Published on
:
2 min read
এই সময়: ‘পরশু তো ষষ্ঠী, তার মধ্যে আপনার কাজ শেষ হবে?’—পুজোর মুখে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ছবির এই দৃশ্য আর সংলাপ বাঙালির কাছে চিরকালীন নস্টালজিয়া। পর্দায় যে সাবেকি ঠাকুর দালানে দাঁড়িয়ে ফেলুদা, তোপসে আর জটায়ু মৃৎশিল্পীকে এই প্রশ্ন করেছিলেন, ঠিক সেই ঠাকুর দালানই উঠে আসছে উত্তর কলকাতার সুকিয়া স্ট্রিটের বৃন্দাবন মাতৃ মন্দিরে। তবে এর নেপথ্যের কারণ নিছক সিনেমা-প্রীতি নয়, বরং এক কিংবদন্তি শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। কারণ, এই সুকিয়া স্ট্রিটের মাত্র ২০০ মিটার দূরেই যে জটায়ু ওরফে অভিনেতা সন্তোষ দত্তের পাড়া, আমহার্স্ট রো। আর রাস্তা পার করলেই সত্যজিৎ রায়ের দেওয়া ঠিকানা, গরপাড়। ১১৭ বছরের এই পুজো এই প্রথম সেজে উঠছে কোনও ব্যক্তির জীবন ঘিরে। সন্তোষ দত্ত—পেশায় আলিপুর কোর্টের দুঁদে ক্রিমিনাল আইনজীবী হলেও, বাঙালির হৃদয়ে তিনি অভিনয়ের এক আশ্চর্য জাদুকর। লালমোহন গাঙ্গুলি ওরফে জটায়ুকে ছাড়া বাঙালি আজও ফেলুদার অস্তিত্ব কল্পনা করতে পারে না। সত্যজিৎ রায়ের কলম আর সন্তোষ দত্তের নিখুঁত কমিক টাইমিং—এই দুইয়ের যুগলবন্দিতে জটায়ু চরিত্রটি অমর রূপ পেয়েছিল।
মণ্ডপে পা রাখলেই দর্শকরা ফিরে যাবেন ১৯৭৯–এর কালজয়ী সিনেমায়। কাশীর বিখ্যাত ঘোষাল বাড়ির সেই গা–ছমছমে রহস্য, দাদু আর নাতি ক্যাপ্টেন স্পার্কের মিলে মা দুগ্গার বাহন সিংহের মুখের ভেতর আড়াই-তিন ইঞ্চির অমূল্য সোনার গণেশ মূর্তি লুকিয়ে রাখা—সবই জীবন্ত হয়ে উঠবে মণ্ডপে। এই টানটান রহস্যের জট ছাড়ানোর গল্পে ফেলুদার মগজাস্ত্রের পাশাপাশি জটায়ুর সেই ভয় পাওয়া অথচ কৌতূহলী চোখের চাউনি আর তার অনবদ্য রসবোধ কীভাবে থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের অভিযানকে জমজমাট করেছিল, তারই উদযাপন হবে এই মণ্ডপে।
পাড়ার ছেলের স্মৃতিকে ফুটিয়ে তুলতে শিল্পী উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ির সেই চেনা আদল, পুরোনো দিনের ঝুল বারান্দা আর ভারী কাঠের সদর দরজা দিয়ে এক অনবদ্য রূপকল্প তৈরি করেছেন। ঘোষাল বাড়ির ঠাকুর দালান যেন মিলেমিশে এক হয়েছে সুকিয়া স্ট্রিটের সাবেকিয়ানার সঙ্গে। মণ্ডপে থাকছে জটায়ু অভিনীত সিনেমা, ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’–এর যমজ রাজা, থাকছে ‘হীরক রাজার দেশে’র বিজ্ঞানী, উত্তম কুমারের শেষ ছবি ‘ওগো বন্ধু সুন্দরী’র অবলাকান্তদের প্রতিকৃতি। এই সব কাজ ফুটে উঠেছে শিল্পী ইন্দ্রজিৎ রায়ের সৌজন্যে। পুজো কমিটির কোঅর্ডিনেটর শিবেন্দু মিত্র বলেন, ‘এমন এক কিংবদন্তিকে তাঁর জন্ম শতবর্ষে এর চেয়ে ভালো ভাবে সম্মান জানানো আর হতে পারে না!’
পর্দায় তিনি যতই হাসির মানুষ হোন না কেন, পাড়ার মানুষের কাছে সন্তোষ ছিলেন অত্যন্ত আপনজন এবং রাশভারী একজন মানুষ। মণ্ডপের ভিড়ে দাঁড়িয়ে এই পুরোনো আমেজ গায়ে মাখলে হয়তো আজও মনে হবে, এই বুঝি জটায়ু তাঁর সেই চিরপরিচিত ভঙ্গিতে ভিড়ের মধ্যে থেকে বলে উঠবেন— ‘অত্যন্ত সন্দেহজনক, হাইলি সাসপিশাস!’
