বিএনপির একটি উদ্যোগে বদলে গেছে ভূমি অফিসের চিত্র। আর সেই বদলে ত্রাতার ভুমিকায় অটোমেশন সিস্টেম। যেখানে জমির খতিয়ান তোলা, নামজারি (মিউটেশন) সম্পন্ন করা কিংবা ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধ করা সাধারণ মানুষের কাছে ছিল মহাঝাকমারি সেই চিত্র বদলে দিয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। একসময় সময়সাপেক্ষ, জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া ছিল। যেমনটি বলছিলেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) এমদাদুল হক চৌধুরী। তিনি জানান, অটোমেশনের ফলে জনগণকে ভূমি সেবার পেতে এখন আর সরাসরি ভূমি অফিসে যেতে হয় না। ঘরে বসে বা অনলাইনেই এই সেবা পাওয়া যাচ্ছে। এতে দুর্নীতি যেমন কমেছে, সেবা প্রাপ্তিও সহজতর হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরেই দেশের মানুষ ভূমি অফিসের দুর্নীতি আর নীপিড়নে খেই হারিয়ে বসেছিল। তাদের জমির খাজনা দেওয়া ছিল একধরনের যন্ত্রণাময় অভিজ্ঞতা। তাই এক বিজ্ঞজন বলেছিলেন, আমি দুটি জিনিস আজও বুঝতে পারলাম না। তার একটি হচ্ছে জমি জিরাতের বিষয়। তবে বর্তমান সরকারের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবস্থা যা সাধারণ মানুষের কাছে জাদুর কাঠি হিসেবে উদয় হয়েছে।
বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারে এই ভুমিসেবা খাতকে প্রাধান্য দিয়েছিল। তাই ক্ষমতারোহণের পরপরই এই খাতকে দুর্নীতি মুক্ত করতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়। সেখানে ১৮০ দিনের যে কর্মসূচিতে এই খাতের উন্নয়ন তথা সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে কার্যকর এক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর ভিতের অন্যতম ছিল ভূমি প্রশাসনে ব্যাপক সংস্কার আর জনভোগান্তি কমানো। সরকার ইতোমধ্যেই এই ভূমি আইনের বেশ কিছু সংস্কার এনেছে। দেশের ভূমি অফিসগুলোতে হয়রানি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে এসেছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং ভূমি মন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুর সরাসরি তত্ত্বাবধানে জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা জোরালো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হন। ফলে অতি দ্রুততম সময়ে সারাদেশে বদলে গেছে ভূমি অফিসের চিত্র। ভূমি সেবার এই চিত্র অব্যাহত থাকলে নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন দিনের সূচনা হবে। যেখানে বিগত দিনগুলোতে ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের হয়রানির চিত্র খুবই ভয়ংকর আর ভয়াবহ ছিল।
অফিসের ভেতরের অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং বাইরের দালাল মিলে একটি সিন্ডিকেট গড়ে সাধারণ মানুষের অর্থ লোপাট করতো। এই চক্র ১,১৫০ টাকার নামজারিতে কোন কোন ক্ষেত্রে ৭০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করে তা আদায়ও করেছে। যেখানে সরকারি ফি’র মাত্র ১,১৫০ টাকা সরকারি ট্রেজারিতে জমা হলেও বাকী অর্থ এই সব সিন্ডিকেট চক্রের পকেটে উঠত। এমন ভাবে অর্থ ভাগ হতো যা শুনলে শিউরে উঠতে হয়। একটি নামপত্তনে তফশিলদার ৩০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ হিসেবে আদায় করতো।
সব কাঙ্ক্ষিত ঘুষ না দিলে নাজেহাল করা হতো এমনকি ফাইল আটকে একধরনে চাপ সৃষ্টি করা হতো। ঘুষ না দিলে কাগজপত্র ঠিক থাকলেও ভুল আছে, অসম্পূর্ণ বলে ফেরত দেওয়া হতো। দালালের মাধ্যমে আবার সরাসরি দাবি করা টাকা দেওয়া না হলে পরিকল্পিতভাবে ভুল তদন্ত রিপোর্ট পাঠিয়ে সেবা গ্রহিতাকে নাজেহাল করার দৃষ্টান্ত হরহামেশায় ঘটতো।
