নাব্য সংকট, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পিছিয়ে মোংলা বন্দর। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পায়নের গতি ফেরাতে দীর্ঘদিনের এসব সমস্যার সমাধান চান ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা। তাদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন সফরে মিলবে কার্যকর উদ্যোগের দিকনির্দেশনা, খুলবে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) মোংলা বন্দর সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফর ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা। তাদের মতে, বন্দরের বিদ্যমান সক্ষমতা কাজে লাগানো, পণ্য পরিবহনে ব্যয় কমানো এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে দীর্ঘদিনের প্রতিবন্ধকতা দূর করা এখন জরুরি।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দরের জেটির কার্যক্রম ও বন্দরসংলগ্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন করবেন। এ ছাড়া হেলিকপ্টারে সুন্দরবনের বিভিন্ন পর্যটন স্পট ও বন্দর চ্যানেলের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনের কথা রয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর এই প্রথম মোংলা বন্দর সফরকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাগেরহাট-৩ (রামপাল-মোংলা) আসনের সংসদ সদস্য ও বন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরে মোংলা বন্দরের উন্নয়ন ও দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ, মোংলা নদীতে সেতু নির্মাণ, মোংলা-খুলনা সড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা এবং ট্রানজিট সুবিধা কাজে লাগিয়ে বন্দরকে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে জাহাজ চলাচলের উপযোগী নাব্যতা নিশ্চিত করা এবং পণ্য পরিবহনের ব্যয় কমানোকে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
মোংলা সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, মোংলা ইপিজেড ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সহজ হবে।
তিনি বলেন, বন্দরের নাব্য রক্ষায় নিয়মিত ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি খালাস করা পণ্য দ্রুত ও কম খরচে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য রেল ও সড়ক যোগাযোগের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব সমস্যার সমাধান হলে মোংলাকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়নের পরিসর বাড়বে।
মোংলা শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম বলেন, মোংলা বন্দরের জেটিতে জাহাজের আগমন কমে যাওয়া উদ্বেগজনক। বন্দরের চ্যানেলের নাব্য সংকট নিরসনে স্থায়ী ড্রেজিং ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি রামপালে বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ শুরু করা প্রয়োজন।
তার মতে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করে বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে গতি আনতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে এসব বিষয়ে কার্যকর নির্দেশনা আসবে বলে আশা করছেন তারা।
ব্যবসায়ীদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থান ও বিদ্যমান অবকাঠামোগত সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে মোংলা বন্দরের অবদান আরও বাড়ানো সম্ভব। তবে এ জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, দ্রুত পণ্য খালাস ও পরিবহন এবং প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধ করা জরুরি।
ব্যবসায়ী মো. খোরশেদ আলম বলেন, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে মোংলা বন্দর। দেশের অর্থনীতিতে বন্দরের অবদান বাড়াতে হলে বন্দরকেন্দ্রিক আমলাতান্ত্রিক হয়রানি ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।
তিনি বলেন, সরকারপ্রধানের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চান ব্যবসায়ীরা। মোংলা বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দ্রুত পণ্য পরিবহন এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়বে। এর ফলে দক্ষিণাঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর মোংলা বন্দর সফর উপলক্ষে কোনো দলীয় কর্মসূচি না থাকলেও বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। এ উপলক্ষে বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন স্থানে আনন্দ মিছিল করেছেন দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা।
মোংলা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল মান্নান হাওলাদার বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান দেশ পরিচালনায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি মোংলা বন্দরের উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বন্দরের কার্যক্রম পরিদর্শনে আসছেন।
