শ্রেয়সী পাল : মুম্বইয়ের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের ব্যালকনি থেকে আরব সাগর দেখা যায়। চাইলেই সেখানেই কাটিয়ে দিতে পারতেন গোটা জীবন। কিন্তু মন টেকে না। মন পড়ে থাকে মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জের এক চিলতে উঠোনে, যেখানে মাটির গন্ধ আছে। দেশের প্রথম সারির তারকা হওয়া সত্ত্বেও আজও মাটি থেকে পা সরেনি তাঁর। তিনি অরিজিৎ সিং। বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে প্রিয় গায়ক।
বলিউডে পা রাখলেও বলিউড তাঁকে কিনতে পারেনি। মুম্বইয়ের তারকাখচিত লাইফস্টাইল, রঙিন পার্টি, পাপারাজ্জির ফ্ল্যাশ আজও ভোলাতে পারেনি তাঁর জন্মভূমিকে। তাই তো কাজ মিটলেই ছুটে আসেন জিয়াগঞ্জের নিজস্ব বাসভবনে। শুধু নিজে থাকেন না, নিজের শহরের মানুষের জন্য ব্যবসার পরিধিও গড়েছেন এখানেই। তারই একটি হল তাঁর পারিবারিক রেস্টুরেন্ট 'হেঁশেল'। আর এবার সেই হেঁশেলেই দেখা গেল এক অন্য অরিজিৎকে, যিনি তারকা নন, একেবারে ঘরের ছেলে।
মিডিয়ার নজর এড়িয়ে, কোনও রকম প্রচার ছাড়াই এক দুপুরে হেঁশেলে হাজির হলেন অরিজিৎ । পুজোর আবহে পরনে পাজামা পাঞ্জাবি আর মুখে চির চেনা হাসি। রেস্টুরেন্টের কর্মীরা প্রথমে চমকে গেলেও, মুহূর্তেই আড়ষ্টতা কেটে যায়। কারণ সেদিন অরিজিৎ তাঁদের কাছে 'বস' ছিলেন না, ছিলেন দাদা।
রেস্টুরেন্টের ভেতরের ছবিটা ছিল দেখার মতো। একসঙ্গে বসে আড্ডা, হাসি, গান। কর্মীদের সঙ্গে বসে খাবার খাওয়া, তাঁদের সুখ-দুঃখের খবর নেওয়া। কোথাও এতটুকু অভাব ঘটেনি আন্তরিকতার। হেঁশেলের এক কর্মী বলেন, "দাদা এসে আমাদের সঙ্গে যেভাবে মিশলেন, মনে হল পরিবারের কেউ এসেছে ।"
শুধু তাই নয়, সবাই মিলে সেলফির আবদার করতেই হাসিমুখে রাজি হয়ে গেলেন অরিজিৎ । কারও সঙ্গে দু'মিনিট দাঁড়িয়ে গল্পও করলেন। তারকাসুলভ কোনও বেড়াজাল ছিল না তাঁর ।
অরিজিতের এই ঝটিকা সফরের ছবি সমাজমাধ্যমে পোস্ট হতেই তা ভাইরাল হয়েছে। মুহূর্তে ঝড় ওঠে কমেন্ট বক্সে।
কেউ লিখেছেন, "আমার প্রিয় মানুষ, মাটির মানুষ।" কেউ লিখেছেন, "সাফল্যের স্বর্ণচূড়ায় উঠেও যে মানুষটা জিয়াগঞ্জকে ভোলেনি, সেই তো আসল হিরো।" আবার অনেকেই লিখেছেন, "গর্ব হয়, উনি আমাদের শহরের ছেলে।"
প্রসঙ্গত, জিয়াগঞ্জের হাতিবাগানে অবস্থিত এই 'হেঁশেল' রেস্টুরেন্টটি পরিচালনা করেন অরিজিতের পরিবারের সদস্যরা। বাঙালি খাবারের জন্য এই রেস্টুরেন্ট ইতিমধ্যেই জিয়াগঞ্জে বিখ্যাত।
তবে এর আসল বিশেষত্ব হল, তারকা পরিবারের রেস্টুরেন্ট হওয়া সত্ত্বেও এখানে খাবারের মূল্য একেবারেই সাধারণের আয়ত্তের মধ্যে। বিশেষ করে কলেজ পড়ুয়া এবং ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য রয়েছে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা। অল্প টাকায় পেট ভরে ভালো বাঙালি খাবার পান পড়ুয়ারা এখানে । অরিজিতের ইচ্ছাতেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে তাঁর শহরের কোনও ছাত্রকে খাবারের জন্য বেশি ভাবতে না হয়।
আসলে অরিজিৎ সিং বারবার প্রমাণ করেন, বড় গায়ক হওয়ার আগে বড় মানুষ হওয়া জরুরি। কোটি টাকার স্টেজ শো ছেড়ে যিনি জিয়াগঞ্জের হেঁশেলে বসে কর্মীদের সঙ্গে ভাত ভাগ করে খেতে পারেন, তিনিই তো প্রকৃত তারকা। মুম্বই তাঁকে খ্যাতি দিয়েছে, কিন্তু জিয়াগঞ্জ তাঁকে হৃদয় দিয়েছে। আর হৃদয়ের টানেই তিনি ফিরে ফিরে আসেন, 'হেঁশেলে'র হাঁড়ির খবর নিতে, নিজের মানুষদের কাছে।
