বাজারে মাছওয়ালার সামনে দাঁড়িয়ে তুমি হয়তো বলো, ‘চিংড়ি মাছ কত করে?’ কিন্তু কাঁকড়ার বেলায় কেউ বলে না, ‘কাঁকড়া মাছ কত?’ সবাই বলে, ‘কাঁকড়াটা কত?’ ব্যাপারটা খুব ছোট। তবু একটু খেয়াল করলেই মনে প্রশ্ন জাগে। দুজনেই পানিতে থাকে, দুজনেরই গায়ে শক্ত খোলস, দুজনকেই শেষ পর্যন্ত পাতে তোলা হয়। তাহলে একজনের নামের সঙ্গে মাছজুড়ে গেল, অন্যজনের সঙ্গে গেল না কেন?
আগে একটা কথা জেনে রাখো। চিংড়ি আসলে মাছ নয়, কাঁকড়াও নয়। জীববিজ্ঞানের ভাষায়, দুজনেই ক্রাস্টেসিয়ান বা খোলসযুক্ত সন্ধিপদী প্রাণী। লবস্টারও এই দলের সদস্য। মাছের মেরুদণ্ড থাকে, কিন্তু চিংড়ি ও কাঁকড়ার মেরুদণ্ড নেই। মাছের কঙ্কাল থাকে শরীরের ভেতরে, আর এদের শরীরকে সুরক্ষা দেয় বাইরের শক্ত খোলস। মাছের পাখনা আছে, আর চিংড়ি ও কাঁকড়ার আছে সন্ধিযুক্ত পা। এরা একই বৃহত্তর প্রাণীগোষ্ঠীর সদস্য হলেও চিংড়ি ও কাঁকড়া একেবারে একই ধরনের প্রাণী নয়।
তাহলে চিংড়ির নামের সঙ্গে মাছ জুড়ে গেল কীভাবে? এর উত্তর বিজ্ঞানের চেয়ে ভাষা আর মানুষের অভ্যাসের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। বাংলায় পানিতে বাস করা অনেক প্রাণীর নামের সঙ্গেই মাছ শব্দটি জুড়ে গেছে। চিংড়ি তার একটি উদাহরণ। ইংরেজিতেও এমন দেখা যায়। জেলিফিশ ও স্টারফিশের নামের শেষে ফিশ থাকলেও এরা মাছ নয়। অর্থাৎ প্রাণীর নামের সঙ্গে মাছ শব্দ থাকলেই সে সত্যিকারের মাছ হয়ে যায় না।
চিংড়ি আর কাঁকড়ার চেহারার দিকে তাকালে নামের এই পার্থক্যের একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। চিংড়ির শরীর লম্বাটে। মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত শরীরের গড়ন অনেকটা একটানা, যা দূর থেকে ছোট মাছের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। বিপদের মুখে চিংড়ি পেটের অংশ গুটিয়ে লেজ ঝাপটে দ্রুত পেছনের দিকে ছিটকে যায়। অন্যদিকে কাঁকড়ার শরীর চওড়া ও চ্যাপটা। তার ছোট লেজের মতো অংশটি পেটের নিচে ভাঁজ হয়ে থাকে। অনেক কাঁকড়া পাশ ফিরে হাঁটে। তাই চেহারা ও চলাফেরার দিক থেকে কাঁকড়াকে মাছের সঙ্গে মেলানো কঠিন। তবে সব চিংড়ি একইভাবে সাঁতরে বেড়ায় না, আর সব কাঁকড়াও শুধু পাশ ফিরে হাঁটে না।

মানুষ কীভাবে এসব প্রাণী ধরে, সেটিও নামের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। চিংড়ি নদী, খাল, বিল ও উপকূলীয় জলাশয়ে জাল দিয়ে ধরা হয়। চাষের চিংড়িও বাজারে মাছের সঙ্গে বিক্রি হতে দেখা যায়। কাঁকড়া ধরার পদ্ধতি অবশ্য প্রজাতি ও পরিবেশভেদে আলাদা। কোথাও কাদার গর্ত থেকে কাঁকড়া ধরা হয়, কোথাও ব্যবহার করা হয় ফাঁদ। কাঁকড়ার শক্ত দাঁড়া বা চিমটি থেকে বাঁচতে ধরার পর অনেক সময় সেগুলো বেঁধেও রাখা হয়। বাজারে চিংড়ি ও কাঁকড়ার আলাদা পরিচয় থাকলেও নামের পার্থক্যটি শুধু ধরার পদ্ধতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
