একটি দেশের তরুণেরা কোন ভাষায় প্রতিবাদ করছেন, তা দেখে সেই দেশের রাজনীতির স্বাস্থ্য কিছুটা আন্দাজ করা যায়। ভারতে এখন সেই ভাষা ক্ষুব্ধ বক্তৃতা নয়, একটি ব্যঙ্গ। যে পোকাকে ঘৃণা করে তাড়ানো হয়, সেই তেলাপোকার নামেই দাঁড়িয়েছে একটি ‘জনতা পার্টি’। এক মাসের মধ্যে সমাজমাধ্যমে তার অনুসারী দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ২০ লাখে, যা ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রায় ৯০ লাখ অনুসারীর চেয়ে অনেক বেশি। অথচ এর শুরুটা ছিল একটি রসিকতা মাত্র।
এই লেখায় আমরা ‘মোদি যাবেন কি যাবেন না’ প্রশ্নে যাচ্ছি না। সেটা ভারতের ভোটারদের বিষয়। আমাদের আগ্রহ অন্য জায়গায়। আন্দোলনটি যে তিনটি অনুপস্থিতির হিসাব চাইছে, সেগুলো শুধু ভারতের নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি আয়না। অনুপস্থিতিগুলো হলো প্রশ্নপত্রের স্বচ্ছতা, কাজের সুযোগ এবং তালিকায় নাম।
রসিকতা থেকে রাজনীতি
আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে ৩০ বছর বয়সি, বোস্টন বিশ^বিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর। তিনি দলটি শুরু করেছিলেন একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন সমষ্টি হিসেবে। বেকার তরুণদের ‘পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করা একটি মন্তব্যই ছিল তার স্ফুলিঙ্গ। অপমানটাকে তরুণেরা নিজেদের পরিচয় বানিয়ে নিলেন। ঠিকানাহীন, সদর দপ্তরহীন, অনলাইনে গড়ে ওঠা এই দল তাই প্রচলিত রাজনৈতিক সংগঠনের ছকে পড়ে না।
মে মাসে নিট (ঘঊঊঞ) পরীক্ষার জন্য নিবন্ধন করেছিলেন ২২ লাখ ৭৫ হাজার জন, পরীক্ষায় বসেছিলেন ২২ লাখ ৫ হাজার। প্রশ্নফাঁসের পর পরীক্ষা বাতিল হয় এবং জুনে প্রায় ২০ লাখ আবার পরীক্ষায় বসেন। হিসাবটা একবার ভাবুন। এক বছরের পরিশ্রম, কোচিংয়ের খরচ আর পরিবারের সঞ্চয় নিয়ে প্রায় ২০ লাখ তরুণ-তরুণী দ্বিতীয়বার একই পরীক্ষার ঘরে ঢুকেছেন।
এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানে পাঁচ বছরে ১৫ রাজ্যে ৪১টি নিয়োগ-পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ধরা পড়েছে। যে ব্যবস্থায় একটি সরকারি চাকরিই মধ্যবিত্ত হওয়ার প্রায় একমাত্র সিঁড়ি, সেখানে প্রশ্নফাঁস মানে সিঁড়িতে করাত চালানো। তরুণেরা সেটা বুঝেছিলেন বলেই চাপ কাজ করেছে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। এটা আন্দোলনের প্রথম বড় প্রাপ্তি। কিন্তু প্রথম জয় প্রায়ই আসল প্রশ্নটাকে আড়াল করে। প্রশ্ন ছিল, কাগজ ফাঁস হলো কেন? আর এর চেয়েও বড় প্রশ্ন, এই কাগজের জন্য এত মরিয়া হতে হচ্ছে কেন?
উত্তরটা শ্রমবাজারের পরিসংখ্যানে লেখা আছে। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের বেকারত্বের হার ২০২৬ সালের জুনে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ২ শতাংশে, যা ২০২৫ সালের এপ্রিলের ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেশি এবং মাসিক জরিপ শুরুর পর সর্বোচ্চ। সবচেয়ে অস্বস্তিকর তথ্য হলো, একই সময়ে তরুণদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৪২ দশমিক ৭ থেকে নেমে ৪০ দশমিক ৩ শতাংশে এসেছে। সাধারণত অংশগ্রহণ কমলে বেকারত্বের হারও কমে, কারণ হতাশ মানুষ খোঁজা ছেড়ে দেয়। এখানে দুটোই একসঙ্গে বেড়েছে। অর্থাৎ কাজ এতই দুর্লভ যে খোঁজা ছেড়ে দিয়েও সংখ্যা ভালো হচ্ছে না।
আরও কিছু সংখ্যা : ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের ২৫ শতাংশ কর্মে, শিক্ষায় বা প্রশিক্ষণে নেই, আর আনুষ্ঠানিক কারিগরি প্রশিক্ষণ পেয়েছেন মাত্র ৫ শতাংশ। আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ সালে ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সি ৬ কোটি ৩০ লাখ স্নাতকের মধ্যে ১ কোটি ১০ লাখ বেকার ছিলেন।
আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্ব এই জায়গাতেই। নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে সংখ্যার লড়াইটা সবচেয়ে জটিল, তাই এখানে দুই পক্ষের কথাই সামনে রাখা জরুরি।
কমিশনের যুক্তি, ভোটার তালিকায় মৃত, স্থানান্তরিত ও দ্বৈত নাম থাকা একটি পুরোনো সমস্যা, আর তালিকা পরিষ্কার করা তার সাংবিধানিক দায়িত্ব। ২০২৬ সালের ২৭ মে সুপ্রিম কোর্ট এসআইআরের সাংবিধানিক বৈধতা বহাল রেখেছেন। কমিশন আরও বলছে, আলোচিত ১৩ কোটির সংখ্যাটি খসড়া তালিকার ‘অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, মৃত বা দ্বৈত’ চিহ্নিত নামের হিসাব, চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়া নামের সংখ্যা নয়। বিজেপির দাবি, এর মধ্যে ২ কোটি ৮০ লাখ নাম মৃত ব্যক্তির।
বিরোধীদের প্রশ্নও তুচ্ছ নয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ গেছে, যার মধ্যে ৬ কোটি ৩০ লাখ স্থানান্তরিত এবং ৩ কোটি অনুসন্ধানের অযোগ্য। কংগ্রেস জানতে চেয়েছে, মৃতের হিসাব বাদ দিলে বাকি ১০ কোটি ২০ লাখ নামের কী হলো? দিল্লিতে সংশোধনের আগের ভোটারদের প্রায় ৩৩ শতাংশ খসড়া তালিকার বাইরে, মহারাষ্ট্রে বাদ গেছে ২ কোটি ৬ লাখ, উত্তরপ্রদেশে ২ কোটি ৪ লাখ। ভারতে ভোটযোগ্য প্রাপ্তবয়স্কের আনুমানিক সংখ্যা ৯৭ থেকে ৯৯ কোটি। সেই হিসাবে প্রতি সাত-আটজনে একজনের নাম প্রশ্নের মুখে।
আইনি পরিস্থিতিও সরল নয়। এক বিশ্লেষণ মনে করিয়ে দিচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের মে মাসের রায় অনুযায়ী, যোগ্যতার শর্ত পূরণ না হওয়ায় তালিকা থেকে বাদ পড়া মানে আইনত নাগরিকত্ব হারানো নয়। কিন্তু একজন দিনমজুর বা বিবাহিত নারী, যাকে বাপের বাড়ির কাগজ জোগাড় করতে হয়, তার কাছে এই আইনি সূক্ষ্মতা কতটা সান্ত¡না?
রাষ্ট্রের উত্তর : ব্যারিকেড
১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে সমাবেশের আগে সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর বরাতে খবর এসেছে, পুলিশ ৫ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করেছে। আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও দুই নেতাকে বিমানবন্দরেই আটক করা হয়। পরদিন আদালত তাদের ৫০ হাজার রুপির মুচলেকায় মুক্তি দেন এবং এক বছর শান্তি বজায় রাখার নির্দেশ দেন। তার তিন দিন পর দুই নেতাকে অনধিকার প্রবেশের অভিযোগে পাঁচ দিনের কারাদ- দেওয়া হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ‘খেয়ালখুশিমতো আটক’ সবার নিঃশর্ত মুক্তি চেয়েছেন। আর বিজেপির সভাপতি বিরোধীদের বিরুদ্ধে উত্তেজনা উসকে দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন।
এই সংকট থেকে বেরোনোর পথ ভারতের মতো বড় ও জটিল গণতন্ত্রের জন্য দাবি-পাল্টা দাবির এই অচলাবস্থা বিপজ্জনক। আমাদের মতে বেরোনোর পথ চারটি।
প্রথমত, নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনি এলাকাভিত্তিক বাদ পড়া নামের তালিকা, কারণসহ, মেশিন-রিডেবল আকারে প্রকাশ করতে হবে। স্বাধীন নিরীক্ষক বা আদালত-নিযুক্ত প্যানেল তা যাচাই করবেন। ‘কত নাম গেছে’ নিয়ে বিতর্ক থামবে কেবল তখনই, যখন ‘কার নাম কেন গেছে’ দেখা যাবে।
দ্বিতীয়ত, আপিলব্যবস্থাকে সহজ করতে হবে। যার নাম বাদ পড়েছে, তাকে বাপের বাড়ির পুরোনো কাগজ খুঁজতে বাধ্য না করে বিকল্প প্রমাণ গ্রহণ করতে হবে। নারী, শ্রমিক ও অভিবাসী মানুষের জন্য সেটা বিশেষভাবে জরুরি।
চতুর্থত এবং সবচেয়ে কঠিন, কাজ। প্রশ্নফাঁস বন্ধ হলেও যদি সরকারি চাকরির একটি পদের জন্য হাজার হাজার প্রার্থী লড়তে থাকেন, তাহলে পরের পরীক্ষায়ও একই তাড়না থাকবে।
আমাদের শিক্ষা
ভারতের ঘটনাকে আমরা প্রতিবেশীর ঘরের আগুন ভেবে দূর থেকে দেখতে পারি। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশই কমবেশি একই প্রশ্নের মুখে। পরীক্ষা কি সবার জন্য সমান? ভোটের তালিকায় নাম থাকা কি নিশ্চিত? রাষ্ট্র কি তরুণদের কথা শোনে, নাকি কেবল তাদের গুনে দেখে?
তেলাপোকার এই বিদ্রƒপের ভেতরে একটি গভীর গণতান্ত্রিক সত্য লুকিয়ে আছে। মানুষ যখন আর বিশ্বাস করে না যে তার কথা শোনা হবে, তখন সে ঠাট্টা করে। ঠাট্টাও যখন থামানো হয়, তখন সে হয় চুপ করে যায়, নয়তো আরও জোরে ফেটে পড়ে। কোনোটাই কোনো রাষ্ট্রের জন্য ভালো নয়।
ভারতের নির্বাচন কমিশন, সরকার ও আদালতের সামনে এখন একটি সহজ পরীক্ষা : অনুপস্থিতির হিসাব খাতায় তুলে দেখানো। যে রাষ্ট্র নিজের নাগরিকের নাম, কাজ আর কাগজের হিসাব স্বচ্ছভাবে দিতে পারে, তাকে ব্যারিকেডের আড়ালে লুকাতে হয় না।