সম্প্রতি ঢাকা বিভাগের নরসিংদী জেলার বেলাবো উপজেলায় এক ব্যক্তি ২ শতাংশ জমির নামজারির জন্যে ৪ বার আবেদন করেও তা বাতিল করার নজির রয়েছে। যদিও তার কাগজপত্র সবই ঠিক ছিল। এরপর সেবাগ্রহিতা বাধ্য হয়েই দালালের মাধ্যমে সেই নামজারি করতে সক্ষম হন। এজন্য তাকে গুণতে হয়েছে সত্তর হাজার টাকা। আর সেটি করতে ৫ বারের পর দালাল মারফত এই সামান্য কাজটি করতে হয়েছে। এরকম কাণ্ড দেশের সব ভূমি অফিসেই ঘটেছে। বর্তমানে ডিজিটাল সিস্টেম চালু হলেও থেমে নেই দালালচক্রের কালোহাত আর দুর্নীতিবাজ ভুমিকর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড। বিষয়টি সংসদেও উঠেছে।
সংসদের গতঅধিবেশনে বিএনপির এমপি সুলতানা আহমেদ প্রশ্ন তুলেছেন, শতভাগ ই-নামজারি চালুর পরও ঘুষ ছাড়া এখনও ফাইল নড়ে না কেন। উল্লেখ্য, সমস্ত ভূমি সেবায় অনলাইন সিস্টেম চালু হলেও ইউনিয়ন ভূমি সহকারীকর্মকর্তার চূড়ান্ত প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক। এই জায়গাটাকেই অনেকে টাকা আদায়ের হাতিয়ার বানাচ্ছেন। এদিকে গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে ঘুষ ছাড়া কোনো দলিল রেজিস্ট্রি হতো না। আবার অসৎ গ্রাহকের কাগজপত্রে যাই থাকুক ফ্রেশ জমিকে ডোবা, নালা, পতিত দেখিয়ে বাড়তি ঘুষ নেওয়া ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। দালাল চক্রের মাধ্যমে নাস্তা খরচ, ম্যানেজ ফি, সহযোগিতা ফির নামে অতিরিক্ত টাকা আদায়ও যেন নিয়মে পরিণত হয়েছিল। এ অবস্থার পাশাপাশি নামজারি, খাজনা, পর্চা উত্তোলনের জন্য মাসের পর মাস ঘুরতে হতো সেবা প্রত্যাশিদের। মামলা-মোকদ্দমা, দালালচক্র, দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতির কারণে গ্রামের সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হতেন।
প্রধানমন্ত্রী নিজেও এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন কেবিনেট মিটিংয়ে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে একদিকে শহরগুলোতে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হয়েছে, অন্যদিকে তৃণমূলে দুর্নীতি এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ভূমি অফিসগুলোতে ডিজিটাল হয়েছে শতকরা ৮০ ভাগ কাজ, এখন অধিকাংশ সেবা ডিজিটাল ফর্মে সম্পন্ন হচ্ছে। এতে অনিয়মের সুযোগ কমেছে।
নামজারি, খাজনা, খতিয়ান এখন ঘরে বসে আবেদন ও ট্র্যাক করা যায়। সম্প্রতি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান মিয়া বলেন, ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনায় কোনো গাফিলতি সহ্য করা হবে না, অবহেলা প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে সরকার একটুও বিলম্ব করবে না। এজন্য সেবা গ্রহিতাদের সেবা নিশ্চিতকরণে সরকার ১৬১২২ হটলাইন চালু করেছেন। এছাড়াও ভূমিসেবায় অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সিস্টেম চালু হয়েছে, যেখানে অভিযোগ দিলে এসএমএস-এ ফিডব্যাক দেওয়া হচ্ছে।
সরকার ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ভুয়া দলিল, হেবা, খতিয়তনামা, রেজিস্ট্রেশন বিহীন, জাল দলিল, ক্ষমতার অপব্যবহারে করা দলিল বাতিল করে নতুন বিডিএল ল্যান্ড সিস্টেম চালু করেছে। এসি ল্যান্ড বদলিতে লটারি সিস্টেম ইতোমধ্যেই চালু হয়েছে। এই প্রতিবেদক কিশোরগঞ্জ জেলার ভূমি অফিসগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন।
প্রথম ধাপে নিকলী উপজেলার ভূমি অফিসগুলোর চিত্র ইতিবাচকই দেখেছেন। সরকারে এই গণমুখী পদক্ষেপের ফলে ইদানিং দালাল গা ঢাকা দিয়েছে। তাদের দৌরাত্ম আগের মত সেভাবে সামনে আসছে না। এদিকে সেবা প্রত্যাশীরা ও বেশ দীর্ঘদিনের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে সন্তষ্টি প্রকাশ করেছে। সরকারের এই সেবা দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরা। যিনি একই একই সঙ্গে উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবেও দায়িত্বে রয়েছেন। তার আমলে মাত্র ৩ মাসে তিনি এমন সাফল্য দেখিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন।