রান্নাঘরের অভ্যাসও এখানে ভূমিকা রাখতে পারে। চিংড়ি দিয়ে মালাইকারি, লাউ-চিংড়ি কিংবা কচুর লতি দিয়ে চিংড়ির মতো নানা পদ তৈরি হয়। চিংড়ি ভাজা, ঝোল বা ভর্তা—কতভাবেই না খাওয়া হয়! আমাদের দৈনন্দিন খাবারের সঙ্গে চিংড়ির সম্পর্ক বেশ পুরোনো। কাঁকড়া খাওয়ার পদ্ধতি কিছুটা আলাদা। শক্ত খোলস ভেঙে ভেতরের মাংস বের করে খেতে হয়। ফলে চিংড়ি ও কাঁকড়া রান্না ও খাওয়ার অভিজ্ঞতাও এক নয়। তবে কাঁকড়াও পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে জনপ্রিয় খাবার।

বাংলাদেশে চিংড়ির অর্থনৈতিক গুরুত্বও অনেক। বিশেষ করে খুলনা, বাগেরহাট ও উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় চিংড়ি চাষ বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। চাষ করা চিংড়ি দেশের বাজারে বিক্রি হয়, আবার বিদেশেও রপ্তানি করা হয়। চিংড়ির বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে গলদা ও বাগদা বেশ পরিচিত। গলদা সাধারণত মিঠাপানি ও লবণাক্ততার পরিবর্তন ঘটে এমন পরিবেশে চাষ করা হয়; বাগদা চিংড়ি মূলত লবণাক্ত বা অল্প লবণাক্ত পানির উপকূলীয় পরিবেশে চাষ হয়। চিংড়ি আমাদের পরিচিত খাবার ও ব্যবসার অংশ হওয়ায় দৈনন্দিন কথাবার্তায় তার নামের সঙ্গে মাছ শব্দটি সহজেই জুড়ে গেছে।
ইংরেজিতে ‘শেলফিশ’নামে একটি প্রচলিত শব্দ আছে। চিংড়ি, কাঁকড়া, ঝিনুকসহ নানা জলজ অমেরুদণ্ডী প্রাণীকে এই নামে ডাকা হয়। তবে শেলফিশ কোনো একক বৈজ্ঞানিক শ্রেণির নাম নয়। এদের অনেকেরই শক্ত খোলস আছে, কিন্তু তারা সবাই একই প্রাণীগোষ্ঠীর সদস্য নয়। চিংড়ি ও কাঁকড়া ক্রাস্টেসিয়ান, আর ঝিনুক মোলাস্কা পর্বের প্রাণী। তাদের এক নামে ডাকা হয় মূলত মানুষের ব্যবহারিক অভ্যাসের কারণে।
তাহলে প্রশ্নের উত্তর কী? চিংড়ি মাছ নয়, তবু বাংলায় তাকে চিংড়ি মাছ বলা হয় ভাষার প্রচলনের কারণে। তার চেহারা, চলাফেরা, বাজারে বিক্রি হওয়া ও রান্নার অভ্যাস—সব মিলিয়ে নামটি জনপ্রিয় হয়েছে। কাঁকড়ার ক্ষেত্রে মাছ শব্দটি প্রচলিত হয়নি। তবে এর পেছনে ঠিক কোন কারণটি সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। ভাষা সব সময় বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস মেনে চলে না; মানুষের দীর্ঘদিনের ব্যবহারেও শব্দের অর্থ ও পরিচয় গড়ে ওঠে।
