‘বাচ্চাদের ভাত খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। আমার আসতে একটু দেরি হবে, একটা নিউজ নিয়ে ব্যস্ত আছি।’ বৃহস্পতিবার রাতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় স্ত্রী আনন্দিতা সাংমাকে এ কথাই বলেছিলেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। কিন্তু সেই বের হওয়াই যে তাঁর শেষবারের মতো বাড়ি ছাড়া হবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি স্ত্রী। কিছুক্ষণ পরই দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ হারান তিনি। স্বামীকে হারিয়ে চার বছর বয়সী মেয়ে ও দেড় বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে আনন্দিতা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে নেত্রকোনার দুর্গাপুর পৌরসভার তেলনজিয়া এলাকায় একটি চায়ের দোকানের সামনে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির (৪৪) বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলা টেলিভিশনের নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন তিনি। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখির পাশাপাশি ভিডিও প্রকাশ করতেন।
স্বামীর মরদেহের পাশে ছোট ছেলেকে কোলে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আনন্দিতা সাংমা। তিনি বলেন, ‘এভাবে একজন মানুষকে কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলি করে মেরে ফেলবে, তা আমি কখনো ভাবতে পারিনি। বাচ্চাদের যখন ভাত খাওয়াচ্ছিলাম, তখন গুলির শব্দ পেয়ে প্রথমে ভেবেছিলাম, কেউ হয়তো পটকা ফুটাচ্ছে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মানুষ বলাবলি করল, তাকে মেরে ফেলেছে।’
স্বামী হত্যার বিচার দাবি করে আনন্দিতা বলেন, ‘আমি তো আমার স্বামীকে আর ফিরে পাব না। তবে যারা আমার স্বামীকে মেরেছে, আমার অবুঝ দুটি শিশুকে পিতৃহারা করেছে, পুলিশ তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনুক। তাদের কঠিন শাস্তি হোক, এটাই আমি চাই।’
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে তেলনজিয়ার একটি চায়ের দোকানে চা পান করেন লুৎফুজ্জামান। পরে বিরিশিরি উতরাইল বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। পথে নিজের মুঠোফোনটি দোকানে ফেলে যাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে আবার ফিরে আসেন। ফোন নিয়ে দোকান থেকে বের হওয়ার সময় দুই যুবক সেখানে এসে দোকানির কাছে সিগারেট চান। এরপরই লুৎফুজ্জামানকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়েন তাঁরা।
গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় লোকজন ছুটে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যান। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় লুৎফুজ্জামানকে উদ্ধার করে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
চায়ের দোকানি রবিন রাংসা জানান, লুৎফুজ্জামান চা পান করে চলে যাওয়ার সময় মুঠোফোন ফেলে যাওয়ায় আবার ফিরে এসেছিলেন। তিনি ফোন নিয়ে দোকান থেকে বের হওয়ার সময় দুই যুবক এসে সিগারেট চান। এর পরপরই তাঁকে গুলি করা হয়। রবিন রাংসা বলেন, তিনি পরপর চারটি গুলির শব্দ শুনেছেন। ভয়ে তিনি বাড়িতে চলে যান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের বয়স আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ বছর। তাঁদের একজনের পরনে লুঙ্গি এবং অন্যজনের পরনে প্যান্ট ছিল। গুলি করে তাঁরা পালিয়ে যান।
লুৎফুজ্জামানের শ্বশুরবাড়ির লোকজন জানান, ঘটনার কিছুক্ষণ আগে তাঁরা বাড়ির বারান্দায় বসে গল্প করছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে দোকানের কাছে গিয়ে লুৎফুজ্জামানকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। তখন তাঁর মাথা, গলা ও বুক থেকে রক্ত ঝরছিল।
নিহত সাংবাদিকের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের শুনই গ্রামে। তিনি মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে। বর্তমানে দুর্গাপুরের তেলনজিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন। প্রায় ছয় বছর আগে তেলনজিয়া গ্রামের শিলা সাংমা ও প্রয়াত ফিলিপ রাংসার মেয়ে আনন্দিতা সাংমাকে বিয়ে করেন তিনি। তাঁদের সংসারে চার বছর বয়সী মেয়ে প্রান্থি ও দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ান রয়েছে।
এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়েছিলেন লুৎফুজ্জামান। ওই সময় তাঁকে কুপিয়ে জখম করা হয়। তাঁর সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাঁকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়েছিল।
হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মাহফুজা খাতুন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম, দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ খান এবং দুর্গাপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাদাতসহ পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর জেলার সব থানাকে সতর্ক করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কাজ করছে পুলিশ।
পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে। ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত সাংবাদিকের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে এখন শোকের পাশাপাশি অনিশ্চয়তার মুখে দুই শিশুর ভবিষ্যৎ। যে বাবা সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে বাড়ি ফেরার কথা বলে বের হয়েছিলেন, তাঁর আর ঘরে ফেরা হলো না।
