Published on
:
2 min read
এই সময়: বারবার জুটেছে প্রত্যাখ্যান! চাকরির ইন্টারভিউয়ে ডাক পেলেও চূড়ান্ত তালিকায় নাম ছিল না, বা বলে দেওয়া হয় যে, তাঁর মতো উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীকে নেওয়ার জায়গা নেই। রাজ্যের কলেজ সার্ভিস কমিশন থেকে শুরু করে দেশ ও রাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাকেন্দ্রে অন্তত কুড়ি-বাইশ বার এমন অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। এ সব সত্ত্বেও অদম্য মেধা ও অধ্যবসায়ের জোরে তিনি আজ বিশ্বের শীর্ষ দু’শতাংশ বিজ্ঞানীদের তালিকায় নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছেন। একেবারে নিজের উদ্যোগে। নিজের পকেটের পয়সা, শ্রম ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে।
তিনি নীলাঙ্কুশ আচার্য, ব্যারাকপুরের নোনাচন্দনপুকুর মন্মথনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক। চলতি বছর স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত বিশ্বের সেরা ২ শতাংশ বিজ্ঞানীদের তালিকায় নীলাঙ্কুশের নাম জ্বলজ্বল করছে।
২০০৬–এ উচ্চমাধ্যমিক, ২০২০–তে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ। এর পরে শুরু নীলাঙ্কুশের লড়াই। কোনও পরীক্ষাগার বা সরকারি আর্থিক অনুদান ছাড়াই বাড়িতে বসে ল্যাপটপ ও বইপত্রের সাহায্যে নিরলস গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর কথায়, ‘স্কুলে পড়ানোর ফাঁকে ছাত্ররা যখন বসে থাকে, আমি তখনও পড়াশোনা করে নিই। রাত দুটো-আড়াইটে পর্যন্ত নিরিবিলিতে কাজ চলে।’
তাঁর গবেষণার মূল বিষয় — অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণা ও তরলের গতিবিদ্যার গাণিতিক প্রতিরূপ তৈরি করা। সহজ করে বললে, সাধারণ তরলে অতি ক্ষুদ্র ধাতব কণা বা কার্বন অণু মিশিয়ে এমন এক অভিনব মিশ্রণ তৈরি করা হয়, যা অত্যন্ত উন্নত শীতলকারক পদার্থ হিসেবে কাজ করে। এর একটি যুগান্তকারী প্রয়োগ রয়েছে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে। ক্যান্সারের ক্ষেত্রে প্রথাগত রাসায়নিক চিকিৎসার বদলে নির্দিষ্ট স্থানে প্রয়োগ পদ্ধতির মাধ্যমে শুধুমাত্র আক্রান্ত কোষেই ওষুধ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এর ফলে মানবদেহের সুস্থ কোষগুলোর কোনও ক্ষতি হয় না এবং রোগীর কষ্ট অনেকাংশে লাঘব হয়।
গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় বই বা গবেষণাপত্র জোগাড় করতে গিয়েও তাঁকে প্রবল প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়েছে। দেশের নামী-দামি অধ্যাপকদের কাছে বারংবার সাহায্য চেয়েও তিনি নিরাশ হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ইন্টারনেটের মাধ্যমে মরক্কোর এক অধ্যাপকের থেকে তিনি প্রয়োজনীয় বইয়ের সাহায্য পান। ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক স্তরে তাঁর ৬০টি গবেষণাপত্র এবং পাঁচটি বইয়ের অধ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। আক্ষেপের সুরে নীলাঙ্কুশ বলেন, ‘বিশ্বের অন্যতম সেরা গবেষণাপত্রিকা থেকে সম্পাদকের কাজের প্রস্তাব এলেও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় না–থাকায় তা হাতছাড়া হয়েছে, কারণ স্কুল শিক্ষকের পরিচয় তারা গ্রাহ্য করে না। বাইরের দেশের লোকেরা যখন অবাক হয়ে বলে তোমার এত ভালো বায়োডেটা, তবুও তুমি একটি বিশ্ববিদ্যালয় পাচ্ছ না কেন, তখন আমার কাছে উত্তর দেওয়ার মতো কোনও জায়গা থাকে না।’ নীলাঙ্কুশের কথায়, ‘আমার ফিল্ডে আমি রয়েছি দ্বিতীয় র্যাঙ্কে। সারা পৃথিবীতে রয়েছি ৩০ নম্বরে।’
৩৬ বছর বয়সি এই লড়াকু গবেষকের নিত্যদিনের সঙ্গী তাঁর ৭৫ বছর বয়সি অবসরপ্রাপ্ত বাবা এবং স্ত্রী। শত প্রত্যাখ্যান আর বঞ্চনার পরেও বাবার অবিরাম অনুপ্রেরণা তাঁকে প্রতি মুহূর্তে লড়াইয়ের সাহস জুগিয়েছে। নীলাঙ্কুশ স্বপ্ন দেখেন, ‘আমার মতো যাঁরা রয়েছেন, যাঁরা সত্যি একটা সুযোগের জন্য অপেক্ষা করছেন, তাঁদের সঙ্গে আমি একজোট হয়ে কাজ করতে চাই।’
