আজকাল ওয়েবডেস্ক: মা অসুস্থ ছিলেন। চিকিৎসা চলছিল। মা'য়ের সুস্থতায় ছেলে ভগবানের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। মানত করেছিলেন যে, কঠিন ব্যাধি থেকে মা সেড়ে উঠলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত ভগবান শিবের পবিত্র তীর্থস্থান ‘১২ জ্যোতির্লিঙ্গ’ দর্শন করবেন তিনি। তবে, এই দর্শন হবে সম্পূর্ণ দৌড়ে! ভক্তের ডাকে সাড়া দিয়েছেন ভগবান। সুস্থু হয়ে উঠেছেন বিহারের আরারিয়ার বাসিন্দা ১৯ বছর বয়সী মনু মেতুরবালা-র মা লালতি দেবী। এরপরই ইস্ট দেবতা শিবের কাছে মানত পূরণে ‘১২ জ্যোতির্লিঙ্গ’ দর্শনে বেড়িয়ে পড়েছেন মনু মেতুরবালা। গত ১৫ মার্চ মার্চ থেকে ছুটে চলেছেন তিনি।
পরিবারের দাবি, মনু ইতিমধ্যে প্রায় ৮,০০০ কিলোমিটার পথ দৌড়ে অতিক্রম করেছেন। ছয়'টি জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করেছেন। বর্তমানে তিনি মহারাষ্ট্রে রয়েছেন। প্রতিদিন প্রায় ৫০ কিলোমিটার দৌড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছেন ১৯ বছরের যুবক।
কঠিন সময়ে নেওয়া এক মানত
লালতি দেবী জানান, গলায় মাছের কাঁটা আটকে যাওয়ার পর হঠাৎ করেই তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসার চেষ্টা করলেও সমস্যাটি থেকেই যায়। মায়ের শারীরিক অবস্থা নিয়ে সবাই যখন উদ্বিগ্ন, তখন মনু প্রার্থনার আশ্রয় নেন। তার বড় ভাই সোনু কুমার জানান, বিহারের জেহানাবাদের বারাবার পাহাড়ে অবস্থিত ‘বাবা সিদ্ধেশ্বর নাথ মন্দিরে’ মনু এই মানতটি করেছিলেন।
মনু প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, মা সুস্থ হয়ে উঠলে তিনি দৌড়ে গিয়ে ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করবেন। আর মা সুস্থ হয়ে ওঠার পর, তিনি নিজের দেওয়া কথা রাখার সিদ্ধান্ত নেন।
লালতি দেবীর কাছে তাঁর ছেলের এই যাত্রা গর্বের বিষয়। তিনি মনে করেন, মনুর এই অর্জন কেবল অতিক্রান্ত দূরত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটা তাঁর পরিবারের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং দেওয়া কথা রাখার দৃঢ় সংকল্পেরই প্রতিফলন।
ক্রিকেট ও ছোটখাটো কাজ থেকে দীর্ঘ তীর্থযাত্রার পথে
এই যাত্রার আগে মনুর জীবন গড়ে উঠেছিল খেলাধুলা এবং পরিবারের ভরণপোষণে সহায়তার তাগিদে। বড় ভাই সোনুর মতে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই মনু ক্রিকেট খেলা শুরু করেন এবং নিজের শারীরিক ফিটনেসের দিকে বিশেষ নজর দিতেন। এর পাশাপাশি তিনি- গোলগাপ্পা ও চাট বিক্রি করতেন এবং বৈদ্যুতিক কাজের ক্ষেত্রেও সহায়তা করতেন। তাঁর বাবা মহেশ চৌহান একজন ইলেকট্রিশিয়ান, আর তাঁর ভাই সোনুও একই পেশার সঙ্গে যুক্ত।
পরিবারটির আর্থিক অবস্থা ছিল সীমিত, আর লালতি দেবীর অসুস্থতার সময় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছিল। মহেশ জানান, তিনি জানতেন যে তাঁর ছেলে ছোটবেলা থেকেই ধর্মপ্রাণ, তবে সে যে এমন এক যাত্রায় বেরিয়ে পড়বে, তা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি। মনু যখন পাটনা ছাড়ে, তখন পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে খরচের জন্য কিছু টাকা দেওয়া হয়েছিল। মহেশের মতে, এখন সে নিজেই এই তীর্থযাত্রার খরচ জোগানোর চেষ্টা করছে।
এই যাত্রার জন্য কেবল শারীরিক সহনশীলতাই যথেষ্ট নয়, যাত্রাপথে খাবার, জল, বিশ্রাম এবং থাকার জায়গার ব্যবস্থাও করতে হয়।
ছয়টি তীর্থস্থান পরিদর্শন সম্পন্ন, আরও ছয়টি বাকি
মনুর যাত্রার প্রথম বড় গন্তব্য ছিল ঝাড়খণ্ডের বাবা বৈদ্যনাথ ধাম। এরপর তিনি অন্যান্য জ্যোতির্লিঙ্গের উদ্দেশ্যে যাত্রা অব্যাহত রাখেন এবং এখন পর্যন্ত ছয়টি জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করেছেন। তাঁর পরিবারের মতে, আরও দু'জন যুবক তাঁর সঙ্গে ভ্রমণ করছেন, যারা তাঁকে সঙ্গ দিচ্ছেন এবং সহায়তা করছেন।
দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিদিন প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ দৌড়ে অতিক্রম করা অত্যন্ত কঠিন একটি লক্ষ্য। পথের দূরত্ব, রাস্তার অবস্থা, আবহাওয়া এবং শারীরিক ক্লান্তি- এসবই যাত্রার অগ্রগতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তার আত্মীয়দের মতে, এই যাত্রা সম্পন্ন না করা পর্যন্ত মনু বাড়ি না ফেরার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
তাঁর বাবা ও ভাই জানিয়েছেন যে, মনুর এই সংকল্প নিয়ে তাঁরা গর্বিত। তাঁরা তাকে ছোটবেলা থেকে ক্রিকেট খেলতে এবং পরিবারের প্রয়োজনে ছোটখাটো কাজ করতে দেখেছেন। এখন নিজের প্রতিজ্ঞা পূরণের জন্য তাঁকে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে দেখে তাঁরা যেমন বিস্মিত, তেমনি আনন্দিতও।
মায়ের প্রতি সন্তানের নিষ্ঠা
ভারতীয় ঐতিহ্যে শ্রবণ কুমারকে বাবা-মায়ের প্রতি গভীর নিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয়। মনুর গল্পও সেই স্মৃতির কথাই মনে করিয়ে দেয়। কারণ, মায়ের অসুস্থতার সময় তিনি যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তা পূরণের জন্যই তিনি এই কঠোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গ ভগবান শিবের উদ্দেশ্যে নিবেদিত অত্যন্ত পবিত্র তীর্থস্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। অনেক ভক্তেরই জীবদ্দশায় এই সবকটি তীর্থস্থান দর্শনের আকাঙ্ক্ষা থাকে। তাঁর মা জানিয়েছেন, তিনি গর্বিত যে তাঁর ছেলে অসুস্থতার সময় দেওয়া কথা রেখেছে। এখন তাঁর পরিবার অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, কখন সে এই তীর্থযাত্রা সম্পন্ন করে নিরাপদে বাড়ি ফিরে আসবে।
