যারিশ ২৯ শতাংশ এবং টেডজো ২৬ শতাংশ সমর্থন। এরপর ক্রম্বি ও টেডজো দুজনের সমর্থনই পাঁচ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। অন্যদিকে প্যারিশের সমর্থন এক পয়েন্ট কমেছে। সবচেয়ে লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটেছে টেডজোর অবস্থানে। গত আগস্টে তাঁর সমর্থন ছিল মাত্র ১২ শতাংশ। দুই মাসের ব্যবধানে তা পৌঁছেছে ৩১ শতাংশে। যে নির্বাচন প্রথমদিকে সাবেক ও বর্তমান মেয়রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখা হচ্ছিল, সেখানে এখন তৃতীয় প্রার্থীর শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে।
লিয়াজোঁ স্ট্র্যাটেজিস ১৯ ও ২০ অক্টোবর টেলিফোনের মাধ্যমে মিসিসাগার এক হাজার বাসিন্দার মতামত সংগ্রহ করে। জরিপে বয়স, লিঙ্গ ও জাতিগত প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। মোট নমুনার ক্ষেত্রে ত্রুটির সীমা ৩ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট। তবে বিভিন্ন উপদলে এই সীমা আরও বেশি। ফলে প্রকাশিত চার বা সাত শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানকে নির্বাচনের নিশ্চিত ফলাফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
একই সময়ের আরেকটি জরিপেও কাছাকাছি চিত্র পাওয়া গেছে। ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত মেইনস্ট্রিট রিসার্চের জরিপে ক্রম্বির সমর্থন ছিল ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ, টেডজোর ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং প্যারিশের ২৬ দশমিক ২ শতাংশ। ওই জরিপেও বর্তমান মেয়র তৃতীয় স্থানে ছিলেন। তবে প্রায় ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা তখনো সিদ্ধান্তহীন ছিলেন। দুটি পৃথক জরিপে একই তিন প্রার্থীকে কাছাকাছি অবস্থানে পাওয়া গেলেও শেষ পর্যন্ত কার পক্ষে কত ভোট পড়বে, তা নির্ধারিত হবে ভোটের দিন।
মিসিসাগার রাজনীতিতে বনি ক্রম্বি পরিচিত মুখ। ২০১৪ সালে তিনি প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি ফেডারেল পার্লামেন্টের সদস্য এবং মিসিসাগা সিটি কাউন্সিলের কাউন্সিলর ছিলেন। দীর্ঘদিন মেয়রের দায়িত্ব পালনের পর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে অন্টারিও লিবারেল পার্টির নেতা নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ২০২৪ সালের ১২ জানুয়ারি মিসিসাগার মেয়র পদ থেকে সরে দাঁড়ান। প্রাদেশিক রাজনীতিতে তাঁর সেই অভিযাত্রা প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। ২০২৫ সালের অন্টারিও নির্বাচনে নিজের আসনেও জয়ী হতে পারেননি তিনি। পরবর্তী সময়ে দলের নেতৃত্ব ছেড়ে দেন। এবার তাঁর লক্ষ্য মিসিসাগার মেয়র পদ ফিরে পাওয়া।
ক্রম্বির প্রতিপক্ষ ক্যারোলিন প্যারিশেরও রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। তিনিও ফেডারেল পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন, দায়িত্ব পালন করেছেন সিটি কাউন্সিলে। ক্রম্বির পদত্যাগের পর ২০২৪ সালের উপনির্বাচনে তিনি মেয়র নির্বাচিত হন। এখন নিজের মেয়াদে নেওয়া সিদ্ধান্ত ও চলমান কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। একই শহরের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা এই দুই নেত্রীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাসও পুরোনো। ২০১১ সালে মিসিসাগার ওয়ার্ড ৫-এর কাউন্সিলর পদে উপনির্বাচনে ক্রম্বি মাত্র ২৪১ ভোটের ব্যবধানে প্যারিশকে পরাজিত করেছিলেন।
অন্যদিকে অ্যালভিন টেডজো মিসিসাগার ওয়ার্ড ২-এর কাউন্সিলর। ২০২২ সালে প্রথম কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি। ২০২৪ সালের মেয়র পদে উপনির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এবং দ্বিতীয় হন। এবার তাঁর প্রচারণায় বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে ‘টিল ওয়েভ’ বা নীলাভ-সবুজ ঢেউ। এটি তাঁর নির্বাচনী প্রচারসামগ্রীর রঙকে কেন্দ্র করে তৈরি একটি পরিচিতি। তাঁর প্রচারণা শিবির এই নাম ব্যবহার করে সমর্থন বৃদ্ধির কথা তুলে ধরছে। গত আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে জরিপে টেডজোর সমর্থনের বৃদ্ধি সেই প্রচারণাকে নতুন গুরুত্ব দিয়েছে।
মিসিসাগার মেয়র পদে এবার মোট ১৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন হলেন দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত দীপিকা ডামেরলা। ভারতের সেকেন্দ্রাবাদে জন্ম নেওয়া এই রাজনীতিক ১৯৯১ সালে কানাডায় আসেন। তিনি অন্টারিওর প্রাদেশিক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী ছিলেন। বর্তমানে মিসিসাগার ওয়ার্ড ৭-এর কাউন্সিলর। ২০২৪ সালের মেয়র উপনির্বাচনেও অংশ নিয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন। তবে এবারের নির্বাচনে তাঁর প্রতি জনসমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত আগস্টে লিয়াজোঁর জরিপে তাঁর সমর্থন ছিল ১৮ শতাংশ। সর্বশেষ জরিপে তা নেমে এসেছে মাত্র ৪ শতাংশে। ফলে নির্বাচনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন বনি ক্রম্বি, ক্যারোলিন প্যারিশ ও অ্যালভিন টেডজোকে ঘিরে।
