সৌমাল্য মুখোপাধ্যায়
ক্রমে যখন বিশুদ্ধ শিল্পের মিথ্যে সংজ্ঞায় আবিল হয়ে উঠছে ভাষাসভ্যতা, রাজনীতি ও স্বকাল থেকে শিল্পকে বিযুক্ত করার প্রযত্ন লক্ষিত হচ্ছে সর্বত্র— তখন অনিবার্যভাবেই অমিয় চক্রবর্তীর কথা স্মরণে জেগে ওঠে। এই ব্যাধি আজকের নয় যদিও। শিল্প রুদ্ধদ্বারের সাধনা— এই প্রস্তাবের প্রতি নিরতিশয় সম্ভ্রম জানিয়ে প্রাত্যহিক পৃথিবীতে শিল্পের ব্যবহারিক ক্ষমতাকে (potentiality) ইতিহাসে সন্দেহ করা হয়েছে অসংখ্যবার।
যেন কবি ও শিল্পীর বিচরণক্ষেত্র বাস্তব জগৎ নয়, তাঁর জন্যে স্বর্গের নদীতট বা নরকের উদ্যান রয়েছে— বাস্তব জগতে যে বিবিধ পেশা ও পরিচয়ের মানুষ ভ্রাম্যমাণ, তাঁরাই এই জগতে উপযুক্ত, শিল্পী আদপে স্পর্শগ্রাহ্য এই বাস্তবতায় অপরিহার্য নন। এক উকিল, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিক্ষক, শ্রমিক, রাজনীতিক— প্রত্যেকের এই কাঠামোয় অবশ্যপালনীয় ভূমিকা, প্রশ্নাতীত বিশ্বাসে জনতা মেনে নিয়েছে এবম্বিধ মানুষ ছাড়া রাষ্ট্রযন্ত্র অচল; অথচ রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালনার ক্ষেত্রে কবির কোনও অনস্বীকার্য ভূমিকা থাকতে পারে— এমন চিন্তা তাঁদের কাছে পরিহাস্য হয়ে উঠেছে ক্রমে। অথচ মনে পড়ছে অমিয় চক্রবর্তীর দৃপ্ত দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা: "শিল্পীকে সঙ্গে নিয়ে নোয়াখালি, বেহার, পঞ্জাবের প্রজ্বলিত দ্বিখণ্ডে, কাশ্মীরে ঘোরা যেতে পারে, তারই দৃষ্টিতে দৃশ্যের সত্য ধরা পড়বে"।
এমন প্রস্তাব স্বভাবতই কৌতুকদীপ্ত মনে হবে জনতার, মিতবাক অথবা প্রগলভ শিল্পীর দাঙ্গা-বিদ্ধস্ত নোয়াখালি বিহার পঞ্জাবে ঠিক কী কাজ থাকতে পারে? এবং একজন রাষ্ট্রিকের কাছে সেই কাজের মূল্যই বা কী? এই প্রশ্নেরই উত্তর অন্বেষণ করেছিলেন কবি অমিয় চক্রবর্তী। উপরোক্ত প্রস্তাব, তাঁর, নিছক কল্পনাবিলাস নয়— বরং দৃঢ়মূল ধারণা। তিনি সমকাল ও ভবিষ্যৎকে বোঝাতে চেয়েছিলেন— উগ্র মতাদর্শের খণ্ডিত আলোয় যে দৃশ্য আমরা দেখি, সেই দৃশ্যের মধ্যে সত্যের নির্বাচিত অংশ থাকলেও, পূর্ণ সত্য নেই। রাষ্ট্রিক ও ধর্মতাত্ত্বিক মানব-জীবনের যে ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে, তার মধ্যে ক্বচিৎ ঔজ্জ্বল্য থাকলেও সমগ্রতার দ্যোতনা নেই। সেই ব্যাখ্যা প্রকৃতপ্রস্তাবে খণ্ডিত। অমিয়'র ভাষায় রাষ্ট্রিক ও ধর্মতাত্ত্বিক আসলে 'ছিন্নদর্শী'।
সমগ্রকে দেখার, অখণ্ডকে অবধান করার সামর্থ্য তাঁদের নেই। কেটে-ছিঁড়ে দেখার প্রক্রিয়ায় তাঁরা অভ্যস্ত। সেই সামর্থ্য রয়েছে একমাত্র শিল্পীর। কবির। কবি একমাত্র পারে সমগ্রকে দেখতে। বিবিধ বৈপরীত্য ও বৈচিত্র্যের মধ্যে দিয়ে। শিল্প অংশকে নিয়ে নয়, তা সম্পূর্ণকে নিয়েই— এই ছিল অমিয়র দৃঢ়প্রতিষ্ঠ বিশ্বাস। ধর্মতাত্ত্বিক জীবনের যে ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে, তার মধ্যে প্রত্যক্ষ লৌকিক ও ঐহিক জীবনের অবশ্যম্ভাবিতা বহুলাংশে উপেক্ষিত হয়ে গুরুত্ব পায় মুখ্যত আধ্যাত্মিক দূরদর্শিতা— অমিয় এই উপস্থাপনার মধ্যে পূর্ণ সত্য দেখতে পাননি।