তিনি নিজে সৎ থেকে ভূমিসেবায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ডিজিটাল ভূমিসেবায় বড় ভূমিকা রেখেছেন। জনবান্ধব প্রশাসনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি নিজেকে একজন সৎ ও পরিশমী অফিসার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন। তার সাফল্যের বিষয়টি এখন এলাকাবাসীর মুখে মুখে। তার সাহসী পদক্ষেপে দ্রুত নামজারি নিষ্পত্তি, নিয়মিত মাঠ পর্যায়ের তদারকি ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা জনগণের দুয়ারে পৌঁছে গেছে।
তিনি নিজে সৎ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহিত করেছেন। তাই সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে এই উপজেলার ভূমি সেবা নতুন স্তরে প্রবেশ করেছে। নিকলী উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রমে গতিবৃদ্ধিই-নামজারি ই-মিউটেশন কার্যক্রমে সফলতা ও সরকারি ভূমি (খাস জমি) উদ্ধারেকার্যকর পদক্ষেপ এবং সাধারণ মানুষের হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিতে নিরলসভাবে কাজ করে তিনি এখন জনসাধারণের প্রশংসায় ভাসছেন।
নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরা দৈনিক বাংলাদেশের আলো’র প্রতিনিধির সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় বলেন, ভূমি প্রশাসনকে জনবান্ধব করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার আমাদের যে নীতিমালা ও নির্দেশনা দিয়েছেন সেটি বাস্তবায়নের জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি। এক্ষেত্রে ডিসি মহোদয় আমাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা এবং সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি জানান, এই উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসেই এখন অনেকখানি স্বস্তি ফিরেছে এবং ভূমি সেবা প্রত্যাশীরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি সন্তুষ্ট। নিকলীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি উপজেলা ভূমি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্বে থেকে এই মহাযজ্ঞ সুন্দর ভাবে সামলাচ্ছেন।
তিনি বলেন, কাজকে কাজ হিসেবে নিলে সেটি চ্যালেঞ্জের পর্যায়ে থাকে না। যখন আপনি নিজে সৎ থাকবেন তখন সব চ্যালেঞ্জই আপনার কাছে সহজ আর উদ্দীপনা হিসেবে চিহ্নিত হবে। তাই আমি বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হিসেবে না দেখে নিজের দায়িত্ব বলেই মনে করছি। আর এই দায়িত্ব পালন করা আমার জন্য একই সঙ্গে পদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর আমিও নিজে পরিশ্রমের মাধ্যমে জনসন্তুষ্টি নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। ভূমি অফিসের সেবামূলক কর্মকাণ্ডগুলোকে আরো বেশি জনবান্ধব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই আমি নিজের এই অতিরিক্ত শ্রমকে সার্থক মনে করব যোগ করেন তিনি।
কথা হয় উপজেলার গুরুই ইউনিয়ন ভূমি সহকারি কর্মকর্তা মাহফুজুল হাসানের সঙ্গে। তিনি বাংলাদেশের আলো’কে বলেন, আমাদের বর্তমান ইউএনও একজন সৎ ও স্বচ্ছতার প্রতীক। এদিকে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ভূমি অফিসে স্বার্থান্বেষী বহিরাগতদের প্রকাশ্যের নানামুখী অনুচিত কর্মকাণ্ড এখন কমের দিকে। বর্তমান ইউএনও স্যার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ভূমি অফিসেও সমান গুরুত্ব দিয়ে এসি ল্যান্ডের দায়িত্ব পালন করছেন। তার বিচক্ষণ নেতৃত্ব ও পর্যবেক্ষণে আমরা আমাদের অভিভাবক খুঁজে পেয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে যে শূন্যতা আমাদের কর্মক্ষমতাকে টুটি চেপে ধরেছিল। তাই বর্তমানে এই উপজেলার সকল ইউনয়ন ভূমি অফিস এখন দালাল মুক্ত আর সেবা গ্রহিতারা পাচ্ছেন তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা।
বিআলো/অর্নব