মিসিসাগার নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে জীবনযাত্রার ব্যয়, বাড়ির সম্পত্তিকর, আবাসন সংকট, যানজট এবং জননিরাপত্তা। ৫ অক্টোবর প্রকাশিত লিয়াজোঁর জরিপে ২৫ শতাংশ বাসিন্দা জীবনযাত্রার ব্যয়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। আবাসন ও সম্পত্তিকরের কথা বলেন পৃথকভাবে ১৫ শতাংশ করে। অপরাধ ও যানজটকে প্রধান সমস্যা মনে করেন ১২ শতাংশ করে। গণপরিবহন নিয়ে উদ্বেগ জানান ৮ শতাংশ।
এদিকে বর্তমান মেয়র প্যারিশকে নিয়ে ভোটারদের মূল্যায়নও নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। ২২ অক্টোবর প্রকাশিত লিয়াজোঁর জরিপে ৩৭ শতাংশ বাসিন্দা তাঁর কাজের প্রতি সন্তুষ্টি জানিয়েছেন। সমানসংখ্যক মানুষ অসন্তুষ্ট এবং ২৫ শতাংশ নিশ্চিত মতামত দেননি। অক্টোবরের গোড়ায় তাঁর কাজের প্রতি অসন্তুষ্টির হার ছিল ৪২ শতাংশ। সেই হার কিছুটা কমলেও সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি।
শহরের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়েও বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। সর্বশেষ জরিপে ৪৬ শতাংশ মনে করেন, মিসিসাগা ভুল পথে এগোচ্ছে। বিপরীতে ৩০ শতাংশের ধারণা, শহরটি সঠিক পথে রয়েছে। বাকি ২৪ শতাংশ এ বিষয়ে নিশ্চিত নন। এই অসন্তোষ শুধু বর্তমান মেয়রের বিরোধীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নগর পরিচালনা, কর এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সাধারণ বাসিন্দাদের উদ্বেগও এর মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে নারী ও পুরুষ ভোটারদের সমর্থনের পার্থক্যও চোখে পড়ার মতো। লিয়াজোঁর সর্বশেষ জরিপে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও কোনো প্রার্থীর দিকে ঝুঁকে থাকা পুরুষ ভোটারদের মধ্যে ক্রম্বি পেয়েছেন ৪১ শতাংশ সমর্থন। টেডজো পেয়েছেন ২৯ শতাংশ এবং প্যারিশ ২৬ শতাংশ। নারীদের মধ্যে টেডজোর সমর্থন ৩৩ শতাংশ, ক্রম্বির ৩০ শতাংশ এবং প্যারিশের ২৯ শতাংশ।
বয়সভিত্তিক হিসাবেও একক কোনো প্রার্থীর আধিপত্য দেখা যাচ্ছে না। ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ক্রম্বির সমর্থন ৩৭ শতাংশ, টেডজোর ৩১ শতাংশ এবং প্যারিশের ২৭ শতাংশ। আবার ৩৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সীদের মধ্যে টেডজো ও প্যারিশ দুজনই ৩৩ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। ক্রম্বির সমর্থন ২৯ শতাংশ। তবে এসব বয়সভিত্তিক উপনমুনা তুলনামূলক ছোট হওয়ায় ফলাফলের অনিশ্চয়তাও বেশি।
নির্বাচনের আগে অগ্রিম ভোটগ্রহণে অংশগ্রহণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। মিসিসাগা সিটি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৬ থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত অগ্রিম ভোটে ৪৪ হাজার ৪৯ জন ভোট দিয়েছেন। ২০২২ সালের পৌর নির্বাচনে এই সংখ্যা ছিল ২৮ হাজার ৫২। অর্থাৎ এবার অগ্রিম ভোট বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ।
আগামী ২৬ অক্টোবর সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। মেয়রের পাশাপাশি কাউন্সিলর এবং স্কুল বোর্ড ট্রাস্টি নির্বাচিত করবেন ভোটাররা। মেয়র ও কাউন্সিলররা দায়িত্ব পালন করবেন ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত।
নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের অবস্থান। লিয়াজোঁর সর্বশেষ জরিপে প্রাথমিকভাবে পছন্দের প্রার্থী জানতে চাওয়া হলে ২৪ শতাংশ কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। পরে তাঁদের মধ্যে যাঁরা কোনো প্রার্থীর দিকে ঝুঁকে থাকার কথা জানিয়েছেন, তাঁদের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করার পর তিন প্রধান প্রার্থীর সমর্থনের ব্যবধান দাঁড়ায় চার থেকে সাত শতাংশ পয়েন্টে। ফলে শেষ কয়েক দিনের প্রচারণা, ভোটার উপস্থিতি এবং সিদ্ধান্তহীনদের চূড়ান্ত পছন্দ নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তথ্যসূত্র: Liaison Strategies (২২ অক্টোবর ২০২৬), Mainstreet Research (১৯ অক্টোবর ২০২৬), City of Mississauga
সম্পুর্ন খবরটি পড়ার জন্য এই লিঙ্কে ক্লিক করুন ::মিসিসাগার মেয়র নির্বাচনে তিন হেভিওয়েটের লড়াই first appeared on DesheBideshe.