রাষ্ট্রিকের ব্যাখ্যায় ঠিক তেমনি স্বার্থ ও তথ্যের বাহুল্য— বাস্তবকে কেবল তথ্যের অনুপুঙ্খতায় রাষ্ট্রিক ধরতে চায়— তার দৃষ্টিও মুক্ত ও অর্গলহীন নয়, তার ব্যাখ্যাও খণ্ডিত। অন্যদিকে শিল্পীই একমাত্র যার বেদনার্ত চোখের সামনে উদ্ভাসিত হয় সমগ্র। শুধু তথ্য নয়— যা তথ্যের অতীত তা-ও ধরা পড়ে শিল্পীর চোখে। কিন্তু তা থেকে সমাজ ও রাষ্ট্র ঠিক কী পেতে পারে? কোন জরুরি কাজের জন্যে অনিবার্য এই দৃষ্টিশক্তি? সেই উত্তরও অমিয় সাজিয়ে রেখেছেন আমাদের জন্য। পক্ষ ও প্রতিপক্ষের খেলা— যে খেলা আদপে মানবোচিত নয়— সেই খেলাকে অতিক্রম করে একমাত্র শিল্পীর দৃষ্টিই পৌঁছতে পারে এক মানবিক সংস্থানে। পারে, কারণ সমগ্রের খোঁজ সে পেয়েছে। পক্ষ অথবা প্রতিপক্ষের দলীয় আস্ফালনে তার মন কুঁকড়ে যায়। দুটি পক্ষকেই তার প্রায় সমপর্যায়ের মনে হয়। পক্ষের অতীত যে সত্য, যে সত্য মানবতার চূড়ান্ত বিকাশে সহায়তা করে, সেই সত্যই হয়ে ওঠে শিল্পীর প্রধান অবলম্বন। দলগত ভিন্নতা শিল্পীর কাছে নিরর্থক। সে নিহত কমিউনিস্ট ফ্যাসিস্ট হিন্দু মুসলমান বাঙালি পাঞ্জাবির মুখে দেখতে পায় শুধু মৃত পাণ্ডুর মানুষের ভয়ার্ত মুখই— তার ধর্মপরিচয় নয়। এবং শিল্পীই একমাত্র পারে নিঃসঙ্কোচে নিঃস্বার্থ হতে। নিরভিমানে নিরপেক্ষ হতে। অমিয় লিখছেন— "এমনতর উপলব্ধি যার সেই শিল্পীর পক্ষে বিপদকালে শত্রুমিত্র নির্বিশেষে সেবা করা শুধু সহজ নয়, অনিবার্য।
প্রশ্ন উঠবে, শিল্পী না হয়েও কর্মীরা বিদ্বেষহীন আত্মপর-বোধাতীত শুশ্রূষা কি করেন না? যাঁরা করেন তাঁদের বলব জীবনশিল্পী। অর্থাৎ তাদের কর্মের মূলে আছে সর্বাঙ্গীণ বোধের শিল্পপ্রতিভা; কেবলমাত্র বৈজ্ঞানিক বিধি বা সভাসমিতির প্রবর্তনায় জাতি-বর্ণ-সাম্প্রদায়িকতার বিবিধ বিষকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না।"
এখানে লক্ষণীয় পূর্ণদৃষ্টির বৃত্তি, বৈচিত্র্যকে তথা সমগ্রকে দেখার ক্ষমতা কিন্তু শিল্পীকে বিচ্ছিন্ন ও আত্মাভিমানী করে তুলছে না, বরং তার মনে অঙ্কুরিত করছে একে-একে মানবিক কল্যাণের আপাত-অপ্রকট বীজগুলি। বিচ্ছিন্নতার পরিবর্তে কল্যাণকামনা প্রগাঢ় রূপে জেগে উঠছে তার মনলোকে।
এই কল্যাণকামনা ভেদবুদ্ধি চেনে না। আত্ম-পর ভেদ নেই তার। এই প্রসঙ্গে অমিয়র মনে হয়েছিল মহাভারতের অর্জুনের কথা। অর্জুন চরিত্রটি, সে মহাকাব্যে, শিল্পপ্রতিভায় দ্যুতিমান। সমরক্ষেত্রে অর্জুনের সংশয়ই তাঁর শিল্পচেতনার পরিচায়ক। এমনকি অর্জুনের দ্বিধাকে অমিয় মনে করতেন তাঁর বিশ্বরূপদর্শনের চেয়েও জরুরি এক ব্যাপার। কুরুক্ষেত্রের সমরপ্রাঙ্গনে অর্জুনের মনে যে দ্বিধা জন্ম নিয়েছিল— তার আড়ালে রয়েছে অর্জুনের শিল্পমনস্কতা। সেই মুহূর্তে তাঁর আত্ম-পর ভেদ লোপ পেয়েছিল। পক্ষ ও প্রতিপক্ষ— এই দুই বৃত্তেই সে খুঁজে পেয়েছিল তাঁর আত্মজনদের।
