সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে কওমি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিশুদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আলেম সমাজের সামাজিক ভূমিকা বর্তমানে গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। একদিকে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের আশ্রয় ও শিক্ষার বিকল্পহীন সামাজিক ব্যবস্থা, অন্যদিকে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে শিশুদের ওপর ঘটে চলা যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতন; আর এই দুইয়ের মাঝে আলেম সমাজের নীতিগত অবস্থান এবং জবাবদিহিতা—সব মিলিয়ে বিষয়টি এক জটিল ও সংবেদনশীল সামাজিক সমীকরণ তৈরি করেছে।
১. অর্থনৈতিক বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্পহীনতা
বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলো টিকে থাকার পেছনে অন্যতম প্রধান সামাজিক চালিকাশক্তি হলো দেশের অর্থনৈতিক বেইনসাফি ও অসমান শিক্ষা ব্যবস্থা।
দরিদ্র পরিবারের আশ্রয়স্থল: মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক খরচ কেবল বিদ্যালয়ের বেতনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; প্রাইভেট টিউটর, গাইড বই এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ একজন নিম্নবিত্ত বা দিনমজুর অভিভাবকের সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়। এর বিপরীতে, বহু কওমি মাদ্রাসা বিনামূল্যে থাকা, খাওয়া ও শিক্ষার সুযোগ দেয়।
রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত দুর্বলতা: একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে প্রতিটি শিশুর আবাসন, খাদ্য এবং নিরাপদ শিক্ষার ভার নেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের অপ্রতুলতার কারণে দরিদ্র বাবা-মা নিজ সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যতের বিকল্প না পেয়ে জীবন ধারণ ও শিক্ষার জন্য কওমি ব্যবস্থাগুলোর ওপর বাধ্য হয়ে নির্ভর করেন।
২. শিশু নির্যাতন, ধর্মীয় নীতি ও আলেম সমাজের নীরবতা
পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর বিধান অনুযায়ী, শিশুদের ওপর যেকোনো ধরনের সহিংসতা ও বলাৎকার কেবল মারাত্মক অপরাধই নয়, বরং চরম সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়।
আদর্শিক বৈপরীত্য: ইসলাম ধর্মে শিশুদের নিরাপত্তা, তাদের প্রতি স্নেহ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা ইমানের মৌলিক অংশ। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্মীয় লেবাসধারী বা শিক্ষকের ছদ্মবেশে থাকা অপরাধীদের হাতে শিশুরা পাশবিকতার শিকার হচ্ছে।
প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতা ও প্রতিরক্ষা মনোভাব: অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আলেম সমাজের একটি প্রভাবশালী অংশের মধ্যে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের আত্মরক্ষামূলক বা নির্লিপ্ত মনোভাব দেখা যায়। অপরাধকে ঢেকে রাখার চেষ্টা কিংবা অপরাধীদের সামাজিকভাবে পার পাইয়ে দেওয়ার প্রবণতা সার্বিকভাবে পুরো আলেম সমাজের ওপর মানুষের আস্থা ও ভালোবাসাকে সংকটে ফেলে।
নৈতিক দ্বিমুখী নীতি: সাধারণ বিষয়াবলীতে কঠোর ফতোয়া প্রদান করা হলেও, নিজের গোষ্ঠীর ভেতরের গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হওয়া আলেম সমাজের নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
৩. সমাধান ও ভবিষ্যতের করণীয়
একটি নিরাপদ সমাজ ও মানবিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য একক কোনো পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; বরং রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সকল স্তর থেকে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
(ক) আলেম সমাজের অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও জবাবদিহিতা
আলেম সমাজকে অপরাধীদের ব্যক্তিভিত্তিক পরিচয় বিবেচনা না করে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করতে হবে।
অপরাধীকে আড়াল করার অপচেষ্টা বন্ধ করে, অপরাধ প্রমাণ সাপেক্ষে আইনের আওতায় আনা এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তোলা আলেমদের নৈতিক দায়িত্ব।
(খ) প্রাতিষ্ঠানিক শিশু সুরক্ষা সেল ও নজরদারি
প্রতিটি ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের অভিযোগ জানানোর জন্য একটি নিরপেক্ষ, গোপনীয় ও নিরাপদ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই ও নৈতিকতার মানদণ্ড নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
(গ) সামাজিক নিরাপত্তা ও সরকারের দায়িত্ব
রাষ্ট্রকে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মানসম্মত ও বিনামূল্যে মূলধারার শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে কোনো অভিভাবককে অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে শিশুর নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে না হয়।
শিশু সুরক্ষায় প্রচলিত আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক তদারকি বৃদ্ধি করতে হবে।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ঐতিহ্য ও সুনাম রক্ষা করা কেবল বাইরে থেকে আসা কোনো ষড়যন্ত্র ঠেকানোর ওপর নির্ভর করে না; বরং নিজেদের ভেতরের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং নৈতিক উচ্চতা বজায় রাখার ওপরই নির্ভর করে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণে রাষ্ট্র, সুশীল সমাজ ও আলেমদের যৌথ দায়বদ্ধতার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিবিদ