ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। নির্বাচনী তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে দলটির ডাকা বিক্ষোভ ঘিরে শনিবার রাজধানীতে ব্যাপক ধরপাকড় ও নিরাপত্তা বিধিনিষেধের পর গতকাল রবিবারও বিক্ষোভ, আটক ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের ঘটনা ঘটেছে। সিজেপির নেতারা বলেছেন, তাদের আন্দোলন মাত্র শুরু হয়েছে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন তারা।
বিক্ষোভ দমনে দিল্লি পুলিশের ব্যাপক তৎপরতা, হাজারো মানুষকে আটক এবং চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর)। তবে জাতিসংঘের এ উদ্বেগ প্রত্যাখ্যান করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এ ধরনের বক্তব্য দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অগ্রহণযোগ্য হস্তক্ষেপ। অন্যদিকে বিক্ষোভ ঘিরে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়ে ভারতের সুপ্রিমকোর্ট বলেছেন, সংবিধানের ১৯ (২) অনুচ্ছেদে নির্ধারিত শর্ত মেনেই এ ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে। আদালত দিল্লিতে মেট্রো ও রেল চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং ইন্টারনেট সেবা নির্বিঘ্ন রাখারও নির্দেশ দিয়েছেন।
রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে সিজেপি নেতা আশুতোষ রাঙ্কা বলেন,
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ‘লজ্জিত হওয়া উচিত’। তাদের কারণে পরিস্থিতি ‘যুদ্ধের মতো’ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। দলের নেতারা জানান, শনিবার দিল্লিতে পৌঁছানোর পর বিমান থেকেই তাদের আটক করা হয়েছিল। পরে মুক্তি পেলেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন তারা।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে রবিবার সকালে মুক্তি দেওয়া হয়। শনিবার সকালে মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছানো এয়ার ইন্ডিয়ার একটি উড়োজাহাজ থেকে তাদের আটক করা হয়েছিল। রবিবার দিল্লি ক্যান্টনমেন্ট থানায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার পর তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। সিজেপির আইনবিষয়ক প্রধান রত্না সিং জানান, এক বছরের মধ্যে শান্তিভঙ্গ না করার শর্তে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
মুক্তির পর সংবাদ সম্মেলনে রাঙ্কা ও দাস অভিযোগ করেন, আটকের সময় পুলিশ তাদের মুঠোফোন জোর করে নিয়ে যায় এবং ২৪ ঘণ্টা নিজেদের হেফাজতে রাখে। ফোন জব্দের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তারা।
রবিবারও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের আটক করা হয়। দিল্লির কনট প্লেসের এন ব্লক থেকে যন্তর মন্তরের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় প্রায় ৬০ জনকে আটক করে পুলিশ। এর পর যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় আবার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যদের সেখানে পাঠানো হয় এবং সংসদ মার্গে প্রবেশে পুনরায় বাধা দেওয়া হয়।
রাজীব চক মেট্রোস্টেশনেও বিক্ষোভকারীরা জড়ো হন। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরার আহ্বানে রামকৃষ্ণ আশ্রম এলাকায় লোকজন জড়ো হলেও তিনি সমর্থকদের নিয়ে কনট প্লেসের দিকে মিছিল করেন। পরে দিল্লি পুলিশ তাকে আটক করে। রবিবার কনট প্লেস থেকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্ক্সবাদী) রাজ্যসভার সদস্য জন ব্রিটাসকেও আটক করা হয়।
দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপকভাবে আটকের ঘটনায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিক্ষোভকারী, আয়োজক, নাগরিক সমাজের সদস্য, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের আটক করার খবরের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে দপ্তরটি ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি বিক্ষোভকারীদের উদ্বেগের সমাধানে অর্থবহ সংলাপে বসার পরামর্শ দিয়েছে।
তবে জাতিসংঘের এ উদ্বেগ প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। রবিবার এক বিবৃতিতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ভারতের সংবিধান শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করে। তবে জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার স্বার্থে এ অধিকারের ওপর যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপ করা যায়।
দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে চলাচলে বিধিনিষেধ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে করা আবেদনের শুনানিতে রবিবার ভারতের সুপ্রিমকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে স্বাভাবিক মেট্রো ও রেল চলাচল নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ইন্টারনেট সেবা নির্বিঘ্ন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ বলেন, সংবিধানের ১৯ (২) অনুচ্ছেদে নির্ধারিত জনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই জনসমাবেশ ও চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে। এ অনুচ্ছেদে জনশৃঙ্খলাসহ নির্দিষ্ট কিছু কারণে বাক্?স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ রয়েছে।
আদালত বলেন, জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় আইন অনুযায়ী বিধিনিষেধ আরোপের প্রয়োজন না হলে মেট্রো ও রেল চলাচল স্বাভাবিক রাখতে হবে। শহরে যান চলাচলসংক্রান্ত বিধি মেনে মানুষের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করারও নির্দেশ দেন বেঞ্চ। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও যান চলাচলের অবস্থা বিবেচনায় ব্যারিকেডের প্রয়োজনীয়তা অবিলম্বে পর্যালোচনা করতে বলেন।