পাক্ষিক দলীয় সত্যের বদলে সে দেখতে পেয়েছিল অখণ্ড সত্যকে। যে সত্য পক্ষ মানে না— সকলের কল্যাণ চায়। অন্যদিকে পুরুষোত্তমের যুক্তিকেই বরং সন্দেহ করেন অমিয়।
"ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্ নায়ং
ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ॥"
অর্থ— “আত্মার কখনও জন্ম হয় না বা মৃত্যু হয় না, অথবা পুনঃ পুনঃ তাঁর উৎপত্তি বা বৃদ্ধি হয় না৷ তিনি জন্মরহিত শাশ্বত, নিত্য এবং পুরাতন হলেও চিরনবীন। শরীর নষ্ট হলেও আত্মা কখনও বিনষ্ট হয় না।”
অর্থাৎ অর্জুন যে প্রতিপক্ষকে হত্যা করতে উপদিষ্ট, সেই প্রতিপক্ষের দেহস্থিত আত্মা অজর এবং অমর।
ফলত, অর্জুন শুধু ধ্বংস করতে পারে শত্রুর দেহটুকুই মাত্র, আত্মাকে ধ্বংস করতে সে অপারগ। এই যুক্তিকেই সন্দেহের চোখে দেখেন অমিয়। তাঁর মতে মহৎ শিল্প চায় সর্বাত্মক কল্যাণ। গীতা-বর্ণিত নিষ্কাম কর্মের প্রেরণাকে তিনি মহাভারতের ভ্রাতৃদ্বন্দ্বের চেয়ে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে চান। হত্যা কখনই মানবোচিত এক কর্তব্য হতে পারে না। বরং সংশয়ান্বিত ব্যক্তি হীন পথের বদলে শ্রমে ও সাধনায় সন্ধান করবেন অন্য প্রতিকারের— এই তার মনুষ্যোচিত ধর্ম। এই ধর্মে তাকে অবিচল থাকতে হবে। অন্যায় দিয়ে অন্যায়ের প্রতিকার নয়।
বরং ন্যায়ের নির্দ্বন্দ্ব উত্থান আমরা দেখতে চাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে। হিংসার বিরুদ্ধে হিংসা নয়, হিংসার বিরুদ্ধে অনড় নিবাত-নিষ্কম্প অহিংসা। এই যুক্তির কথা ভাবলে হয়তো আমরা অমিয় চক্রবর্তীর গান্ধী-প্রীতির এক সহজ ব্যাখ্যা পেতে পারি। যদিও তা এই লেখায় আলোচ্য নয়। সংশয় ও দ্বিধাকে ক্লীবত্বের সূচক হিসেবে দেখতে রাজি ছিলেন না অমিয়, বরং প্রচলিত অর্থে যা বীরত্ব— সেই বীরত্বের প্রতিই ছিল তাঁর উষ্মা ও বিরাগ। কারণ বীরত্ব খণ্ডিত সত্যের অধীন। অর্জুনের বিষাদ তাঁর ক্লীবত্বের চিহ্নক নয়, তা তাঁর শিল্পপ্রতিভার অচঞ্চল ছায়া। এই হল সমদর্শিতার বিজ্ঞান: পক্ষ ও প্রতিপক্ষ— দুইয়ের জন্যেই কল্যাণকামনা, ক্ষমা, করুণা ও প্রীতি।
জয়ের অলজ্জ অভিলাষের বদলে শান্তি ন্যায় ও সত্যের প্রতি সর্বাত্মক ঝোঁক। এই পৃথিবীতে যারা জয়ী— ব্যক্তি ও সমষ্টির প্রাণের বিনিময়ে যারা প্রতিষ্ঠা করেছে যুগোত্তীর্ণ সব সাম্রাজ্য— তাদের মধ্যেই বরং ক্লীবত্বের চিহ্নসমূহ চোখে পড়ে। সমদর্শিতার বিজ্ঞান তারা শিখতে পারেনি। জানতে পারেনি। ভেদবুদ্ধি ও জয়কামনা তাদের খণ্ডিত জীবনের দিকে নিয়ে গেছে— নিয়ে গেছে সম্প্রদায় দল ও পক্ষ-শাসিত জীবনের অভিমুখে। ইতিহাসে তাদের সাফল্যগীতি কীর্তিত হতে পারে, কিন্তু অখণ্ডতার সত্য থেকে তাদের বসবাস দূরে— সেই দূরত্বও অনতিক্রম্য। অন্যদিকে সামগ্রিক দৃষ্টি— সমদর্শিতা— দেখতে বাধ্য করে হিংসা ও যুদ্ধের নিষ্ফলতা।
মৃত্যুর পক্ষপাতহীন কারুণ্য। মহৎ কাব্যে— অমিয় চক্রবর্তী যাকে বলেছেন ‘শিখরকাব্য'— শেষপর্যন্ত সেখানেই সমদর্শিতার সর্বোচ্চতা ঘোষিত হয়। সগৌরবে।
