চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ভুয়া এসআরবি সদস্য পরিচয়ে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অপহরণের চার দিন পর কক্সবাজারের টেকনাফে লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে চাকরিচ্যুত এক সাবেক সেনাসদস্য রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ঘটনায় অপহরণে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেট কার, পাঁচটি কালো রঙের এসআরবি’ লেখা কটি, দুটি ভুয়া এসআরবি পরিচয়পত্র ও একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করা হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্রসহ বিভিন্ন অপরাধে ১৩টি মামলা রয়েছে।
পুলিশ জানায়, গত ১৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাঁশখালীর পুঁইছড়ি এলাকার প্রেমবাজারে ব্যবসায়ী এহছানের মালিকানাধীন মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ নামের হার্ডওয়্যারের দোকানে কয়েকজন ব্যক্তি প্রবেশ করেন। তাঁদের পরনে ছিল কালো পোশাকের ওপর ‘এসআরবি’ লেখা কটি, মাথায় কালো ক্যাপ ও মুখে মাস্ক। তাঁরা নিজেদের এসআরবি সদস্য পরিচয় দিয়ে ব্যবসায়ীর যমজ ভাই মো. হোছাইনের ছবি দেখিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন।
একপর্যায়ে এহছান নিজের পরিচয় দিলে ওই ব্যক্তিরা তাঁর দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরান। পরে টানাহেঁচড়া করে তাঁকে দোকান থেকে বের করে একটি অজ্ঞাত সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যান। এরপর বিভিন্ন যানবাহনে স্থানান্তর করে তাঁকে কক্সবাজারের দিকে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অপহরণের পর রাত ১১টা ৪০ মিনিট থেকে ব্যবসায়ীর স্ত্রী ও দোকানের ম্যানেজারের মোবাইল ফোনে বিভিন্ন ভিওআইপি নম্বর থেকে কল করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাঁকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ব্যবসায়ীর ভাই মো. হোছাইমের এজাহারের ভিত্তিতে বাঁশখালী থানায় মামলা করা হয়।
ঘটনার পর চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের নির্দেশনায় অপহৃত ব্যবসায়ীকে উদ্ধার ও জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। সহকারী পুলিশ সুপার (আনোয়ারা সার্কেল) মাহমুদুল হাসান ও জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি মো. মাসুদ রানার নেতৃত্বে একাধিক দল তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে অভিযান চালায়।
এর ধারাবাহিকতায় ২০ অক্টোবর কক্সবাজার সদর থানার বাস টার্মিনাল, বাংলাবাজার ও কোর্টবাজার এলাকা থেকে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২১ অক্টোবর ভোর ৪টার দিকে টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এহছানকে উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর সুমন মুন্সি, কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার মিজানুর রহমান, উখিয়ার জয়নাল উদ্দিন ওরফে জুনু, চট্টগ্রামের বাঁশখালীর মো. আব্বাস উদ্দিন, টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৬-এর বাসিন্দা মো. ছলিম ওরফে সেলিম এবং কক্সবাজার সদরের দেলোয়ার হোসেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমন মুন্সি অতীতে উখিয়া এলাকায় এসআরবি-তে কর্মরত ছিলেন। সে সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে চাকরিচ্যুত হন এবং কারাভোগ করেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। কারাগারে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে পরবর্তী সময়ে তিনি ভুয়া এসআরবি পরিচয়ে একটি দল গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আব্বাস উদ্দিন ও দেলোয়ার হোসেন বিভিন্ন স্থানে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সুমনকে তথ্য দিতেন। এরপর ভুয়া এসআরবি পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণ এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হতো বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ আরও জানায়, সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা ছাড়াও জয়নাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে অপহরণ, চুরি ও ছিনতাইয়ের তিনটি মামলা এবং ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে দুটি মামলা রয়েছে। আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা রয়েছে।
ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
এই বাংলা/এমএস
