
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, আগামীর মুক্ত, বৈষম্যহীন, ন্যায়-ইনসাফ ও আমাদের যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন এলডিপির প্রেসিডেন্ট ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম; এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি; জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার; এবি পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ; বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, এডভোকেট মোয়াযযম হোসাইন হেলাল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি ও মোবারক হোসাইন; ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি; ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন; শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি এডভোকেট আতিকুর রহমান; শহীদ জাবের ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম এমপি; সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মোহাম্মদ মনির ও আইনজীবী ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির; জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মোহাম্মদ কামাল হোসেন এমপি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এলাহী নেওয়াজ খান সাজুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি ও ড. মো. রেজাউল করিম।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের পর ২০২৪ সালে এ দেশে জুলাইয়ে জুলাই বিপ্লব হয়। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। সেই সরকার জুলাইয়ে আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়নের জন্য ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। কমিশনে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক দলগুলো ছিল। দীর্ঘ সাত মাসের অধিক সময় আলোচনা করে বেশির ভাগ বিষয়ে একমত হয়ে একটি সনদ তৈরি হয়। এই সনদটা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার সকলের ছিল। এরই ভিত্তিতে অংশীজনেরা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে ২৫ সালে।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে একই দিনে দুটি ভোট হয়েছে। একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন আরেকটি গণভোট। কিন্তু আমাদের দাবি ছিল আগে গণভোট হবে পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। আমাদের আশঙ্কা ছিল দুটি একসঙ্গে করা হলে গুলিয়ে ফেলা হবে। আমাদের আশঙ্কা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। তারা শুরু থেকে চাতুর্যের আশ্রয় নিয়েছে। বিএনপির দাবি ছিল একই দিনে হোক। আর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের অযৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে একই দিনে দুটি ভোট দিলেন।
তিনি বলেন, গণভোটে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একবার হলেও ‘হ্যাঁ’ ভোট চাইলেন। কিন্তু জনগণ জানে ও বলে বিএনপি আসলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়নি। দেশে-বিদেশে নিজেদের লোকদের নির্দেশনা দিয়েছিল ‘না’ ভোট দেওয়ার জন্য। জনগণের আকাঙ্ক্ষার কাছে না ভেস্তে গেছে প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। দেশের জনগণ জানিয়ে দিয়েছে- আমরা অতীতের বস্তাপচা ঘুণেধরা রাজনীতি এ দেশে আর দেখতে চাই না। আমরা তার পরিবর্তন চাই, সংস্কার চাই, আর আমাদের সন্তানেরা এ জন্য জীবন দিয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের সন্তানেরা বলেছিল আমরা বৈষম্যের বাংলাদেশ দেখতে চাই না উই ওয়ান্ট জাস্টিস। কিন্তু জাস্টিস প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বৈষম্য আরও বেড়েছে। এখন বিএনপি সংবিধান খোঁজে কেন? সাড়ে ১৫ বছর তো সংবিধান মেনে মিছিল করে ফ্যাসিবাদ আপনারাও তাড়াতে পারেননি, আমরাও পারিনি। বিএনপির সিনিয়র নেতারাও ৪১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ইতোমধ্যে বহুবার সংবিধান সংশোধন হয়েছে। কিন্তু আদালতে গিয়ে সেটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। আমরা ওই প্রক্রিয়ায় যেতে চাই না। আমরা পণ্ডশ্রম করব না এবং অতীতের ভুল ধারায় চলতে অভ্যস্ত নই, রাজি নই- এজন্যই আমরা সংস্কার চাই।
এলডিপির প্রেসিডেন্ট ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমছে, কলকারখানা বন্ধ হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে বিরোধী দলের সঙ্গে সংঘাতের পথ পরিহার করতে হবে। জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা এবং জনগণের স্বার্থে দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন এমপি বলেন, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত না হলে সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ার আশঙ্কা থেকেই তাদের দল শুরুতে এ বিষয়ে জোর দিয়েছিল। বর্তমানে সনদে স্বাক্ষর ও গণভোট সম্পন্ন হওয়ার পরও সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের অনীহা সেই আশঙ্কাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) জেনারেল সেক্রেটারি ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নকে কেবল সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থান, জুলাই সনদে স্বাক্ষর এবং গণভোটের মাধ্যমে যেসব রাজনৈতিক প্রশ্নের মীমাংসা হয়েছে, সেগুলোকে নতুন করে বিতর্কিত করা উচিত নয়। জুলাই সনদ ও গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা। তাই জনগণের রায় উপেক্ষা না করে অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক বলেন, জুলাইয়ে এত রক্ত দিয়েও জাতি মুক্তি পায়নি। আওয়ামী লীগ যেভাবে দেশ পরিচালনা করেছে একইভাবে বিএনপিও দেশ পরিচালনা করছে। বিএনপি এখনো সেই ২০০১ সালের অবস্থানে রয়েছে। তারা সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে নিজেদের পরিবর্তন করতে পারেনি।
নেক্সাস ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ হাসান নাসির বলেন, বিএনপি গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ অক্ষরে-অক্ষরে পালন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতা গ্রহণের পর গণভোটের রায় মেনে নেয়নি। জনগণের সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে বিএনপি জাতিকে ধোঁকা দিয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী বলেন, দুর্নীতিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়ে সরকার মূলত মাঠপর্যায়ে বার্তা দিয়েছে দুর্নীতি চালিয়ে যাও! যেই বিএনপি দুর্নীতি আর দলীয়করণে ব্যস্ত সেই বিএনপি কখনোই রাষ্ট্র সংস্কার করবে না। আর এজন্যই বিএনপি গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে সংবিধান সংশোধনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞপ্তি
